বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার
পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন দীপ
বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় আটক আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, আমরা সেখানে (ঘটনাস্থলে) কথা বলছিলাম। এই সময় কিছু লোক আমাদের ধাওয়া করে। তখন তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং আমি পালিয়ে আসি।
‘বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই’ পরিচয় দেওয়া এই দীপের ডাকেই নিখোঁজ হওয়ার আগে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁকে হেফাজতে নেওয়ার পর রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর।
পিবিআই মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, আমরা দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। তাঁর দেওয়া বিভিন্ন তথ্য আমরা যাচাই-বাছাই করেছি। আমরা আসলে প্রকৃত সত্য জানার জন্য তদন্ত করছি। তারা ওইখানে কেন গিয়েছিলেন, তাঁকে কেউ হত্যা করেছে না কি দুর্ঘটনা, না কি আত্মহত্যা, এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজছি। এখন পর্যন্ত যেসব উত্তর পাওয়া গেছে, সেগুলো যাচাই করা প্রয়োজন। আপাতত আমরা তদন্ত করছি, রহস্য উদঘাটন হলে পরে জানানো হবে।
বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানান, দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তা প্রকাশ করা হচ্ছে না।
এদিকে তুরাগ নদে তাহসিফের ভাসমান মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার দূরে টঙ্গী পশ্চিম থানার অধীন মাজার বস্তি এলাকায় নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটি রাজধানীর উত্তরখান থানায় নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার তদন্তে নৌ পুলিশকে সহায়তা করছে পিবিআই।
পিবিআইয়ের অন্য এক পুলিশ সুপার জানান, দীপের দেখানো তথ্যের ভিত্তিতেই মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। নম্বরপ্লেট না থাকায় মালিকানা যাচাই চলছে। তবে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, তাহসিফও ঘর থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন।
পিবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, রাজবাড়ী ঘাট এলাকাটি মাদকের স্পট হিসেবে পরিচিত। মাদক কারবারিদের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদে পড়ে ডুবে যেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম জানান, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় দীপের ফোন পেয়েই বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মায়ের মোবাইলে একটি বার্তা পাঠিয়ে তাহসিফ জানান, তিনি বাড়ি ফিরছেন। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ মেলেনি। পরদিন বুধবার বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
তাহসিফের মৃত্যু নিয়ে তাঁর বাবা কেএম এনায়েতুল করিম সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছেন, এটা আত্মহত্যা নয়। সরকার তদন্ত করলে প্রকৃত অপরাধীদের বের করতে পারবে।
তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর আগে বাসার নিচে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার কথা বলা ও হাত মেলানোর একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামনে এসেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যার ওই সিসিটিভি ফুটেজে সবুজ পাঞ্জাবি পরা তাহসিফকে ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে ও হাত মেলাতে দেখা যায়। তাহসিফের পরিবারের সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে তাঁর ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপ হিসেবে শনাক্ত করেন।
ফুটেজে দেখা যায়, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে তাহসিফের সঙ্গে ওই ব্যক্তির দেখা হয়। হাত মেলানোর পর তারা আলাদা দু’টি মোটরসাইকেলে সেখান থেকে চলে যান।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপের ডাকে সাড়া দিয়ে তাহসিফ বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। পরে দীপ জানিয়েছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা থাকায় তাঁরা ওয়ার্কশপে যান। মোটরসাইকেল ঠিক করার পর তাঁরা বাসায় ফিরে খাবার খান। এরপর সেখান থেকে চলে যান বলে দাবি করেন দীপ। তবে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দীপের ভূমিকা কী, তা তদন্তসাপেক্ষ।
এর আগে, ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। পরে টঙ্গী নদী পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন। হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে মরদেহটি তাহসিফ সাউরির বলে শনাক্ত করা হয়।
পরদিন বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। বিকেল সাড়ে ৪টা ৩৫ মিনিটে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
/এমএএইচ/
