টিকে থাকতে পারলো না ‘কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি’
ক্রমাগত লোকসান ও তীব্র ব্যবসায়িক মন্দার কারণে অবশেষে বন্ধ হয়ে গেছে রাজধানীর একসময়ের অন্যতম অভিজাত শপিংমল শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ের ‘কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি’। ১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরু করা এই ঐতিহ্যবাহী বিপণিবিতানটি দীর্ঘ ২৮ বছর পর গত ১ অক্টোবর থেকে তাদের সমস্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
ব্যবসায়ীদের মতে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই বিপণিবিতানটি ধীরে ধীরে তার গুরুত্ব হারাচ্ছিলো। ২০১৬-১৭ সালের দিকে শান্তিনগর ফ্লাইওভার নির্মাণকাজের সময় সংলগ্ন সড়কে তীব্র যানজট, ধুলাবালি ও চলাচলের চরম ভোগান্তি তৈরি হয়। ওই সময়েই মূলত এর ব্যবসায়িক পতন শুরু হয় এবং অনেক নামী ব্র্যান্ড ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী অন্য মার্কেটে চলে যান, যা পরে আর পুনরুদ্ধার করা যায়নি।
বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালের মন্দা এই মার্কেটের ব্যবসায়িক মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে দেয়। একের পর এক দোকান বন্ধ হতে শুরু করে। বিপণিবিতানটিতে ক্রেতাদের জন্য এক ছাদের নিচে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পণ্যের পর্যাপ্ত বৈচিত্র্য ছিলো না। পাশাপাশি কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নিম্নমানের পণ্যকে বিদেশি বা নামী ব্র্যান্ডের বলে চালিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, যা ক্রেতাদের আস্থা চিরতরে কমিয়ে দেয়।
ফেসবুক ও ই-কমার্স ভিত্তিক অনলাইন কেনাকাটার ব্যাপক প্রসার এবং বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কের মতো আধুনিক, বিশাল শপিং মলগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি।
২০ তলা বিশিষ্ট এই ভবনের নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলতো। চালুর সময় মোট দোকান ছিলো ১৯৮টি, কিন্তু বন্ধের ঠিক আগমুহূর্তে সচল ছিলো মাত্র ১৭টি দোকান। বাকি সব দোকান ক্রেতাশূন্যতার কারণে আগেই বন্ধ হয়ে যায়।
মার্কেটটি সচল রাখতে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকা পরিচালন ব্যয়ের প্রয়োজন হতো। তবে গত ৬ মাসে সার্ভিস চার্জ বাবদ মাসে মাত্র ১ থেকে দেড় লাখ টাকার বেশি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। দোকান মালিক সমিতির কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত ঋণ নিয়ে আরও ৬ থেকে ৮ মাস মার্কেটটি চালু রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও বকেয়া বিদ্যুৎ বিল ৬০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত দোকানমালিকদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই বন্ধের সিদ্ধান্তটি কেবল ভবনের বাণিজ্যিক অংশের (নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা) জন্য প্রযোজ্য। ওপরের তলার আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টগুলো আগের মতোই চালু রয়েছে। একসময় কর্ণফুলী গ্রুপের উদ্যোগে নির্মিত এই মার্কেটের অধিকাংশ দোকান আগেই ব্যক্তিমালিকানায় বিক্রি হয়ে গিয়েছিলো। বর্তমানে মালিকেরা পুরো বাণিজ্যিক অংশটি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিতে বা বিক্রি করতে চাচ্ছেন। যদিও গত দুই বছর ধরে উপযুক্ত কোনো গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরিবর্তিত আধুনিক বাজার ব্যবস্থার সাথে তাল মেলাতে না পারলে যেকোনো প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানও যে বিলুপ্ত হতে পারে, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির এই পরিণতি তারই এক বাস্তব উদাহরণ।
/এমএএইচ/
