বিগ-বি থেকে ‘শেয়ারড প্রস্পারিটি’: অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে বাংলাদেশ-জাপান নতুন সমীকরণ
ওএসবি গ্রাফিক্স
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার চার দিনের জাপান সফর শেষ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি ছিলো তার তৃতীয় কোনো দেশ সফর। সফর শেষে এখন চলছে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছিলো। সফরের পর সেই প্রত্যাশায় কতোটা প্রাপ্তিযোগ হয়েছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে তারই চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব জোরদার ও বড় অঙ্কের বিনিয়োগের আশ্বাসের মধ্য দিয়ে সফরটি শুরু হয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ ছাপিয়ে ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিগ-বি) উদ্যোগ ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’তে রূাপান্তরিত হয়ে সফরের বড় অর্জনের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে।
গত ২৬ অক্টোবর চার দিনের সরকারি সফরে জাপানে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা এবং বিভিন্ন শিল্প কারখানা পরিদর্শনের ব্যস্ত কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে তার চার দিনের জাপান সফর। বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদারিত্বের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে সফরটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকরাা বলছেন, সফরের বড় প্রাপ্তি হিসাবে এসেছে আগামী পাঁচ বছরে জাপানের বেসরকারি খাতের এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের পূর্বাভাস, দুই লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা এবং মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা। সফরে ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ উদ্যোগটি নতুন কাঠামোয় সম্প্রসারণের অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ ও জাপান। এরই অংশ হিসেবে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে শিল্প, জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা কথা জানিয়েছে জাপান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বিগ-বির নতুন নাম ঘোষণা করা হয়, ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ । নতুন কাঠামোর লক্ষ্য, বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো এবং অভিন্ন সমৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা।
বিশ্লেণষকরাও মনে করছেন, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এবং মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা সফরের গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য যে ধরনের আর্থিক নিশ্চয়তা প্রয়োজন, এই সফরে তার একটি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। আবার দুই দেশের যৌথ ঘোষণাটিও বেশ ‘ভালোভাবে’ তৈরি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলোও সফরের ভালো প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়। তাদের মতে, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, আঞ্চলিক যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যয় ভাগাভাগি এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
প্রত্যাশায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ
সফরের অন্যতম প্রধান চমক হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে জাপানি বেসরকারি খাত থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি ইয়েন (প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার) বিনিয়োগের ‘সম্ভাবনা’ ও দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের বিনিয়োগ আকর্ষণে পাঁচটি অগ্রাধিকার খাতের কথা তুলে ধরেছেন। এগুলো হলো গাড়ি উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা, দ্রুতগতির রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ।
বাংলাদেশে জাপানের একটি বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন চলছে। এটি জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং জাপানি একটি কোম্পানি এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়ন কাজ করছে। ফলে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে এই বিনিয়োগ বাস্তবায়ন সহজ হবে। বিশেষ করে দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গ্যাস-বিদ্যুতের চরম সংকট এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দ্রুত নিরসন করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। তাই চীনের পাশাপাশি জাপানের বিনিয়োগও কিভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে জাপানের বিনিয়োগ বাড়লে তা দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে।
বিগ-বি ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি
বঙ্গোপসাগর ঘিরে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় নানা পরিকল্পনা নিচ্ছে চীন, জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ। এমন প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়াতে দীর্ঘদিনের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিগ-বি) উদ্যোগ নতুন কাঠামোয় সম্প্রসারণের অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ ও জাপান। অর্থাৎ বৈশ্বিক বাস্তবতায় নিজেদের সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা বাড়াতে বিগ-বি উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছে দুই দেশ।
এরই অংশ হিসেবে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি ও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বিগ-বির নতুন নাম ঘোষণা করা হয়, ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’। নতুন কাঠামোর লক্ষ্য, বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো এবং অভিন্ন সমৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা।
এর লক্ষ্য শিল্পের মূল্য সংযোজন ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে তোলা, বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি বাড়ানো।
এ জন্য চারটি ক্ষেত্রে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন; প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি ও নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বাড়ানো; এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা জোরদার করা।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়লে বাংলাদেশের বন্দর ও পরিবহন অবকাঠামো ব্যবহারের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিগ-বির নতুন কাঠামোয় ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করার ঘোষণা যৌথ বিবৃতিতে নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, আগের পরিকল্পনার তুলনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব এবং যোগাযোগের বিস্তৃত ধারণা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের পররাষ্ট্রনীতিতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমন্বয় গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই দুই বিষয় প্রাসঙ্গিক।
ঐতিহাসিকভাবে সমুদ্রপথে যোগাযোগের জন্য নেপাল, ভুটান, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জাপান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কার্যক্রম চালাচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও জাপানের কৌশলগত বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত কামরুল আহসান। তার মতে, বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে; জাপানও এ গুরুত্ব স্বীকার করছে। তবে বিগ-বি উদ্যোগের আঞ্চলিক বিস্তৃতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
এছাড়া, বিগ-বি উদ্যোগ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই মাতারবাড়ীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছিলো। অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। এ অবস্থায় জাপানের সম্পৃক্ততা দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এবার এই সফরের মধ্যদিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে আস্থার পরিবেশ বজায় রাখতে জাপান এক ধরনের নিশ্চয়তাদাতার ভূমিকা পালন করেছে।
মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে উঠলে তা শুধু ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নয়, নেপাল ও ভুটানের জন্যও বাড়তি সুবিধা তৈরি করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ঐতিহাসিক কারণে রাজনৈতিক অনাস্থা থাকলেও তা কাটিয়ে উঠতে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।
তবে ভবিষ্যতে যোগাযোগ অবকাঠামো নিয়ে যেসব চুক্তি হবে, সেগুলোতে বাংলাদেশের স্বার্থ কিভাবে সুরক্ষিত থাকবে, তা নিশ্চিত করা দরকার। বিশেষ করে, সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি এর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কে বহন করবে, তা চুক্তিতে স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সড়ক ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহন করা হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দায়িত্বও পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করতে হবে। এই ধরনের উদ্যোগে বাংলাদেশের ওপর যেন অসমভাবে ব্যয়ের বোঝা না পড়ে, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
ঋণ ও সহযোগিতার প্রকৃত রূপ
সফরে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় দলিল ও সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং দুটি প্রকল্পে প্রায় ২৯ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৪৬.৫৬ বিলিয়ন ইয়েন) ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মিলেছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশই হলো উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের মতো কাজের জন্য। দেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট বা জ্বালানি খাতের হাহাকারের তুলনায় এই ঋণের পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। তাছাড়া, জাপান যে ৫ হাজার কোটি ইয়েনের (প্রায় ৩২ কোটি ডলার) ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের জরুরি সহায়তার কথা বলেছে, তাও মূলত সম্ভাব্যতা যাচাই ও দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে, যা চলমান তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে কোনো কাজে আসছে না। তবে আশার বিষয় হলো, জাপান সাধারণত যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশটির সুনাম রয়েছে।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ)
বাংলাদেশ-জাপানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় অর্জন হলো অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি বা ইপিএ। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে বর্তমান পর্যায় থেকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার মূল চাবিকাঠি হলো এই ইপিএ। চলতি (২০২৬) বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো। বাংলাদশের প্রধানমন্ত্রীর টাকিও সফরকালে এই চুক্তিটি দ্রুত কার্যকর ও বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, সব প্রক্রিয়া শেষ করে ২০২৭ সালের প্রথমার্ধের মধ্যেই এটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হবে।
মূলত এই ইপিএ স্বাক্ষরের আলোকেই জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানা তাকাইচি ও বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যকার বৈঠকের পর জানানো হয়েছে যে, জাপান আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশে বেসকারি খাতে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ৬৩৪ কোটি মার্কিন ডলার) বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সফরকালে দুই প্রধানমন্ত্রীর যৌথ ঘোষণায়ও এই বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর দুই দেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ঝালাইয়ের জন্য হয়তো একটি নিয়মিত কূটনৈতিক ধাপ ছিলো, কিন্তু এটিকে গণমানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি বা দৃশ্যমান পরিবর্তনের মাপকাঠিতে সফলতা বলা চলে না। জনগণের মনে যে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা তৈরি করা হয়েছিলো, তার বিপরীতে প্রাপ্তিতে বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে। তাই কথার আড়ম্বর আর প্রতিশ্রুতির মোহজাল কাটিয়ে দেশের স্বার্থ রক্ষা এবং বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সফল না হতে পারলে এই ধরনের সফর শুধুই আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হবে।
সবমিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর বাংলাশে তার অর্থনৈতিক কূটনীতিতে একটি নতুন পালক যুক্ত করতে পেরেছে। যে প্রত্যাশা নিয়ে এই সফর শুরু হয়েছিলো, সেই প্রত্যাশার ভিত্তি রচিত হয়েছে। এখন এই ভিত্তির ওপর নতুন স্বপ্ন গড়ে তুলতে হলে বাংলাদেশই বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা; এই তিন সমস্যার সমাধান জরুরি করতে হবে।
/কেআর/শান্ত/
