তাহসিফের পরিবার মামলা না করলে পুলিশই বাদী হবে, জানালেন নৌপুলিশ প্রধান
ঢাকার তুরাগ নদ থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এখনও কোনো মামলা দায়ের করেনি তাঁর পরিবার। পুলিশের পক্ষ থেকে পরিবারের সিদ্ধান্ত জানার জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত পরিবার যদি আইনি পদক্ষেপ না নেয় বা মামলা করতে রাজি না হয়, তবে আইনানুগ ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করবে বলে জানিয়েছেন নৌপুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে সংবাদমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করে নৌপুলিশ প্রধান জানান, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয় কি না, আমরা আপাতত সেই প্রক্রিয়াটির দিকে নজর রাখছি। তাঁরা যদি মামলা না করে, তবে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেবে।
তিনি আরও জানান, এই রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনার জট খুলতে নৌপুলিশের পাশাপাশি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে পিবিআই একজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে, যা বর্তমানে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাত থেকে নিখোঁজ ছিলেন বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরি। পরদিন বুধবার বিকেলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে স্থানীয় এক ব্যক্তি ফোন করে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে দেখার খবর দেন। সংবাদ পেয়ে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাট সংলগ্ন তুরাগ নদ এলাকায় পৌঁছায় টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির একটি দল। ওইদিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নদী থেকে তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহ উদ্ধারের সময় তাহসিফের পরনে ছিল সাদা পাজামা ও কালো জামা। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় তাঁর হাতে একটি হাতঘড়ি এবং পকেটে একটি আইফোন পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ওই সচল আইফোনের সূত্র ধরেই তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করে পুলিশ। নিহত তাহসিফ সাউরি সপরিবারে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন।
তাহসিফের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পিবিআই। জিজ্ঞাসাবাদে দ্বীপ চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। দ্বীপের দাবি অনুযায়ী, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় তিনি উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসার নিচে গিয়ে তাহসিফকে ডেকে নেন। এরপর তাঁরা মোটরসাইকেল মেরামতের জন্য একটি গ্যারেজে যান এবং উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার শেষ করেন।
দ্বীপ পুলিশকে জানিয়েছেন, গভীর রাতে তারা দু’জন নিজেদের মোটরসাইকেল নিয়ে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় যান এবং সেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। ওই সময় হঠাৎ কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করে। ধাওয়া খেয়ে আত্মরক্ষার্থে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন এবং দ্বীপ সেখান থেকে কোনোমতে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। দ্বীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই আজ তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে গাজীপুরের টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের ব্যবহৃত নম্বর প্লেটবিহীন মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছে পিবিআই।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম জানান, গত ২৭ অক্টোবর সারাদিনই তাহসিফ তাঁর মায়ের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের জন্য কেনাকাটা করেছিলেন। সন্ধ্যার ঠিক আগে দীপ নামের ওই জুনিয়র বন্ধু বাসার নিচে এসে তাকে ডাকলে তাহসিফ তার মাকে বলে, দ্বীপ এসেছে, আমি ওর সাথে একটু কথা বলে আসছি। এরপর সে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়ে আর বাড়ি ফেরেনি। রাত গভীর হলে মায়ের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের মুঠোফোন থেকে একটি শেষ ভয়েস মেসেজ আসে, যেখানে বলা হয়েছিল— মাম্মি, আমি আসছি। তবে তাহসিফের স্বজনদের দাবি, শেষবার পাঠানো ওই ভয়েস মেসেজটি শুনে তাঁকে প্রচণ্ড ব্যস্ত বা কোনো চাপে রাখা হয়েছিলো বলে মনে হয়েছে।
তাহসিফের পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই এই ঘটনাকে একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তাঁর বাবা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তাঁর ছেলে কোনোভাবেই আত্মহত্যা করতে পারে না। তবে কারা এই ঘটনার পেছনে জড়িত থাকতে পারে, সে-ই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য বা কারও নাম প্রকাশ করেননি তিনি।
পুলিশের তৈরি করা প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাহসিফ সাউরির শরীরে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো জখম বা আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর নাক দিয়ে রক্ত বের হতে দেখা গেছে, চোখ ও মুখ বন্ধ ছিলো এবং পেট কিছুটা ফোলা ছিলো। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং উত্তরাতেই তাঁকে দাফন করা হয়েছে।
নৌপুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
/এমএএইচ/
