এআই'র দাপটে বদলাতে পারে কর্মজগৎ, ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক আইএমএফ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিশ্ব অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি এবং মানুষের কাজের ধরন বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য সুফল অর্জনের আগে এর নিরাপত্তা, নৈতিক ভিত্তি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে ঝুঁকিই বড় হয়ে উঠতে পারে। এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার আলোচনায় তিনি বলেন, পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি এর সম্ভাব্য সুযোগকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, এআই-এর উন্নয়ন ও ব্যবহারকে দায়িত্বশীল রাখতে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতা যখন তীব্র হচ্ছে, তখন প্রযুক্তিটির অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক বৈষম্যের ওপর প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। জর্জিয়েভার বক্তব্যে সেই দ্বৈত বাস্তবতাই উঠে এসেছে।
নিয়ন্ত্রণহীন গতিতে ছুটছে এআই
এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশকে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেছেন আইএমএফ প্রধান। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, প্রযুক্তির অগ্রগতির গতি যত দ্রুতই হোক, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে।
তিনি এআই-এর বিকাশকে এমন এক ফর্মুলা ওয়ান গাড়ির দৌড়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে গাড়িগুলো দ্রুতগতিতে ছুটছে, কিন্তু দুর্ঘটনা ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা নেই।
জর্জিয়েভার মতে, এআই ইতোমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করছে। বিভিন্ন খাতে কাজের দক্ষতা বাড়ানো, উৎপাদনপ্রক্রিয়া উন্নত করা এবং নতুন সেবা তৈরির মাধ্যমে প্রযুক্তিটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে। কিন্তু প্রত্যাশিত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি যথাসময়ে অর্জিত না হলে এর বিস্তার উল্টো অর্থনীতিতে নেতিবাচক ধাক্কা তৈরি করতে পারে।
এআই-এর বিনিয়োগে লাভ না এলে বিপাকে পড়তে পারে অর্থনীতি
এআই ঘিরে বিশ্বজুড়ে বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে। ডেটা সেন্টার, উচ্চক্ষমতার কম্পিউটার চিপ, সার্ভার, সফটওয়্যার এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। এসব বিনিয়োগের যৌক্তিকতা অনেকাংশে নির্ভর করছে ভবিষ্যতে এআই থেকে কতটা উৎপাদনশীলতা ও আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে, তার ওপর।
কিন্তু প্রত্যাশিত সুফল না এলে বিনিয়োগের মূল্যায়ন ও বাজারে বড় ধরনের সংশোধন ঘটতে পারে। এতে শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নয়, সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারী এবং বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থাও চাপে পড়তে পারে।
সভায় জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুন্দেসব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ইয়োয়াখিম নাগেলও এআই-এ বিপুল বিনিয়োগের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ দানি রদ্রিকের বক্তব্যেও এআই-এর অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টি উঠে আসে। তাঁর মতে, প্রযুক্তি থেকে প্রত্যাশিত উৎপাদনশীলতা অর্জিত হলে কিছু খাতে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি থাকতে পারে। অন্যদিকে, প্রত্যাশিত সুফল না এলে ডেটা সেন্টারসহ এআই অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগের কারণে ব্যয়বহুল আর্থিক সংশোধন ঘটতে পারে।
অর্থাৎ, এআই-এর অর্থনৈতিক ঝুঁকি শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে ভুল বা নিরাপত্তা লঙ্ঘনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তিকে ঘিরে অতিরিক্ত প্রত্যাশা, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে অনিশ্চয়তাও গুরুত্বপূর্ণ।
চাকরি হারানোর ঝুঁকি, আবার নতুন কাজের সম্ভাবনাও
এআই-এর অর্থনৈতিক প্রভাবের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো কর্মসংস্থান। যেসব কাজে নিয়মিত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ কিংবা নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হয়, সেসব ক্ষেত্রে এআই মানুষের কাজের একটি অংশ সম্পন্ন করতে পারে।
এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে এবং কিছু কাজের ব্যয় কমতে পারে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট পেশায় কর্মীর চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। সব খাতে একই ধরনের প্রভাব পড়বে, এমন নয়। কোথাও এআই মানুষের কাজের বিকল্প হতে পারে, আবার কোথাও কর্মীদের সক্ষমতা বাড়িয়ে নতুন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সমস্যা হলো, প্রযুক্তির কারণে কাজের ধরন দ্রুত বদলে গেলে কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত সময়, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা নাও থাকতে পারে। বিশেষ করে যেসব কর্মী নতুন প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ কম পান, তাঁদের জন্য পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো কঠিন হতে পারে।
তাই এআই থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পরিবর্তিত শ্রমবাজারের জন্য সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর ছেড়ে দিতে চায় না সবাই
এআই-এর ঝুঁকি মোকাবিলায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারের অংশগ্রহণ ও সমাজের বিভিন্ন পক্ষের মতামত প্রয়োজন বলে মনে করেন জর্জিয়েভা।
তাঁর মতে, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে সরকারের পক্ষে প্রতিটি নতুন উদ্ভাবনের ওপর সরাসরি নজরদারি করা কঠিন হতে পারে। তাই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা ও দায়িত্বশীলতার পাশাপাশি সরকারি নীতিনির্ধারক এবং সমাজের অন্যান্য পক্ষের সম্পৃক্ততাও প্রয়োজন।
আলোচনায় অংশ নেওয়া এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও নীতিবিষয়ক প্রধান জ্যাক ক্লার্কও সাধারণ ও কার্যকর নিরাপত্তামান তৈরির পক্ষে মত দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এআই নিরাপত্তার বিষয়টি পুরোপুরি স্বেচ্ছামূলক উদ্যোগের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
এআই ব্যবস্থার নিয়মিত পরীক্ষা, পরীক্ষার ফল সম্পর্কে স্বচ্ছতা এবং স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়ন প্রযুক্তির ওপর মানুষের আস্থা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। এসব ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নিরাপত্তামান বাস্তবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি না, তার ওপর।
বিশ্বের বড় এআই উৎপাদনকারী দেশগুলোর পাশাপাশি প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোকেও এ বিষয়ে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন আইএমএফ প্রধান।
এআই-এর সুফল পেতে বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল অবকাঠামোও জরুরি
এআই-এর সুবিধা সবার কাছে পৌঁছে দিতে শুধু উন্নত সফটওয়্যার থাকলেই হবে না। নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ, কম্পিউটিং অবকাঠামো এবং যথাযথ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও প্রয়োজন।
জর্জিয়েভা এআই থেকে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর সুফল পাওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে ডিজিটাল অবকাঠামোয় প্রবেশাধিকার, বিদ্যুতের প্রাপ্যতা এবং পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
উন্নত অবকাঠামো ও বিনিয়োগের সুযোগ যেসব দেশের বেশি, তারা এআই-এর সুবিধা তুলনামূলক দ্রুত কাজে লাগাতে পারে। অন্যদিকে, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারের ঘাটতি থাকলে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে উন্নত অর্থনীতির ব্যবধান আরও বাড়তে পারে।
এআই ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং সুবিধা ও বিদ্যুতের ব্যয়ও ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় বাধা হতে পারে। ফলে প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এআই-এর সুবিধা কারা পাচ্ছে এবং কারা পিছিয়ে থাকছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সতর্কবার্তা
বাংলাদেশেও ব্যবসা, শিক্ষা, গণমাধ্যম, আর্থিক সেবা ও সফটওয়্যার উন্নয়নে এআই-এর ব্যবহার বাড়ছে। এই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, নতুন ডিজিটাল সেবা তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এআই ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মীদের নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা ও ভুল তথ্যের বিস্তার ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারের বৈষম্য কমানো জরুরি।
এ ছাড়া দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এআই ব্যবহারে কী ধরনের তথ্য ও সেবা বিদেশি প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের কাছে দিচ্ছে, সেসব তথ্য কীভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে এবং প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তের জন্য দায়বদ্ধতা কার- এসব বিষয়েও স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে বাড়াতে হবে জবাবদিহি
এআই-এর বিকাশ না থামিয়ে, এর সুফল কাজে লাগানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি থেকে প্রত্যাশিত উৎপাদনশীলতা অর্জন, কর্মীদের পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করা, বিনিয়োগের ঝুঁকি বিবেচনা এবং নিরাপত্তার কার্যকর মান নিশ্চিত করা- সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য প্রয়োজন।
আইএমএফ-এর বার্ষিক সভার আলোচনায় উঠে আসা সতর্কবার্তার মূল তাৎপর্যও এখানেই। এআই অর্থনীতির জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু তা নির্ভর করবে প্রযুক্তির সুবিধা কতটা বিস্তৃতভাবে পৌঁছাচ্ছে এবং সম্ভাব্য ক্ষতি কতটা দায়িত্বশীলভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে, তার ওপর।
