পরমাণু যুগে বাংলাদেশ
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু
বাংলাদেশের জ্বালানি ও প্রযুক্তি ইতিহাসে এক নতুন ও ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। দেশের প্রথম ও একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পাবনার রূপপুরের ১ নম্বর ইউনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই কাঙ্ক্ষিত ও গৌরবময় প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের অভিজাত তালিকায় চূড়ান্তভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলো।
এর আগে, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘পাওয়ার স্টার্টআপ’ বা বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রদান করে দেশের পরমাণু খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা)। প্রকল্প এলাকার সব ধরনের নিরাপত্তা ও কারিগরি মানদণ্ড কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করার পর বায়রা-এর পক্ষ থেকে এই লাইসেন্স বা অনুমোদনপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়, যা আজ থেকে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরুর পথ সুগম করে।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর নির্দেশিকা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পুরোপুরি অনুসরণ করে রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় এই মেগা প্রকল্পটি নির্মিত হচ্ছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ‘বি-ওয়ান’ (B1) ধাপের সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা আগেই সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছিলো। সবশেষ স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভ সংক্রান্ত একটি কারিগরি ও প্রযুক্তিগত জটিলতা দেখা দিলেও রাশিয়ান ও দেশীয় প্রকৌশলীদের যৌথ প্রচেষ্টায় তা সফলভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়। কারিগরি ত্রুটি সম্পূর্ণ দূর করার পর রিঅ্যাক্টরটিকে পরবর্তী ‘বি-টু’ (B2) ধাপে নিয়ে যাওয়া হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পারমাণবিক চুল্লিতে ‘ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জন করা হয়—যেখানে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সাপেক্ষে স্বয়ংসম্পূর্ণ চেইন রিঅ্যাকশন বা পরমাণুর ধারাবাহিক বিভাজন প্রক্রিয়া শুরু হয়।
প্রকল্প সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, পরমাণুর ধারাবাহিক ও নিয়ন্ত্রিত বিভাজনের মাধ্যমে চুল্লিতে এখন স্থায়ী, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে তাপ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ধাপে ধাপে বা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হবে। পরীক্ষামূলক এই উৎপাদন প্রক্রিয়া সফলভাবে অগ্রসর হয়ে যখন ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্তর স্পর্শ করবে, তখনই বাণিজ্যিকভাবে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে (জাতীয় গ্রিড) বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে। এটি দেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে এবং সামগ্রিক শিল্পায়নে বড় ধরনের ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ নম্বর ইউনিটে উৎপাদন শুরুর উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যেই দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ নিয়েও এসেছে বড় সুখবর। গতকাল বৃহস্পতিবারই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টরের প্রারম্ভিক লোডিং বা প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য রাশিয়া থেকে পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান অত্যন্ত নিরাপদে প্রকল্প এলাকায় এসে পৌঁছেছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটম (Rosatom) এক বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দ্বিতীয় ইউনিটের কাজের এই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে।
/এমএএইচ/
