সমুদ্রের পানি নীল দেখায় কেন?
ছবি: সংগৃহীত
সমুদ্রের দিকে তাকালে কখনও চোখে পড়ে গাঢ় নীল জলরাশি, কখনও ফিরোজা, সবুজাভ কিংবা ধূসর পানি। অনেকের ধারণা, আকাশের নীল রং প্রতিফলিত হওয়ার কারণেই সমুদ্রকে নীল দেখায়। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে আরও গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। সূর্যের আলো, পানির আলোক শোষণ ও বিচ্ছুরণ এবং সমুদ্রে থাকা বিভিন্ন উপাদান পানির রং নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
সূর্যের আলো কীভাবে সমুদ্রকে নীল করে?
সূর্যের সাদা আলো বিভিন্ন রঙের আলোর সমষ্টি। এসব রঙের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যও আলাদা। আলো পানিতে প্রবেশ করলে পানি সব রঙের আলো সমানভাবে শোষণ করে না। লাল, কমলা ও হলুদের মতো তুলনামূলক দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো বেশি শোষিত হয়। অন্যদিকে, নীল আলো পানির মধ্যে তুলনামূলক বেশি দূর পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে।
পানির অণুর সঙ্গে আলোর মিথস্ক্রিয়ার ফলে আলোর কিছু অংশ বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেই নীল আলোর একটি অংশ আমাদের চোখে পৌঁছায় বলেই গভীর ও স্বচ্ছ সমুদ্রকে নীল দেখায়।
সহজভাবে বললে, সমুদ্রের পানি সব রঙের আলো সমানভাবে প্রতিফলিত করে না। পানির মধ্যে আলোর শোষণ ও বিচ্ছুরণের কারণে নীল রং তুলনামূলক বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
আকাশের প্রতিফলনের ভূমিকা কতটুকু?
সমুদ্রের পানিতে আকাশের নীল রং প্রতিফলিত হতে পারে। বিশেষ করে শান্ত পানিতে আকাশ, মেঘ ও আশপাশের দৃশ্যের প্রতিফলন স্পষ্ট দেখা যায়। তবে সমুদ্রের নীল রঙের একমাত্র কারণ এটি নয়। পানির নিজস্ব আলোক শোষণ ও বিচ্ছুরণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পানির নিচেও নীল আভা দেখা যাওয়ার বিষয়টি এর প্রমাণ।
সব সমুদ্রের রং এক রকম নয় কেন?
সমুদ্রের রং নির্ভর করে পানির গভীরতা, স্বচ্ছতা, তলদেশের প্রকৃতি এবং পানিতে মিশে থাকা বিভিন্ন উপাদানের ওপর। অগভীর ও স্বচ্ছ পানিতে সূর্যের আলো বালুময় তলদেশ বা প্রবালপ্রাচীরে পৌঁছে প্রতিফলিত হতে পারে। ফলে ক্যারিবীয় অঞ্চলের মতো অনেক জায়গায় পানি ফিরোজা বা নীলচে-সবুজ দেখায়।
অন্যদিকে, নদী থেকে বয়ে আসা পলি, বালি ও অন্যান্য কণা পানিতে মিশলে সমুদ্রের পানি ঘোলাটে বাদামি কিংবা ধূসর দেখাতে পারে। ঝড়ের পর ঢেউ সমুদ্রতলের পলি তুলে আনলেও পানির রং বদলে যায়।
সমুদ্রে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন বা অতি ক্ষুদ্র সালোকসংশ্লেষকারী জীবের পরিমাণ বেশি থাকলেও পানির রং পরিবর্তিত হতে পারে। এসব জীবের মধ্যে থাকা ক্লোরোফিলসহ বিভিন্ন রঞ্জক পদার্থ আলোর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করে। ফলে কিছু অঞ্চলে সমুদ্রের পানি সবুজাভ দেখায়। তবে পানির রং দেখেই সেখানে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের পরিমাণ নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
সমুদ্রের গভীরে আলো কমে যায় কেন?
সমুদ্রের গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আলো ক্রমশ দুর্বল হয়ে আসে। লাল ও কমলা রঙের আলো তুলনামূলক অগভীর স্তরেই বেশি শোষিত হয়। নীল আলো তুলনামূলক বেশি গভীরে পৌঁছাতে পারে। তবে গভীরতা বাড়লে নীল আলোও শোষিত ও বিচ্ছুরিত হতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রে প্রায় ২০০ মিটার গভীরতার পর আলো উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। প্রায় ১ হাজার মিটারের নিচে সূর্যের আলো কার্যত পৌঁছায় না। ফলে গভীর সমুদ্রের অধিকাংশ অঞ্চল অন্ধকারে থাকে।
সমুদ্রের রং দেখে কী জানা যায়?
সমুদ্রের রং শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণারও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। উপগ্রহের মাধ্যমে সমুদ্রের রং পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা পানিতে ক্লোরোফিলের পরিমাণ, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের উপস্থিতি ও ভাসমান কণার মতো বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। তবে এসব তথ্য বিশ্লেষণের সময় পানির গভীরতা, স্বচ্ছতা এবং অন্যান্য উপাদানের প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হয়।
অর্থাৎ, সমুদ্রের নীল রঙের পেছনে রয়েছে আলোর সঙ্গে পানির জটিল মিথস্ক্রিয়া। আকাশের প্রতিফলন সমুদ্রের সৌন্দর্য বাড়ালেও পানির নিজস্ব আলোক শোষণ ও বিচ্ছুরণই এর রঙের অন্যতম প্রধান বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
/শান্ত/
