অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর পথ কোথায়?
বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে—এমন প্রত্যাশার বিপরীতে একের পর এক সূচকে দুর্বলতার চিত্র ফুটে উঠছে। একদিকে গত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ দশমিক ৬০ শতাংশে উঠেছে, অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসে আরও কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা করা হয়েছে। অর্থাৎ, সাময়িক প্রবৃদ্ধির উল্লম্ফন হলেও অর্থনীতির ভিত্তি এখনো দুর্বল।
বাস্তব অর্থনীতির সাম্প্রতিক সূচকগুলোও এই উদ্বেগকে আরও জোরালো করছে। সেপ্টেম্বরে পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) কমে ৪৮ দশমিক ৬ পয়েন্টে নেমেছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংকোচন নির্দেশ করে। শিল্প উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা—তিন খাতেই দুর্বলতা দেখা গেছে। এলসি খোলার পরিমাণ বাড়লেও মূলধন যন্ত্রপাতি আমদানিতে প্রত্যাশিত গতি নেই। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও মন্থর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজস্ব আদায়ের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক খাতের সংকট। বিপরীতে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তুলনামূলক স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে এখন এক ধরনের দ্বিমুখী পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরলেও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত গতি তৈরি হয়নি।
প্রবৃদ্ধি বাড়লেও টেকসই পুনরুদ্ধার কোথায়?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ০৫ শতাংশ। শেষ প্রান্তিকে শিল্প খাতে ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং উৎপাদনশিল্পে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হিসাব অর্থনীতিতে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। সেবা খাতেও প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ হয়েছে। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি কমে ১ দশমিক ৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
পুরো অর্থবছরের হিসাব অবশ্য ততটা স্বস্তিদায়ক নয়। বিবিএসের সাময়িক হিসাবে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। প্রথম তিন প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক পতন ও শেষ প্রান্তিকে হঠাৎ গতি বৃদ্ধি—এই দুই প্রবণতা পাশাপাশি রেখে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, গত দুই অর্থবছরের গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় সর্বশেষ প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি কিছুটা উৎসাহজনক। বাংলাদেশের প্রয়োজন এবং অর্থনীতির সক্ষমতার তুলনায় এ প্রবৃদ্ধি এখনো অনেক কম।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আগের বছরের শেষ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে কম থাকায় তুলনামূলক ভিত্তির প্রভাবেও এবার প্রবৃদ্ধির হার বেশি দেখা যেতে পারে। জ্বালানি সংকট, বেসরকারি ঋণের মন্থরতা ও বিনিয়োগের দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে এক প্রান্তিকের ইতিবাচক ফলকে অর্থনীতির ব্যাপক পুনরুদ্ধারের প্রমাণ হিসেবে দেখা কঠিন।
এই আশঙ্কার সঙ্গে সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত পিএমআইয়ের চিত্রও সামঞ্জস্যপূর্ণ। মেট্রোপলিটান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের যৌথভাবে প্রকাশিত সূচকে আগস্টের ৪৯ দশমিক ৯ পয়েন্ট থেকে সেপ্টেম্বরে সামগ্রিক পিএমআই কমে ৪৮ দশমিক ৬ পয়েন্টে নেমেছে। উৎপাদন খাতের সূচক ৪৭ দশমিক ৪ থেকে কমে ৪৪ দশমিক ৮ এবং নির্মাণ খাতের সূচক ৫২ দশমিক ৩ থেকে কমে ৪৮ দশমিক ৫ হয়েছে। সেবা খাতের সূচকও ৪৯ পয়েন্টে নেমে সংকোচনের অবস্থানে রয়েছে। বিপরীতে কৃষি খাত ৫৫ দশমিক ২ পয়েন্ট নিয়ে সম্প্রসারণের ধারায় থাকলেও আগের মাসের তুলনায় সেখানে গতি কমেছে।
জিডিপির প্রবৃদ্ধি ও পিএমআইয়ের ফলের মধ্যে এই পার্থক্যকে সরাসরি বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জিডিপি একটি নির্দিষ্ট সময়ের উৎপাদনের পরিমাপ, আর পিএমআই মূলত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সাম্প্রতিক পরিবর্তন সম্পর্কে জরিপভিত্তিক ধারণা দেয়। তবে দুটি সূচক একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, শেষ প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি এখনো অর্থনীতির সর্বত্র শক্তিশালী ও টেকসই গতিতে রূপ নেয়নি।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক মনে করেন, উৎপাদনশিল্পে এতোটা প্রবৃদ্ধি বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি মেলানো কঠিন। তার মতে, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের দুর্বলতার মধ্যেও উৎপাদনশিল্পে এতো বড় প্রবৃদ্ধির কারণ আরও বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আগের অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ দশমিক ০৫ শতাংশে নেমে গিয়েছিলো। সেই দুর্বল ভিত্তির তুলনায় এবার প্রবৃদ্ধির হার স্বাভাবিকভাবেই বেশি দেখাচ্ছে। তাই এটিকে অর্থনীতিতে ব্যাপক ও শক্তিশালী গতি ফিরে আসার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পূর্বাভাসে উদ্বেগ
প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়নও সতর্কবার্তা দিচ্ছে। গত ৬ অক্টোবর বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে। সংস্থাটির মতে, জ্বালানি ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এরপর ১৩ অক্টোবর আইএমএফ চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনে, যা এপ্রিলের ৪ দশমিক ৩ শতাংশের পূর্বাভাসের চেয়ে ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট কম।
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অবশ্য চূড়ান্ত ফল নয়; অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নীতিগত পদক্ষেপ ও বৈশ্বিক পরিবেশের পরিবর্তনে তা বদলাতে পারে। তবে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ উভয়েই যখন দুর্বল প্রবৃদ্ধির আশঙ্কা করছে, তখন সেটিকে বিচ্ছিন্ন পূর্বাভাস হিসেবে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বরং বিনিয়োগ, উৎপাদন, রাজস্ব ও কর্মসংস্থানের দুর্বলতা কাটাতে নীতিগত পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেই প্রশ্ন সামনে আসে।
এলসি বাড়লেও বিনিয়োগের সংকেত দুর্বল
অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি বুঝতে আমদানি ও মূলধনি যন্ত্রপাতির চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কাঁচামাল ও জ্বালানি আমদানি বর্তমান উৎপাদন সচল রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও মূলধন যন্ত্রপাতি আমদানি নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি ও শিল্প সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরে আমদানি এলসি খোলার পরিমাণ বেড়ে ৮১০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালের এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ। আগের বছরের একই মাসে এর পরিমাণ ছিলো ৬৬২ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরে এলসি খোলার অঙ্ক বেড়েছে ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এই বৃদ্ধির বড় কারণ হিসেবে জ্বালানি ও কাঁচামালের মূল্য বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এলসি খোলার মূল্য বেড়েছে মানেই আমদানির প্রকৃত পরিমাণ বা নতুন বিনিয়োগ সমান হারে বেড়েছে, এমন নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়লে একই পরিমাণ পণ্য আমদানিতেও বেশি অর্থ ব্যয় হতে পারে।
অন্যদিকে, মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি ও এলসি নিষ্পত্তির প্রবণতা বিনিয়োগের দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই পরিসংখ্যানে কৃষিযন্ত্র আমদানিতে অর্থায়ন সংকট এবং ২০২২-২০২৩ থেকে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের মধ্যে মূলধন যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি ৪৮ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। ফলে সামগ্রিক আমদানি ব্যয় বাড়লেও শিল্পের উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ একই গতিতে বাড়ছে না।
এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। উচ্চ সুদহার, ঋণের সীমিত প্রাপ্যতা, ডলারের ব্যয়, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ চাহিদা নিয়ে সংশয় উদ্যোক্তাদের নতুন প্রকল্প গ্রহণে নিরুৎসাহিত করছে। বিনিয়োগের পরিবেশে আস্থা না ফিরলে শুধু এলসি খোলার পরিমাণ বাড়িয়ে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি গতি ফেরানো সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বেসরকারি ঋণপ্রবাহে স্থবিরতা
ব্যাংকঋণ বেসরকারি বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান অর্থায়ন উৎস। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। টানা ছয় মাস ধরে এই প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে।
ঋণপ্রবৃদ্ধির এই মন্থরতা শুধু ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার সমস্যা নয়; ঋণ নেওয়ার মতো নতুন বিনিয়োগ প্রকল্প ও ব্যবসায়িক চাহিদার দুর্বলতাও এর পেছনে ভূমিকা রাখছে। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন বাড়ানো কতটা লাভজনক হবে, তা নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ও ব্যাংক খাতের সুশাসনসংকট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতাও কমিয়ে দিয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নে। নতুন বিনিয়োগ কমায় শিল্পের উৎপাদনক্ষমতা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, আর বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন কর্মী নিয়োগ বা ব্যবসা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এভাবে বিনিয়োগের দুর্বলতা একসময় সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ওপরই চাপ তৈরি করবে।
চাপে সরকারি অর্থব্যবস্থা
অর্থনীতির সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর একটি রাজস্ব আহরণে ঘাটতি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, বিপরীতে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ৮৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
রাজস্ব আদায়ে এই ঘাটতির প্রভাব হচ্ছে বহুমুখী। সরকারের পরিচালন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অর্থায়নের পাশাপাশি অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও রাজস্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ দুর্বল হওয়ায় সরকারকে ব্যয় সংকোচন, ঋণ গ্রহণ কিংবা উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন পুনর্বিন্যাসের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এতে একদিকে উন্নয়ন ব্যয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণনির্ভর অর্থায়ন বাড়ায় সুদ পরিশোধের চাপও বাড়ছে।
বাংলাদেশের রাজস্ব সমস্যার পেছনে করের সংকীর্ণ ভিত্তি, কর ফাঁকি, কর প্রশাসনের দুর্বলতা ও করব্যবস্থার জটিলতা দীর্ঘদিনের ভূমিকা রাখছে। অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই অনুপাতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে সরকারের উন্নয়ন চাহিদা ও অর্থায়ন সক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকও তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য জরুরি সংস্কার হিসেবে উল্লেখ করেছে।
প্রবাসী আয়ই অর্থনীতির বড় ভরসা
অর্থনীতির দুর্বল সূচকগুলোর মধ্যেও প্রবাসী আয় তথা রেমিট্যান্স তুলনামূলক ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রবাসী আয় এসেছে ৮৪৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়াতে, আমদানি ব্যয় মেটাতে এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করছে। বিশ্বব্যাংকও শক্তিশালী প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতিকে বাংলাদেশের বহিঃখাতের তুলনামূলক স্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
প্রবাসী আয় বাড়লেই সামগ্রিক অর্থনীতির দুর্বলতা দূর হয় না। রেমিট্যান্সের বড় অংশ পরিবারগুলোর ভোগব্যয়, বাসস্থান, শিক্ষা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর একটি অংশ সঞ্চয় ও বিনিয়োগে রূপান্তরিত হলেও সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে কতোটা যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রবাসী আয়ের এই ইতিবাচক প্রবাহকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হবে।
মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানে চাপ
অর্থনীতির পুনরুদ্ধার কেবল জিডিপির হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না; মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে এবং আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্থবির হয়েছে ও নারীরা চাকরি হারিয়েছেন।
মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন উচ্চ পর্যায়ে থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোর খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন ও চিকিৎসার ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে ভোগব্যয় সংকুচিত হচ্ছে, বাজারে পণ্যের চাহিদা দুর্বল হচ্ছে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিক্রি ও মুনাফা চাপে পড়ছে। ফলে অর্থনীতিতে একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি হচ্ছে। কারণ চাহিদা কমায় উৎপাদন ও বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে, আর বিনিয়োগ কমায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু সামষ্টিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। কর্মসংস্থাননির্ভর শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং শ্রমঘন উৎপাদন খাতকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতার বাইরে। ফলে সহায়তা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি উপকারভোগী নির্বাচন ও অর্থ বিতরণে স্বচ্ছতা জরুরি।
সংকট থেকে উত্তরণের উপায়
বাংলাদেশের অর্থনীতির বিদ্যমান সংকটজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিচ্ছিন্ন কিছু পদক্ষেপের বদলে সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
প্রথমত, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ আদায় ও ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদনশীল বিনিয়োগের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বাড়াতে হবে, যাতে সুদহার ও ঋণপ্রাপ্তির বাধা উদ্যোক্তাদের নতুন প্রকল্প গ্রহণে নিরুৎসাহিত না করে।
দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা কমানো জরুরি। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমাতে পারে। পাশাপাশি বন্দর, পরিবহন ও শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও দূর করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব আলী বলেন, অর্থনীতির গতি ফেরাতে রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি রোধ, ডিজিটাল করব্যবস্থা ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর মাধ্যমে সরকারের অর্থায়ন সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। তিনি বলেন, সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল, ব্যয় ও বাস্তবায়নের দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মাহবুব আলী বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যবসার পরিবেশের বাস্তব উন্নতি প্রয়োজন। পাশাপাশি নীতির ধারাবাহিকতা, দ্রুত অনুমোদন, চুক্তির সুরক্ষা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু করছাড় বা প্রণোদনা দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়।
সবশেষে, অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল্যায়নে প্রবৃদ্ধির হার ছাড়াও নতুন বিনিয়োগ, মূলধন যন্ত্রপাতি আমদানি, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, প্রকৃত মজুরি ও রাজস্ব আহরণের প্রবণতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, টেকসই প্রবৃদ্ধি তখনই সম্ভব, যখন তার সুফল উৎপাদন বাড়ানো, ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রতিফলিত হয়।
সামনে কঠিন পরীক্ষা
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবাহ এবং বৈদেশিক খাতের তুলনামূলক স্থিতিশীলতা কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। কিন্তু শিল্প, নির্মাণ ও সেবা খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা, বেসরকারি ঋণের মন্থরতা এবং রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি সেই স্বস্তিকে টেকসই পুনরুদ্ধারে রূপ দিতে পারছে না। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও অর্থনীতির সামনে থাকা ঝুঁকির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সাময়িক পরিসংখ্যানের ইতিবাচক দিক দেখে আত্মতুষ্টিতে না ভোগা। শেষ প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি বাড়া অবশ্যই স্বস্তির খবর, কিন্তু পরবর্তী সময়ে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে গতি না ফিরলে সেই প্রবৃদ্ধির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। একইভাবে আমদানি এলসির মূল্য বাড়লেও যদি মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ও নতুন বিনিয়োগ না বাড়ে, তবে উৎপাদনক্ষমতা সম্প্রসারণের পথ সংকুচিত হবে।
অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে ফেরাতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো, আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করা এবং কর্মসংস্থানকে নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে। প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবাহকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কাজে লাগানোর সুযোগও তৈরি করতে হবে। সংস্কারের অগ্রগতি দৃশ্যমান হলে তবেই পূর্বাভাসের সংখ্যার বাইরে বাস্তব অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসবে। বাংলাদেশের সামনে এখন মূল প্রশ্ন শুধু কত প্রবৃদ্ধি হবে, তা নয়; বরং সেই প্রবৃদ্ধি কতোটা টেকসই, কতোটা কর্মসংস্থানমুখী ও কতোটা সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারবে।
