নতুন পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন রবিবার
নতুন বেতন-কাঠামো অনুযায়ী রবিবার (১ নভেম্বর) থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের বর্ধিত বেতন পরিশোধের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। তবে নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া এখনও সম্পন্ন না হওয়ায় অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্ধারিত সময়ে বর্ধিত বেতন ও বকেয়া পাচ্ছেন না। আপাতত তাঁদের আগের বেতনকাঠামো অনুযায়ী বেতন দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে নতুন কাঠামো অনুসারে বর্ধিত বেতন ও বকেয়া অর্থ সমন্বয় করে পরিশোধ করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও বেশ কিছু জটিলতা রয়ে গেছে। দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী এবং ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এখনও নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের কাজ শেষ করতে পারেনি। ফলে নির্ধারিত সময়ে সবার বর্ধিত বেতন নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
নতুন বেতন নির্ধারণ করতে গিয়ে বিভিন্ন গ্রেডের ক্রম, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার নিয়ম, বাড়িভাড়া ভাতা এবং পদোন্নতির পর আর্থিক সুবিধা নির্ধারণের ক্ষেত্রে একাধিক অসংগতি সামনে এসেছে। এসব সমস্যার কারণে নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী কার কত বেতন নির্ধারিত হবে, তা চূড়ান্ত করার কাজে জটিলতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আইবাস++ ব্যবস্থার বিভিন্ন জটিলতাও বেতন নির্ধারণ ও পরিশোধের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এসব অসংগতি ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেগুলো সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এসব আবেদনের উল্লেখযোগ্য কোনো সুরাহা হয়নি। একাধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সমস্যাগুলো ১ নভেম্বরের আগে সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানা গেছে।
অর্থ বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন তৈরি এবং তা বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানাশোনার ঘাটতির কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নতুন কাঠামো কার্যকর করতে গিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব অসংগতি ও জটিলতা দেখা দিয়েছে, সেগুলো সমাধানে কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে বিষয়গুলো সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শও নেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় বেতন-কাঠামো ২০২৬ অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ প্রারম্ভিক বেতনে ১১তম গ্রেডের কর্মচারীরা ১২তম গ্রেডের কর্মচারীদের চেয়ে ৭০০ টাকা এগিয়ে। কিন্তু নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণের পর দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের বেতনকাঠামোয় প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিলো ১২ হাজার ৫০০ টাকা। গত ৩০ জুন তার মূল বেতন দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৬৬০ টাকা। অর্থাৎ আগের কাঠামোয় মূল বেতন বেড়েছিলো ১১ হাজার ১৬০ টাকা।
নতুন কাঠামোর প্রারম্ভিক বেতন ২৫ হাজার টাকার সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ১৬০ টাকা। নতুন কাঠামোয় ওই অঙ্কের বেতনধাপ না থাকায় পরবর্তী ধাপ অনুযায়ী তাঁর মূল বেতন নির্ধারণ হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, ১২তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিলো ১১ হাজার ৩০০ টাকা। গত ৩০ জুন তার মূল বেতন ছিলো ২৩ হাজার ৫৮০ টাকা। অর্থাৎ আগের কাঠামোয় মূল বেতন বেড়েছিলো ১২ হাজার ২৮০ টাকা। নতুন কাঠামোর প্রারম্ভিক বেতন ২৪ হাজার ৩০০ টাকার সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে হয় ৩৬ হাজার ৫৮০ টাকা। পরবর্তী বেতনধাপ অনুযায়ী তার মূল বেতন নির্ধারণ হচ্ছে ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা।
ফলে প্রারম্ভিক বেতনে এগিয়ে থাকা ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর নতুন মূল বেতন হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা। বিপরীতে ১২তম গ্রেডের কর্মচারী পাচ্ছেন ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ ১১তম গ্রেডের কর্মচারী ৭০০ টাকা কম মূল বেতন পাচ্ছেন। কর্মচারীদের হিসাব অনুযায়ী, নতুন কাঠামোর সুবিধা পর্যায়ক্রমে কার্যকর হলেও দুই গ্রেডের এই ব্যবধান থাকছে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম পর্যায়ে ৫০ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন দাঁড়াবে ৩১ হাজার ২৩০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩১ হাজার ৫৯০ টাকা। তখন ১২তম গ্রেডের কর্মচারী ৩৬০ টাকা বেশি পাবেন। একইভাবে ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৭৫ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন হবে ৩৫ হাজার ১৫ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩৫ হাজার ৫৯৫ টাকা। তখন ব্যবধান দাঁড়াবে ৫৮০ টাকা। আর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে শতভাগ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের বেতন হবে ৪০ হাজার ৮০০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৪১ হাজার ৬০০ টাকা। তখন ব্যবধান বেড়ে হবে ৮০০ টাকা।
নতুন প্রজ্ঞাপনের অনুচ্ছেদ ৫ ও ৯ অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বেতন নির্ধারণ করে নতুন নির্ধারিত বেতন ও বর্তমান বেতনের পার্থক্যের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে ৫০, ৭৫ ও ১০০ শতাংশ সুবিধা কার্যকরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কর্মচারীদের অভিযোগ, এই পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণ করতে গিয়ে গ্রেডভিত্তিক বেতনের স্বাভাবিক ক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পদোন্নতির পরও কমতে পারে আয় নতুন বেতনকাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নিয়েও অসংগতি দেখা দিয়েছে।
কর্মচারীদের দেওয়া একটি হিসাব অনুযায়ী, দশম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা ১০ বছর চাকরি পূর্ণ করার পর নবম গ্রেডে পদোন্নতি বা প্রথম উচ্চতর গ্রেড পেলে তাঁর মূল বেতন ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫১ হাজার টাকা হবে। অর্থাৎ মূল বেতন বাড়বে এক হাজার ৩০০ টাকা। কিন্তু গ্রেড পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়িভাড়া ভাতার হার কমে যাওয়ায় তার মোট আয় কমতে পারে।
দশম গ্রেডে ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা মূল বেতনের ওপর ৫০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা হবে ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা। অন্যদিকে, নবম গ্রেডে ৫১ হাজার টাকা মূল বেতনের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা হবে ২২ হাজার ৯৫০ টাকা। ফলে বাড়িভাড়া ভাতা কমবে এক হাজার ৯০০ টাকা। এতে মূল বেতন ১ হাজার ৩০০ টাকা বাড়লেও বাড়িভাড়া ভাতা কমবে এক হাজার ৯০০ টাকা। সব মিলিয়ে মূল বেতন ও বাড়িভাড়া ভাতার যোগফল মাসে ৬০০ টাকা কমে যেতে পারে।
উচ্চতর গ্রেডে জ্যেষ্ঠতা নিয়েও প্রশ্ন উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও সময় নির্ধারণ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাঁদের অভিযোগ, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যাঁদের চাকরির বয়স ৮ বছর পূর্ণ হয়েছে এবং যাঁদের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে, তাঁরা উভয়েই ১ জুলাই থেকে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন। এতে একই গ্রেডের জ্যেষ্ঠ ও জুনিয়র কর্মকর্তার বেতন সমান হয়ে যেতে পারে। বেতন নির্ধারণের ধাপের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জুনিয়র কর্মকর্তার মূল বেতন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার চেয়েও বেশি হতে পারে।
কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দু’বার উচ্চতর গ্রেড পেতে জুনিয়র কর্মকর্তার ১৪ বছর লাগলেও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার লাগতে পারে ১৬ বছর। তাঁদের মতে, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও সময় নির্ধারণের নিয়ম স্পষ্ট না হলে এসব অসংগতি দূর করা কঠিন হবে।
/এমএএইচ/
