অর্থনীতি ও বাণিজ্য প্রস্তুতিতে বাড়তি ৩ বছর সময় পেলো বাংলাদেশ
ছবি: এআই
এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিতে বাংলাদেশকে আরও ৩ বছর সময় দিয়েছে জাতিসংঘ। এই বিষয়ে বাংলাদেশের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ কার্যকর হবে। বাড়তি এই সময়কে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো, বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করার সুযোগ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১ টায় গৃহীত এই সিদ্ধান্তের পেছনে বাংলাদেশের পক্ষে উরুগুয়ের উত্থাপিত একটি প্রস্তাব কাজ করেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিমূলক সময়সীমা আরও ৩ বছর বাড়ানো হলো। একই সঙ্গে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া, আন্তর্জাতিক সহায়তায় নির্বিঘ্ন উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন এবং প্রতিবছর উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (সিডিপি) কাছে অগ্রগতির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ৮১তম অধিবেশনে নেপালের প্রস্তুতির সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়।
রপ্তানি খাতে স্বস্তির আশা
এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় চেয়ে আসছিলেন। জাতিসংঘের সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য সুখবর উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাড়তি সময় অবকাঠামো ও লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের কাজে ব্যবহার করতে হবে।
তবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির বিশেষ ফেলো ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, শুধু উত্তরণের সময়সীমা বাড়ালেই অর্থনীতি প্রতিযোগিতাসক্ষম হবে না। এই জন্য বাণিজ্য, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং ও অবকাঠামো খাতে কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন।
কেন সময় বাড়ানোর আবেদন করেছিলো বাংলাদেশ
বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তন, জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে সময় বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় সরকার।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (ইউএন-সিডিপি) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে বাংলাদেশ। পরে ইউএন-সিডিপি আবেদনটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার সুপারিশ করে। গত ২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) সাধারণ পরিষদকে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুপারিশ পাঠায়।
নতুন সময়সীমার কারণে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্য অংশীদারদের নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত প্রস্তুতিমূলক সময়ে এলডিসি-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা ও বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখার সুযোগ পাবে বাংলাদেশ।
১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের এলডিসি তালিকাভুক্ত হয় বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে কৃষি, শিল্প, পোশাক রপ্তানি, রেমিট্যান্স, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতির ফলে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে দেশটি।
২০১৮ ও ২০২১ সালের পরপর দুটি পর্যালোচনায় মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক—এই তিনটি মানদণ্ড পূরণ করে বাংলাদেশ। ২০২১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ইউএন-সিডিপি বাংলাদেশের উত্তরণের সুপারিশ করে। একই বছরের ৮ জুন ইকোসক এবং ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সেই সুপারিশ অনুমোদন করে।
কোভিড-১৯ মহামারির অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় বাংলাদেশকে স্বাভাবিক ৩ বছরের পরিবর্তে ৫ বছরের প্রস্তুতিমূলক সময় দেওয়া হয়েছিলো। সে অনুযায়ী উত্তরণের তারিখ নির্ধারিত ছিলো ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর।
উত্তরণের পর যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ
এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপানসহ কয়েকটি বড় রপ্তানি বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে থাকে। উত্তরণের পর এসব সুবিধার পরিবর্তন হলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়তে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের মাত্রা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য অংশীদারদের নীতি ও অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার ওপর।
বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক জাতিসংঘ সম্মেলন (আঙ্কটাড) ২০২৫ সালের এক বিশ্লেষণে বলেছিলো, বাণিজ্য সুবিধা হারালে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি প্রায় ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তবে এটি সম্ভাব্য প্রভাবের একটি প্রাক্কলন, নিশ্চিত ফলাফল নয়।
বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খান বলেন, উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ পেয়েছে। বিশেষ করে মেধাস্বত্বসংক্রান্ত ক্ষেত্রে আরও ৩ বছর সময় পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ এখনো কোনো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে পারেনি। তাই এই ধরনের চুক্তি সম্পাদন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য বাড়তি সময় কাজে লাগানো উচিত।
তিনি বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্য চলতে থাকলেও বাংলাদেশ অনেক সুবিধা হারাবে। তাই বাড়তি সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করতে না পারলে একই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।
পোশাক ও ওষুধশিল্পে বাড়তি ঝুঁকি
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধার পরিবর্তন হলে এই খাতের পণ্যের দাম বাড়তে পারে। এতে ক্রয়াদেশ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই ঝুঁকি কমাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, পণ্যের মান উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজন হবে।
এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব বিধিমালার আওতায় কিছু বিশেষ ছাড় পেয়ে থাকে। উত্তরণের পর এসব সুবিধার পরিবর্তন ওষুধশিল্পে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পেটেন্টযুক্ত ওষুধ উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং গবেষণা ব্যয়ের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
উন্নয়ন অর্থায়নও উদ্বেগের একটি বিষয়। উত্তরণের পর এলডিসি-নির্দিষ্ট কিছু সহায়তা ও সহজ শর্তের ঋণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে উত্তরণের অর্থ এই নয় যে সব অনুদান বা সহজ শর্তের ঋণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। এই পরিস্থিতিতে অবকাঠামো, জ্বালানি ও সামাজিক উন্নয়নে অর্থায়ন অব্যাহত রাখতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনা জরুরি।
২০২৯ সালের আগে যেসব সংস্কার জরুরি
অতিরিক্ত ৩ বছরকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর সঙ্গে বিকল্প বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে আলোচনা এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমাতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বন্দর ও কাস্টমস সেবার উন্নয়ন এবং রপ্তানি সরবরাহব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
তাদের মতে, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য ও ইলেকট্রনিকস খাতে রপ্তানি বাড়াতে হবে। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করা, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ এবং দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়ে তোলাও জরুরি।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, উত্তরণের পর শুল্ক ও অন্যান্য বাণিজ্য সুবিধার সম্ভাব্য পরিবর্তন মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর সঙ্গে আগেভাগেই আলোচনা শুরু করা উচিত। পাশাপাশি তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়া, হালকা প্রকৌশল, পাটজাত পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি বৈচিত্র্য আনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, করের আওতা বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, ব্যবসার খরচ কমানো এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই জন্য স্পষ্ট সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সংস্কার পরিকল্পনা নিতে হবে। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রতি ৬ মাস পরপর অগ্রগতি পর্যালোচনা ও প্রকাশের পরামর্শও দেন তিনি।
/শান্ত/
