ডিভি লটারি চালুর আদেশ স্থগিত
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থার অন্যতম আকর্ষণীয় ও আলোচিত কর্মসূচি ‘ডাইভারসিটি ভিসা (ডিভি) লটারি’ পুনরায় চালুর বিষয়ে নিম্ন আদালতের দেওয়া একটি আদেশ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে মার্কিন ফেডারেল আপিল আদালত।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) নবম মার্কিন সার্কিট কোর্ট অব অ্যাপিলসের ৩ বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্যানেল সরকারের জরুরি আবেদনের ভিত্তিতে এই আদেশ জারি করে। ফলে আপিল আদালতে মূল বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন ডিভি লটারি সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত রাখার আইনি সুযোগ পেলো।
নিম্ন আদালতের পূর্ববর্তী নির্দেশ অনুযায়ী, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে ওইদিনই ডিভি লটারির নতুন প্রক্রিয়া ও সময়সূচি ঘোষণা করার কথা ছিলো। তবে আপিল আদালতের এই নাটকীয় স্থগিতাদেশের পর সেই প্রক্রিয়াটি আপাতত সম্পূর্ণভাবে থমকে গেল।
এই আইনি লড়াইয়ের নেপথ্যে রয়েছে ‘রেড ঈগল’ নামের একটি অভিবাসী অধিকার রক্ষা সংস্থা। আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর সংস্থাটির প্রধান কার্টিস মরিসন মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘নিউজউইক’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজেদের গভীর ক্ষোভ ও পরবর্তী পরিকল্পনার কথা জানান।
তিনি বলেন, ডিভি প্রোগ্রাম পরিচালনায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা ও উদাসীনতাকে আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না। এই ব্যর্থতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ‘রেড ঈগল’ খুব দ্রুতই অন্যান্য আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অধিকার আদায়ে আমাদের আইনি লড়াই অব্যাহত রাখবে।
মরিসন আরও ইঙ্গিত দেন যে, তাঁরা উচ্চ আদালতের এই স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।
আপিল আদালত অবশ্য তাঁর পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট করেছে যে, তাঁরা পররাষ্ট্র দপ্তরের এই নিষ্ক্রিয়তাকে পুরোপুরি সমর্থন করছে না। তিন বিচারকের প্যানেল তাদের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করে, আমরা লটারির নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু করতে পররাষ্ট্র দপ্তরের এই দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতাকে কোনোভাবেই জাস্টিফাই বা সমর্থন করছি না। তবে একই সাথে এটিও সত্য যে, মামলাকারী সংস্থা ‘রেড ঈগল’ এই মামলায় তাঁদের দাবির সপক্ষে যথেষ্ট ও সুনির্দিষ্ট যুক্তি-প্রমাণ তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে।
আদালত আরও জানায়, যেহেতু এই সংস্থাটি আইনের সরাসরি সুবিধাভোগী বা প্রত্যক্ষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ নয়, তাই মার্কিন আইনি কাঠামো অনুযায়ী এই বিষয়ে মামলা করার মতো কোনো ‘লিগ্যাল স্ট্যান্ডিং’ বা আইনি অধিকার তাঁদের নেই। এই প্রযুক্তিগত ও আইনি ত্রুটির কারণেই আদালত সরকারের পক্ষে জরুরি স্থগিতাদেশ মঞ্জুর করার সিদ্ধান্ত নেয়।
সাধারণ মানুষের কাছে ‘গ্রিন কার্ড লটারি’ নামে বহু পরিচিত এই ডাইভারসিটি ভিসা প্রোগ্রামটির একটি দীর্ঘ এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। এটি মূলত ১৯৮০-এর দশকে মার্কিন কংগ্রেসে গৃহীত একটি বিশেষ দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগের ফসল। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় ঐতিহাসিকভাবে যেসব দেশের মানুষের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব বা নির্দিষ্ট কোটা ছিলো না, সেসব দেশের নাগরিকদের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাসের সুযোগ তৈরি করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।
পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের ২৯ নভেম্বর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডাব্লিউ বুশ ‘ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট অব ১৯৯০’-এ স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই কর্মসূচিটিকে একটি স্থায়ী আইনি রূপ দান করেন। এই আইনের মূল উদ্দেশ্যই ছিলো যেসব দেশ থেকে অতীতে যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলকভাবে কম অভিবাসী এসেছে, সেখান থেকে নতুন অভিবাসনকে উৎসাহিত করা এবং আমেরিকার সমাজ ও সংস্কৃতিকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলা।
এই কর্মসূচির আওতায় প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার স্থায়ী রেসিডেন্সি বা গ্রিন কার্ড ভিসা বরাদ্দ রাখা হয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশের নাগরিকরা দীর্ঘ বছর ধরে এই সুযোগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার এবং সেখানে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখে আসছেন। লটারির মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভাগ্যলটারির ওপর ভিত্তি করে এই ভিসা দেওয়া হলেও এর পেছনে নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কাজের অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করতে হয়।
আপিল আদালতের এই সাময়িক স্থগিতাদেশের ফলে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মনে নতুন করে তীব্র উদ্বেগ, হতাশা ও গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনসংক্রান্ত কঠোর নীতি এবং অন্যদিকে জটিল আইনি মারপ্যাঁচ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে ডিভি লটারির ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণভাবে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
/এমএএইচ/
