প্রতিবেশী নক্ষত্রে পৌঁছাতে লাগবে ৮০ হাজার বছর, মিশন শুরু ২০২৮ সালে
বিজ্ঞানীরা মানবজাতির আন্তঃনক্ষত্র (ইন্টারস্টেলার) অভিযানের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে নতুন এক মহাকাশ মিশনের পরিকল্পনা করছেন। 'ফার্মি এক্সপ্লোরার' নামের এই মিশনে ২০২৮ সালে একটি মহাকাশযান পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। গন্তব্য সৌরজগতের বাইরে পৃথিবীর নিকটতম নক্ষত্রগুলোর একটি প্রক্সিমা সেন্টরি। সেখানে পৌঁছাতে মহাকাশযানটির সময় লাগবে প্রায় ৮০ হাজার বছর।
পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ দশমিক ৪ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই নক্ষত্রে পৌঁছাতে মহাকাশযানটিকে পাড়ি দিতে হবে প্রায় ২৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন মাইল। ফলে অভিযানটির ফলাফল দেখার সুযোগ বর্তমান প্রজন্মের কারও হবে না।
মিশনটির একটি ধারণামূলক ভিডিওতে দেখানো হয়েছে, ৮১ হাজার ৫২৮ সালের দিকে মহাকাশযানটি আলফা সেন্টারি নক্ষত্রমণ্ডলে পৌঁছাবে। সেখানে ভবিষ্যতের একটি মহাকাশ স্টেশনে বসবাসকারী মানুষ একে মানবজাতির মহাকাশযাত্রার শুরুর দিকের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে স্বাগত জানাবে।
স্পেনের টেনেরিফে আয়োজিত 'স্টারমাস ফেস্টিভ্যাল'-এ মিশনটির পরিকল্পনা তুলে ধরেন উদ্যোক্তা কাম গাফফারিয়ান। তিনি বলেন, 'আমি বিশ্বাস করি, মানবজাতির গন্তব্য হলো আন্তঃনক্ষত্র ভ্রমণকারী হয়ে ওঠা। আমাদের পরিকল্পনা, ২০২৮ সালে পৃথিবী থেকে প্রক্সিমা সেন্টরির উদ্দেশে প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা। এতে হাজার হাজার বছর লাগবে ঠিকই, তবে এর মূল উদ্দেশ্য নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করা।'
নাসার আর্টেমিস মিশনে যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাক্সিওম স্পেস ও ইনটুইটিভ মেশিনসের প্রতিষ্ঠাতা গাফফারিয়ান মনে করেন, চাঁদে পৌঁছানোই মানবজাতির চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, বরং এটি আরও দূরের অভিযানের সূচনা।
তিনি বলেন, 'অনেকেই মনে করেন, চাঁদই আমাদের গন্তব্য। কিন্তু আমি বলতে চাই, চাঁদ গন্তব্য নয়, কেবল শুরু। মঙ্গলসহ অন্যান্য গ্রহে এবং একসময় সৌরজগতের বাইরেও যাত্রা করতে হলে চাঁদে প্রথমে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।'
গাফফারিয়ানের আশা, ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর বাইরে এমন একটি মহাকাশ শহর গড়ে উঠবে, যেখানে মানুষ বসবাস ও কাজ করতে পারবে। সেখানে থাকবে কৃত্রিম অভিকর্ষ এবং মাইক্রোগ্রাভিটি বা অতি ক্ষুদ্র অভিকর্ষে উৎপাদনের জন্য বিশাল কারখানা। তাঁর মতে, এসব পরিবেশে তৈরি প্রযুক্তি ক্যানসারের মতো রোগের চিকিৎসায়ও কাজে লাগতে পারে।
তাঁর কল্পনায়, একসময় মানুষ পরিচয় দেবে এভাবে—'আমি চাঁদ থেকে এসেছি।' এরপর মঙ্গল গ্রহে নিয়মিত যাতায়াত শুরু হবে। সেখানে মানুষের স্থায়ী আবাস গড়ে উঠবে। এমনকি প্রতি দুই থেকে তিন মাস পরপর সৌরজগতের বাইরের নক্ষত্রগুলোর উদ্দেশেও মহাকাশযান পাঠানো সম্ভব হবে।
এ পর্যন্ত নাসার ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২- এই দুটি মহাকাশযান সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে প্রবেশ করেছে। তবে ফার্মি এক্সপ্লোরারের লক্ষ্য আরও দূরে- অন্য একটি নক্ষত্রের উদ্দেশে যাত্রা করা।
সঙ্গে থাকবে পৃথিবীর বার্তা
ভয়েজার মহাকাশযানের মতো ফার্মি এক্সপ্লোরারেও রাখা হবে একটি 'গোল্ডেন রেকর্ড'-এর অনুলিপি। এতে থাকবে গাণিতিক সূত্র, পৃথিবীর উদ্ভিদ ও প্রাণীর ছবি, প্রাকৃতিক দৃশ্য, ৫৫টি ভাষায় রেকর্ড করা শুভেচ্ছাবার্তা, গান, পাখির ডাক, মানুষের পদশব্দ ও হাসির শব্দ। এ ছাড়া থাকবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের একটি লিখিত বার্তা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিশুদের নতুন বার্তাও এতে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আলফা সেন্টারি নক্ষত্রমণ্ডলকে গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণ, এটি পৃথিবীর নিকটতম নক্ষত্রব্যবস্থা এবং রাতের আকাশে সহজেই শনাক্ত করা যায়। মিশন পরিকল্পনাকারীরা চান, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আকাশের দিকে তাকিয়ে নক্ষত্রমণ্ডলটি শনাক্ত করতে পারুক এবং বুঝতে পারুক, মানবজাতি সেখানে একটি মহাকাশযান পাঠিয়েছিল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪৩ সালের দিকে ফার্মি এক্সপ্লোরার সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে যাবে। তবে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আগামী শতাব্দীগুলোতে উৎক্ষেপণ করা আরও দ্রুতগতির মহাকাশযান একসময় এটিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
মিশনটির উদ্যোক্তারা ভবিষ্যতের মানুষ ও সম্ভাব্য বুদ্ধিমান ভিনগ্রহী প্রাণীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন কেউ মহাকাশযানটির যাত্রায় বাধা না দেয়। তাঁদের ভাষায়, এটি হতে পারে 'মহাবিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন'।
মিশনটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট ফিলিপ জনস্টন বলেন, 'আমরা চাই, যাত্রার শুরুটা আমাদের হাত দিয়ে হোক, আর আলফা সেন্টারিতে পৌঁছানো হোক এর শেষ ধাপ। এই যাত্রা শেষ হওয়ার সময় আমাদের কেউই বেঁচে থাকব না। আর সেটাই এর মূল তাৎপর্য।'
তিনি আরও বলেন, 'এটি শুধু একটি অর্জনযোগ্য লক্ষ্য পূরণের বিষয় নয়। বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা যে উত্তরাধিকার পেয়েছি, তার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখানোই এর উদ্দেশ্য।'
ভবিষ্যত অবস্থান লক্ষ্য করে যাত্রা
আলফা সেন্টারি নক্ষত্রব্যবস্থার অবস্থান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণের সময় নক্ষত্রটির বর্তমান অবস্থানকে লক্ষ্য করে পাঠানো হবে না। বরং প্রায় ৭৯ হাজার ৫০০ বছর পর নক্ষত্রটি যেখানে থাকবে, সেই অবস্থান হিসাব করেই যাত্রাপথ নির্ধারণ করা হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেই লক্ষ্যবিন্দু বর্তমানে কর্কট নক্ষত্রমণ্ডলের দিকে অবস্থিত।
এনরিকো ফার্মির নামানুসারে মিশনটির নাম রাখা হয়েছে। তাঁর নাম থেকেই এসেছে 'ফার্মি প্যারাডক্স'। এই বৈজ্ঞানিক ধাঁধার মূল প্রশ্ন হলো, মহাবিশ্বে বুদ্ধিমান ভিনগ্রহী সভ্যতা থাকার সম্ভাবনা যদি এত বেশি হয়, তাহলে এখনো তাদের অস্তিত্বের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি কেন? কিংবা তারা কখনো পৃথিবীতে আসেনি কেন?
মিশনটি বাস্তবায়নে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা করছে উদ্যোক্তাদের দলটি। একই সঙ্গে মহাকাশযানে বহন করার মতো বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও শিল্পকর্মের প্রস্তাব দিতে বিজ্ঞানীদের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিবেচনায় থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে মহাজাগতিক ধূলিকণা সংগ্রহের জন্য অ্যারোজেল টাইল, অতি ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ডের আঘাত শনাক্ত করার 'উইটনেস প্লেট' এবং একটি রেডিওআইসোটোপ ঘড়ি। ঘড়িটি থেকে ভবিষ্যতে মহাকাশযানটির ক্ষয়ের হার বিশ্লেষণ করে এর উৎক্ষেপণের সময় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
তবে যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীদের একটি সীমাবদ্ধতার কথাও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। মিশন পরিকল্পনাকারীদের সতর্কবার্তা, 'বিজ্ঞানীদের মনে রাখা উচিত, অধিকাংশ সেন্সর থেকে আমরা সম্ভবত ৮০ হাজার বছর পর্যন্ত কোনো তথ্য ফেরত পাব না।'
মহাকাশযানটি নির্মাণের জন্য বড় স্যাটেলাইট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়েও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। মহাকাশযানটিতে ছোট একটি অ্যান্টেনা থাকবে। ফলে সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার পর এর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছে দলটি।
মিশনটির দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সাবেক মার্কিন বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা গ্যারেট জেমসন বলেন, 'এই মিশনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দিক হলো, এর জন্য কাউকে অনুমতি বা নিখুঁত পরিস্থিতির অপেক্ষায় থাকতে হবে না। বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা মেনেই আমরা এখন যা সম্ভব, তা তৈরি করতে পারি এবং পরবর্তী প্রজন্মকে অর্থবহ কিছু উপহার দিতে পারি।'
ফার্মি এক্সপ্লোরারের উৎক্ষেপণ সফল হলে পরবর্তী সময়ে অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির দিকে আরেকটি মহাকাশযান পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে দলটির। তাদের হিসাব অনুযায়ী, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি পেরিয়ে অন্য একটি গ্যালাক্সিতে পৌঁছাতে সেই মহাকাশযানের প্রায় এক বিলিয়ন বছর লাগতে পারে।
এখন পর্যন্ত অন্য কোনো নক্ষত্রের উদ্দেশে মহাকাশযান পাঠানো হয়নি। তবে পদার্থবিদ স্টিফেন হকিংয়ের সমর্থন পাওয়া 'ব্রেকথ্রু স্টারশট' প্রকল্পে আলোর রশ্মির সাহায্যে ক্ষুদ্র মহাকাশযান আলফা সেন্টারিতে পাঠানোর প্রস্তাব রয়েছে।
কেআর/
