জলবায়ু-স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় বাংলাদেশের স্কোর ১৩, অর্থায়নে শূন্য
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় স্বাস্থ্যগত সুফল বিবেচনায় ৩২-এর মধ্যে ১৩ পয়েন্ট পেয়েছে বাংলাদেশ। জলবায়ু ও স্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যক্রমের অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে কোনো পয়েন্ট পায়নি দেশটি।
গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ অ্যালায়েন্স (জিসিএইচএ) প্রকাশিত ২০২৬ সালের ‘হেলদি এনডিসি স্কোরকার্ডে’ এই তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে ৮টি বিভাগে ১৩২টি দেশের ১১৭টি জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনা মূল্যায়ন করে এই স্কোরকার্ড তৈরি করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যগত সহ-সুফলের স্বীকৃতিতে বাংলাদেশ ৪-এর মধ্যে ৪ এবং স্বাস্থ্য খাতের কার্যক্রমে ৪-এর মধ্যে ৩ পয়েন্ট পেয়েছে। বায়ুদূষণ ও সমন্বিত শাসনব্যবস্থায় পেয়েছে ২ পয়েন্ট করে। স্বাস্থ্যগত প্রভাব ও ন্যায়সংগত রূপান্তরে পেয়েছে ১ পয়েন্ট করে।
মূল্যায়নে বাংলাদেশের সমান ১৩ পয়েন্ট পেয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ইন্দোনেশিয়ার স্কোর ১১ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১২। সর্বোচ্চ ২৯ পয়েন্ট পেয়েছে কলম্বিয়া। নাইজেরিয়া ২৫ এবং কম্বোডিয়া ২৪ পয়েন্ট নিয়ে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। জাপান, ভারত ও নিউজিল্যান্ড পেয়েছে মাত্র ২ পয়েন্ট করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সর্বোচ্চ স্কোর পাওয়া ২০টি দেশের মধ্যে ১৯টিই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আওতায় দেশগুলো জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পরিকল্পনা জমা দেয়। বাংলাদেশের পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর এবং টেকসই পরিবেশের অধিকার স্বীকার করা হয়েছে। জাতীয় জলবায়ু কার্যক্রমে জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
মূল্যায়নে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষম স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে আগাম পরামর্শসেবা চালু এবং জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। চিকিৎসাশিক্ষার পাঠ্যক্রম ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণেও জলবায়ু ও স্বাস্থ্যবিষয়ক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য পোড়ানো ছাড়া অন্যান্য পদ্ধতির ব্যবহার, হাসপাতালে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যমান সরকারি ভবন, প্রতিষ্ঠান, বিদ্যালয় ও হাসপাতালের ৫০ শতাংশে এবং নতুন এসব স্থাপনার সবগুলোতে ছাদে সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ।
পরিবহণ, কৃষি, পানি, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জলবায়ুবান্ধব উদ্যোগের স্বাস্থ্যগত সুফলও তুলে ধরা হয়েছে মূল্যায়নে। এর মধ্যে রয়েছে হাঁটা ও সাইকেল চালানো উৎসাহিত করা, জলবায়ু সহনশীল খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য বজায় রাখা এবং পুষ্টির মান উন্নত করা।
পয়োনিষ্কাশন, কঠিন বর্জ্য ও পানি সরবরাহসেবা থেকে নির্গমন কমালে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি হবে, বিশেষ করে শিশু ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে। পাশাপাশি, বন্যা ও চরম আবহাওয়ার সময় এবং পরে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি কমাতে সহনশীল পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে বায়ুদূষণ কমানো এবং পরিচ্ছন্ন রান্নার ব্যবস্থা উৎসাহিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর লক্ষ্য শিশুদের শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষা। এছাড়া ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরের ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাকে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
‘স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার’-এর তথ্য উদ্ধৃত করে স্কোরকার্ডে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ২৫৯ দশমিক ২।
জিসিএইচ-এর নির্বাহী পরিচালক ডা. জেনি মিলার বলেন, সরকারগুলোকে বুঝতে হবে, কার্যকর জলবায়ু পদক্ষেপের জন্য বায়ুর মান উন্নত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
মূল্যায়নে অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের শূন্য স্কোর জলবায়ু ও স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
বৈশ্বিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। প্যারিস চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সহায়তা পাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
নীতিনির্ধারকদের জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনার শক্তিশালী দিক, ঘাটতি ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করতে সহায়তা করাই এই স্কোরকার্ডের উদ্দেশ্য। পাশাপাশি, বিভিন্ন দেশ জলবায়ু প্রতিশ্রুতিতে স্বাস্থ্যকে কতোটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা তুলনা করার সুযোগও তৈরি করে এটি।
/কেআর/এমএএইচ/
