নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল, মূল্যস্ফীতিতে অসন্তোষ ক্রেতাদের
রাজধানীর একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন আফজাল হোসেন। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে মানিকনগরে ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। গত এক সপ্তাহের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আফজাল হোসেন বলেন, এক বা দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পণ্যের দাম কমা বা বাড়ার কারণে জনজীবনে তেমন কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়ে না। দেখা যায়, এক সপ্তাহে তিনটি পণ্যের দাম কমেছে, পরের সপ্তাহে আবার সেই পণ্যগুলোর দাম বেড়ে গেছে। ফলে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি একই থাকে। গত এক সপ্তাহে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকলেও মূল্যস্ফীতির কারণে বাজারে স্বস্তি ছিলো না বলে জানান তিনি।
চলতি অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে (২৪ থেকে ৩০ অক্টোবর) দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে মিশ্র পরিস্থিতি দেখা গেছে। কিছু পণ্যের দাম সামান্য কমলেও অধিকাংশ পণ্য ছিলো উচ্চমূল্যে স্থিতিশীল। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষও ছিলো। মাসের শেষ সপ্তাহ হওয়ায় বাজারে ক্রেতাদের উপস্থিতি ও কেনাবেচার পরিমাণ কিছুটা কম ছিলো। কয়েকটি পণ্যের দাম কমলেও মজুরি বৃদ্ধির গতি ধীর থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ আগের মতোই রয়েছে।
রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি রোধে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর গত সপ্তাহের শেষ দিকে (২৬ ও ২৭ অক্টোবর) দেশজুড়ে অভিযান চালায়। ঢাকা মহানগরসহ দেশের প্রায় ৪০টি জেলায় পরিচালিত এসব অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ১০৩টির বেশি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন ও বাজারভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে শীতকালীন আগাম সবজির সরবরাহ বাড়ায় এই খাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে অন্যান্য প্রধান নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ছিলো চড়া। এই সময়ে সার্বিক খাদ্য মূল্যস্ফীতি সামান্য কমলেও সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বাজারের চাপ পুরোপুরি কাটেনি। সাদা বেগুন, শিম ও ফুলকপির মতো শীতকালীন আগাম সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করায় এসব পণ্যের দামে কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা গেছে।
গত সপ্তাহে সবজির দাম কিছুটা কমলেও পেঁয়াজ, আলু ও কাঁচা মরিচের দাম ছিলো ঊর্ধ্বমুখী। খুচরা বাজারে আলু কেজিপ্রতি ২০ থেকে ২৫ টাকা এবং সাদা বেগুন প্রায় ৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। আমন ও বোরো চালের দাম আগের সপ্তাহের তুলনায় অনেকটাই স্থিতিশীল ছিলো। তবে চাল ও ডালের দাম ছিলো চড়া।
সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, বাজারে মোটা চালের দাম স্থিতিশীল থাকলেও মাঝারি ও সরু চাল পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়েছে। অন্যদিকে মসুর ডাল ও ছোলার আমদানি বাড়ায় এসব পণ্যের সরবরাহ ছিলো পর্যাপ্ত। তবে প্যাকেটজাত চিনি ও বোতলজাত সয়াবিন তেল সরকারি নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
গত ২৬ অক্টোবর নিত্যপণ্যের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। তবে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভোজ্যতেলের দাম না বাড়ানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
চিনির ক্ষেত্রেও নির্ধারিত দরের সঙ্গে বাজারদরের অমিল দেখা গেছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) নির্ধারিত দর ১১০ টাকা হলেও খুচরা বাজারে তা ১২০ টাকায় বিক্রি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
গত সপ্তাহে ডিমের দাম ছিলো কিছুটা চড়া। পোলট্রি মুরগির দাম কেজিপ্রতি ১৭০ থেকে ১৭২ টাকার মধ্যে ওঠানামা করেছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার বাজার তদারকি জোরদার করায় সপ্তাহের শেষ দিকে ডিম ও মুরগির বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়নি। এদিকে টিসিবি আগামী নভেম্বর থেকে প্যাকেটজাত মসলা ও চা বিক্রি শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে।
মাছের বাজারে রুই ও পাঙ্গাশের দাম কিছুটা কমলেও গরু, খাসি ও মুরগির মাংসের দাম ছিলো উচ্চমূল্যে স্থিতিশীল। ফলে এসব পণ্য সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য ব্যয়বহুলই ছিলো।
রমজান সামনে রেখে বেড়েছে আমদানি
আসন্ন রমজান সামনে রেখে ছোলা, মসুর ডাল, ভোজ্যতেল ও খেজুরের আমদানি এবং ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে বাজারে এসব পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে চিনি আমদানি হয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার টন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তা ১ লাখ ৫৩ হাজার টন বেশি। এ সময়ে চিনির এলসি খোলা হয়েছে ৮ লাখ ১০ হাজার টন।
একই সময়ে ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ২৩ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিলো ৭ লাখ ৫ হাজার টন। এই সময়ে ভোজ্যতেলের এলসি খোলা হয়েছে ৮ লাখ ৫ হাজার টন, যা আগের বছরের তুলনায় ১ লাখ ৩১ হাজার টন বেশি।
ইফতারে বহুল ব্যবহৃত ছোলার আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই সময়ে ছোলার এলসি খোলা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে ১২ হাজার টন ছোলা আমদানি হলেও এবার হয়েছে ৮২ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৮ গুণ।
এ ছাড়া গত ১ জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত খেজুর আমদানি হয়েছে ১১ হাজার টন। গত বছর একই সময়ে এর পরিমাণ ছিলো ৪ হাজার টন। মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার টন, যা আগের বছরের তুলনায় ৬৪ হাজার টন বেশি। এই সময়ে মসুর ডালের এলসি খোলা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার টন।
টিসিবি'র তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি বড় দানার মসুর ডালের দাম গত এক মাসে ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ কমেছে। তবে বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছোলা, খোলা সয়াবিন তেল, মসুর ডাল, চিনি ও খেজুরের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও খুচরা বাজারের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
আমদানি ব্যয় ও বাজার তদারকি নিয়ে উদ্বেগ
আমদানিকারকদের ভাষ্য, প্রকৃত মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন শুল্কায়ন, বিকল্প পরিবহনপথের বাড়তি ব্যয় এবং এলসি খোলার জটিলতা পণ্যের দাম বাড়াতে পারে। এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
রাজধানীর পাইকারি বাজার মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, যেসব পণ্য আমদানি করতে হয়, সেসব পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। সেখানে দেশের ব্যবসায়ীদের কিছু করার নেই।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, বিষয়টি শুধু এক বা দুই সপ্তাহের নয়। সারা বছর যাতে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল থাকে, সেদিকে সরকারের নজর দিতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী আব্দুল মুক্তাদির চৌধুরী জানান, রমজানে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে এবং ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হচ্ছে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন রমজান সামনে রেখে ছোলা, ডাল ও ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। এই মুহূর্তে সয়াবিন তেলসহ অন্যান্য আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনাও নেই।
এদিকে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং নকল ও ভেজাল পণ্য প্রতিরোধে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর দেশজুড়ে বিশেষ তদারকি অভিযান পরিচালনা করেছে। তবে পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে আসার পথে পরিবহন ব্যয়সহ অন্যান্য খরচ যুক্ত হওয়ায় অনেক সবজির দামে তেমন স্বস্তি মেলেনি বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ক্রেতা।
সব মিলিয়ে গত সপ্তাহে নিত্যপণ্যের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা না থাকলেও উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে স্বস্তি ফেরেনি। কয়েকটি পণ্যের দাম কমা কিংবা সরবরাহ বাড়ার ইতিবাচক দিক থাকলেও মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে বাজারদরের ব্যবধান এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়।
/এসআই/ আইই/
