জাপান সফরে তৃতীয় কোনো দেশ নিয়ে কথা হয়নি, স্পষ্ট করলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রীর সদ্য সমাপ্ত জাপান সফরে তৃতীয় কোনো দেশ, বঙ্গোপসাগর বা সমুদ্রপথ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে স্পষ্ট করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, এই সফরে মূলত বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপরই এককভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ব্রিফিংকালে পরবর্তী পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাওয়া সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী এবং অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব (পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি) এ কে এম শহীদুল করিম উপস্থিত ছিলেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, আমরা বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলতে চাই—সফরে কোনো তৃতীয় দেশ নিয়ে আলোচনা হয়নি। আমরা সেখানে বঙ্গোপসাগর নিয়ে কথা বলতে যাইনি, কারণ বঙ্গোপসাগর কেবল আমাদের একার নয়।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক এখন একটি মর্যাদাপূর্ণ এবং ‘বিনিয়োগভিত্তিক’ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে রূপ নিয়েছে।
পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, সরবরাহ ব্যবস্থার (সাপ্লাই চেইন) ঝুঁকি এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশ তাদের অনন্য ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে কৌশলগত সহযোগিতার আওতায় ‘শেয়ার্ড প্রসপারিটির জন্য বিগ-বি’-তে রূপান্তরের বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, সরকারের সব কার্যক্রম স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে এবং জনগণের ও দেশের স্বার্থের বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।
জাপানের পক্ষ থেকে আগামী ৫ বছরে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি বেসরকারি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে হুমায়ুন কবির জানান, কোন বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য উপযোগী, তা আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। জাপানের ঋণের সুদহার বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছানোর বিষয়ে তিনি বলেন, অর্থায়নের শর্ত, সুদের হার এবং বিনিয়োগের উপযোগিতা কঠোরভাবে বিবেচনা করা হবে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক বিনিয়োগই কেবল গ্রহণ করা হবে। অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থায়নের বিকল্পের তুলনায় যেটি বেশি সুবিধাজনক, সেটিই বেছে নেওয়া হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে বাংলাদেশ সহজ শর্তের ঋণ ও সহায়তার ওপর বেশি নির্ভরশীল থাকলেও এখন পারস্পরিক বিনিয়োগের ভিত্তিতে সম্মানজনক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া দুই দেশের যৌথ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের পর পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে জাপান থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের অর্থনৈতিক মিশন বাংলাদেশে আসবে।
জাপান থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, প্রধানমন্ত্রী এলএনজি আমদানির জন্য জাপান সফরে যাননি। মূলত জাপানের এলএনজি টার্মিনালের আধুনিক কার্যক্রম ও অবকাঠামো সরেজমিনে দেখাই ছিলো এই পরিদর্শনের উদ্দেশ্য। বাংলাদেশও বর্তমানে নিজস্ব এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনা করছে, যার ফলে জাপানের টার্মিনাল স্থাপন ও পরিচালনার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।
রোহিঙ্গা সংকট ও মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি আমাদের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকার। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়—সব ধরনের আন্তর্জাতিক ফোরামেই এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করা হবে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাপান বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে এবং এই বিষয়ে জাপানকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
হুমায়ুন কবির পুনর্ব্যক্ত করেন যে, রোহিঙ্গা সংকটের মূল সমাধানের দায়িত্ব মিয়ানমারের। আলোচনার মাধ্যমে মিয়ানমারকেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে, কারণ বাংলাদেশের একার পক্ষে এই দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।
