প্লটোর পিছন লুকিয়ে থাকা বামন গ্রহ আবিষ্কার
বুধ থেকে পৃথিবী হয়ে নেপচুন পর্যন্ত সূর্যের চারপাশে প্রদক্ষিণরত গ্রহগুলোর সঙ্গে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। এমনকি, তাদের উপগ্রহ নিয়েও গবেষণা হয়েছে বিস্তর। কিন্তু নেপচুনের বাইরে সৌরপরিবারের অন্ধকারময় দুনিয়াকে অনেকেই চেনেন না। বিজ্ঞানীদের হাতে খুব বেশি তথ্য নেই। সেই অন্ধকারেই এবার আলো ফেলল চিলির ভেরা সি রুবিন মহাকাশ পর্যবেক্ষণাগারের টেলিস্কোপ। আবিষ্কৃত হল সৌরজগতের নতুন এক সম্ভাব্য বামন গ্রহ- ইডি১৩৮!
সৌরজগতের বামন গ্রহ হিসেবে পরিচিত নাম প্লটো। আগে তা সূর্যের গ্রহ পরিবারের অন্যতম সদস্য ছিল। মনে করা হত, সূর্যের সর্বশেষ তথা নবম গ্রহ প্লুটো। কিন্তু ২০০৬ সালে বিজ্ঞানীরা প্লুটোকে সাধারণ গ্রহের তালিকা থেকে সরিয়ে দেন এবং বামন গ্রহ বলে ঘোষণা করেন। সেই প্লুটোরই আশপাশে লুকিয়ে ছিল ইডি১৩৮। দীর্ঘদিন ধরে চোখের সামনে থাকলেও তাকে চিনতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।
সম্প্রতি রুবিন পর্যবেক্ষণাগার থেকে নতুন মহাজাগতিক বস্তুটিকে আবিষ্কার করেছেন আমেরিকার হার্ভার্ড স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ম্যাথিউ হোলম্যান। আবিষ্কারের পর তিনি বলেছেন, ‘‘আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। এই ধরনের বস্তু মহাকাশে খুবই বিরল। তাই প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, আমার হিসাবে বা কোডিংয়ে কোনও গোলমাল হচ্ছে। পরে আবিষ্কার সম্বন্ধে নিশ্চিত হলাম।’’
বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, ইডি১৩৮ সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় প্রায় ২৮১ বছর (পৃথিবীর দিনরাতের হিসাব অনুযায়ী)। এর কক্ষপথের গড় দূরত্ব প্লুটোর চেয়ে সামান্য বেশি। তবে এর সঠিক আকার এখনও জানা যায়নি। বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই বামন গ্রহটির ব্যাস ৬০০ থেকে ১৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে হতে পারে। এই অনুমান যদি সঠিক হয়, তবে ইডি১৩৮-এর আকৃতি প্রায় গোল, যা বামন গ্রহের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
বামন গ্রহ হিসেবে অন্য বৈশিষ্ট্যগুলোও এক্ষেত্রে মিলে যাচ্ছে বলে দাবি বিজ্ঞানীদের। তবে তা নিশ্চিত করতে আরও বিশদ পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণা প্রয়োজন। সৌরজগত বা তার বাইরে যে কোনও মহাজাগতিক বস্তুর ব্যাস নির্ণয় করা হয় তার ঔজ্জ্বল্য এবং দূরত্ব হিসাব করে। ইডি১৩৮-এর ক্ষেত্রে সেই হিসাব নিয়ে কিছু সংশয় রয়েছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, বরফাবৃত পৃষ্ঠযুক্ত কোনও ছোট বস্তুও বড় বস্তুর মতো উজ্জ্বল দেখাতে পারে। তাই শুধু ওই তথ্যের উপর ভিত্তি করে ইডি১৩৮-এর ব্যাস সঠিক ভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
ইডি১৩৮ সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য এখনও বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। সেখানে পরিবেশ কেমন, বরফ কতটা, গ্রহটির কোনও অভিনব বৈশিষ্ট্য আছে কি না, জানা যায়নি। বিজ্ঞানীরা কেবল জানতে পেরেছেন, প্লুটো থেকে এর দূরত্ব খুব বেশি নয়। গত কয়েক দশকে প্লুটো নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। তা সত্ত্বেও কেন চোখে পড়েনি ইডি১৩৮-কে? বস্তুত, এই সম্ভাব্য বামন গ্রহের কক্ষপথটি সৌরজগতের সমতলের সাপেক্ষে সাড়ে ২৪ ডিগ্রি হেলে রয়েছে। নেপচুন পরবর্তী যে কোনও মহাজাগতিক বস্তুর ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানীদের এই সমস্যায় পড়তে হয়। সেখানে কক্ষপথগুলোতে স্বাভাবিক নিয়ম খাটে না। বার বার তা পরিবর্তিত হয়ে থাকে।
নেপচুনের পরে বরফময় মহাজাগতিক বস্তুসমূহের সুবিশাল ক্ষেত্রের নাম কুইপার বেল্ট। এত দিনে সেখানে ছোটবড় হাজার হাজার বস্তু শনাক্ত হয়েছে। ইডি১৩৮ সেই তালিকায় নতুন সংযোজন। কুইপার বেল্ট সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা কঠিন। সূর্যের খুব বেশি আলো সেখানে পৌঁছোয় না। ফলে পৃথিবী থেকে সেখানকার বস্তুগুলোর দৃশ্যমানতাও কম।
বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গলের মতো সূর্যের কাছের গ্রহগুলো প্রায় সমতল কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। কুইপার বেল্টে কক্ষপথ সমতল নয়। বার বার তাই ইডি১৩৮ চোখ এড়িয়ে গিয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, ২০১৭, ২০১৮, ২০১৯ এবং ২০২৩ সালে ডার্ক এনার্জি ক্যামেরায় ইডি১৩৮ ধরা পড়েছিল। আলাদা করে তার তাৎপর্য অনুধাবন করা যায়নি। সেই কারণেই বর্তমানে তার আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের আরও কৌতূহলী করে তুলেছে।
/কেআর/
