বুয়েটে প্রথম হওয়া থেকে ব্লুমবার্গে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করছেন নাফিস
২০১২ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন নাফিস ইরতিজা তৃপ্ত। সেই ফল প্রকাশের দিনটি তাঁর জন্য ছিলো বিস্ময়ের। তখন ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল অনলাইনে প্রকাশের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালেও টাঙিয়ে দেওয়া হতো। ময়মনসিংহে অবস্থান করায় নিজে গিয়ে ফল দেখার সুযোগ ছিলো না তাঁর। পরে বুয়েটে পড়ুয়া এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে খবরটি পান। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি। কয়েক জায়গা থেকে একই খবর পাওয়ার পর নিশ্চিত হন, তিনিই প্রথম হয়েছেন।
এক যুগের বেশি সময় পর নাফিসের পরিচয় এখন আর শুধু বুয়েটের সেই মেধাতালিকার প্রথম স্থান অধিকারী হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা শেষে তিনি এখন কাজ করছেন বিশ্বের অন্যতম বড় আর্থিক তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গে। নিউইয়র্কে প্রতিষ্ঠানটির মেশিন লার্নিং ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন তিনি।
নাফিসের শিক্ষাজীবনের শুরুটা অবশ্য খুব বেশি আলোচনার বাইরে ছিলো। ২০১৩ সালে বুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন তিনি। ২০১৭ সালে স্নাতক সম্পন্ন করার পর একই বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে প্রায় চার বছর শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন। একসময় যে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন, সেখানেই শিক্ষক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান তিনি।
তবে শিক্ষকতার পাশাপাশি উচ্চতর গবেষণার আগ্রহও ছিলো তাঁর। সেই লক্ষ্য নিয়ে ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে (পেন স্টেট) ইনফরমেটিকস বিষয়ে পিএইচডি করতে যান। বিশ্ববিদ্যালয়টির তথ্যবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের পিআইকেই গবেষণা দলে কাজ করেন তিনি। তাঁর গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন অধ্যাপক ডংওন লি।
নাফিসের গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্র ছিলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশেষ করে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম)। বর্তমানে চ্যাটজিপিটির মতো প্রযুক্তির কারণে এই গবেষণাক্ষেত্র বিশ্বজুড়ে আলোচনায়। তবে নাফিসের কাজ কেবল এআই দিয়ে লেখা তৈরি বা এআইয়ের লেখা শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। মানুষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি লেখার পার্থক্য, লেখার মৌলিকত্ব, লেখকের পরিচয় এবং ভাষার ধরন পরিবর্তনের মতো বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন তিনি।
তাঁর গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিলো, কোনো লেখা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পরিবর্তন বা পরিমার্জন করা হলে সেটির প্রকৃত লেখক কে? লেখাটি যিনি লিখেছেন, নাকি যে প্রযুক্তি সেটিকে নতুনভাবে সাজিয়েছে? বিষয়টি নিয়ে তাঁর গবেষণাপত্র ২০২৪ সালে অ্যাসোসিয়েশন ফর কম্পিউটেশনাল লিঙ্গুইস্টিকসের (এসিএল) মূল সম্মেলনে গৃহীত হয়। এ ছাড়া ২০২৩ সালে ইএমএনএলপি সম্মেলনের ফাইন্ডিংস এবং ২০২৫ সালে একই সম্মেলনের মূল পর্বেও তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশের জন্য গৃহীত হয়।
পিএইচডি করার সময় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না নাফিস। প্রযুক্তি খাতের বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান হোম ডিপোতে ডেটা সায়েন্স ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করেন। সেখানে পূর্বাভাসভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং গ্রাহকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য ভাষা মডেলনির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নিয়ে কাজের সুযোগ পান। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসে (এডব্লিউএস) অ্যাপ্লায়েড সায়েন্টিস্ট ইন্টার্ন হিসেবে যোগ দেন। সেখানে ব্যক্তিগতকরণ ও কোডিং এজেন্টের মতো প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন।
চার বছরের গবেষণাজীবন শেষে ২০২৬ সালে পেন স্টেট থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন নাফিস। নিজের লিংকডইন পোস্টে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিলো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের যুগে লেখকের পরিচয় ও লেখার মৌলিকত্বকে নতুনভাবে বোঝা। গবেষণার এই পর্যায়ে সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনার জন্য নিজের শিক্ষক এবং সহগবেষকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
পিএইচডি শেষ করার পর এবার যুক্ত হয়েছেন ব্লুমবার্গে। নিজের লিংকডইনে নতুন কর্মস্থলের খবর জানিয়ে নাফিস লিখেছেন, সেখানে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
তবে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার বিষয়টিকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখেন না নাফিস। তাঁর মতে, ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে। এরপরের পথ নির্ভর করে নিজের পড়াশোনা, দক্ষতা ও কাজের ওপর। পুরোনো সাফল্যের পরিচয়ে আটকে না থেকে প্রতিটি নতুন পর্যায়ে নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করাই গুরুত্বপূর্ণ।
ভর্তি পরীক্ষার্থীদের জন্যও তাঁর পরামর্শ, শুধু প্রথম হওয়ার লক্ষ্য না রেখে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পাঠ্যবইয়ের বাইরেও সমালোচনামূলক চিন্তা, মানসিক পরিপক্বতা, বন্ধুত্ব ও জীবনের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
ময়মনসিংহ থেকে বুয়েট, বুয়েটে শিক্ষকতা, এরপর যুক্তরাষ্ট্রে চার বছরের গবেষণা- নাফিসের পথচলায় প্রতিটি ধাপেই এসেছে নতুন অভিজ্ঞতা। তাঁর নিজের উপলব্ধিও হলো, একটি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া সাময়িক অর্জন। দীর্ঘ পথচলায় শেখা, দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রতিকূলতা সামলে এগিয়ে যাওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
//আইই//
