বাংসামোরো’র প্রথম নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী মাকাকুয়া
ফিলিপাইনের স্বায়ত্তশাসিত মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চল বাংসামোরোর মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন আবদুলরাওফ মাকাকুয়া। দীর্ঘ কয়েক দশকের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংঘাত, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রামের পর শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট অধিবেশনে অঞ্চলটির প্রথম নিয়মিত মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি।
কোটাবাটো সিটির শরিফ কাবুনসুয়ান কালচারাল সেন্টারে নবগঠিত ৮০ সদস্যের বাংসামোরো পার্লামেন্টের এই উদ্বোধনী অধিবেশন বসে। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ৭ বছরের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের অবসান ঘটে অঞ্চলটিতে নিয়মিত ও নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার এক নতুন যুগের সূচনা হলো।
পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক এই ভোটাভুটিতে বাংসামোরো ফেডারেলিস্ট পার্টির প্রধান আবদুলরাওফ মাকাকুয়া ৫১ ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন। তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন মুখ্যমন্ত্রী এবং মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের চেয়ারম্যান আহোদ আল হাজ মুরাদ ইব্রাহিম পান ২৭ ভোট। অধিবেশনে উপস্থিত ৭৯ জন সদস্যের মধ্যে একজন ভোটদানে বিরত ছিলেন এবং অন্য একজন অনুপস্থিত ছিলেন। নবনির্বাচিত এই নিয়মিত পার্লামেন্টের মেয়াদ ৫ বছর।
এর আগে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর বাংসামোরোতে প্রথমবারের মতো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিলো ৮৪ শতাংশের বেশি।
৬৯ বছর বয়সী নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী আবদুলরাওফ মাকাকুয়া অঞ্চলটিতে ‘স্যামি গাম্বার’ নামেও সুপরিচিত। তাঁর জীবন বাংসামোরোর স্বাধীনতার সংগ্রামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৭১ সালে কিশোর বয়সে তিনি তৎকালীন ফিলিপাইন সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের জ্যেষ্ঠ নেতা এবং সংগঠনটির সশস্ত্র শাখা ‘বাংসামোরো ইসলামিক আর্মড ফোর্সেস’-এর চিফ অব স্টাফ হিসেবে দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেন। শান্তিচুক্তির পর তিনি রাজনৈতিক ধারায় যোগ দেন এবং ২০২৫ সালের মার্চে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন, যা মূলত এই অঞ্চলের প্রথম নির্বাচনের পথ সুগম করে।
পার্লামেন্টের ওয়ালি শেখ মুসলিম গুইয়ামাডেনের কাছে শপথ গ্রহণের পর উদ্বোধনী বক্তব্যে মাকাকুয়া বলেন, প্রকৃত স্বশাসনের লক্ষ্যে আমাদের দীর্ঘ ও বন্ধুর যাত্রায় আজ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ যুক্ত হলো। আমি এই ম্যান্ডেটকে কোনো ব্যক্তিগত বিজয় বা রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে দেখছি না, বরং এটি আমাদের জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের এক গুরুদায়িত্ব।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বাংসামোরো গড়ে তুলতে শুধু অভিন্ন আকাঙ্ক্ষাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য পারস্পরিক আস্থা, বোঝাপড়া এবং মতপার্থক্য দূর করতে সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রয়োজন।
২০১৪ সালে ফিলিপাইন সরকার ও এমআইএলএফের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে ‘বাংসামোরো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল’ গঠিত হয়। দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে বর্তমানে এটি ফিলিপাইনের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চল এবং সরকারি জরিপ অনুযায়ী এখানে সাক্ষরতার হারও সবচেয়ে কম। ফলে নতুন আঞ্চলিক সরকারকে উন্নয়ন কার্যক্রম ও অবকাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য মূলত ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হবে। ২০২৭ সালের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে এই অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ১১৫ বিলিয়ন পেসোর বেশি (প্রায় ১.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে, যা মাকাকুয়া সরকারের জন্য একটি বড় চালিকাশক্তি হবে।
/এমএএইচ/
