Advertisement(970X90).png
Advertisement(300X90).png

১৫ কার্তিক ১৪৩৩, ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে কোথায় কী ঘটছে?
এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে কোথায় কী ঘটছে?

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তাসংস্থা এএফপি। প্রবালপ্রাচীর ও বনাঞ্চলে বাড়তি ঝুঁকি জাতিসংঘের প্রকৃতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের চেয়ারম্যান ডেভিড ওবুরা এএফপিকে বলেন, চলতি বছরের এল নিনো বিশ্বের প্রবালপ্রাচীরগুলোর জন্য ‘ভয়াবহ মাত্রায় বাড়তি ঝুঁকি’ তৈরি করছে। প্রবালগুলো তাপমাত্রার পরিবর্তনে অত্যন্ত সংবেদনশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রবালের বিবর্ণ হয়ে যাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটছে এবং এর তীব্রতাও বাড়ছে। স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি বড় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০৮ সালের সর্বশেষ বৈশ্বিক জরিপের পর প্রবালপ্রাচীর গঠনকারী প্রজাতিগুলোর অবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়েছে। পর্যালোচনাটিতে নেতৃত্ব দেন ওবুরা। বনাঞ্চলও ঝুঁকিতে রয়েছে। স্বাধীন সংস্থা ফরেস্ট ডিক্লারেশন অ্যাসেসমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বে বন উজাড়ের হার কমেছিল। তবে মধ্য আফ্রিকার পরিস্থিতির অবনতি এবং এল নিনোর কারণে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি বাড়ায় এ অগ্রগতি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। এল সালভাদরে গবাদিপশুর দুর্দশা এল নিনোর প্রভাবে মধ্য আমেরিকার মেক্সিকো থেকে পানামা পর্যন্ত বিস্তৃত ‘ড্রাই করিডর’ অঞ্চলে তীব্র খরা দেখা দিয়েছে। এএফপির সংবাদকর্মীরা এল সালভাদরের সেনসুনতেপেকে একটি গবাদিপশুর বাজারে গিয়ে দেখেছেন, খাবারের অভাবে গরুগুলোর পাঁজরের হাড় বেরিয়ে এসেছে। ৫৪ বছর বয়সী খামারি আন্তোনিও আগুইলার একটি গরুর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘দেখুন, ছোট প্রাণীটি কত শুকিয়ে গেছে! কেন? কারণ ঘাস নেই।’ বছরের শেষ দিকে এল নিনোর প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ায় এল নিনোর প্রভাবও তীব্র হচ্ছে। বায়ুমণ্ডল উষ্ণ হলে মাটি দ্রুত শুকিয়ে খরা বাড়ে। একইসঙ্গে উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে, ফলে বৃষ্টিপাত আরও তীব্র হতে পারে। দারিদ্র্য বাড়ার আশঙ্কা জাতিসংঘের উন্নয়নবিষয়ক প্রধান আলেক্সান্ডার ডি ক্রু এএফপিকে বলেন, এল নিনোর সঙ্গে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও উচ্চ সুদের হার যুক্ত হলে লাখো মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারেন। বিশেষ করে একের পর এক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী বেশি বিপদে পড়বে। তিনি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে তা মোকাবিলায় বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান। শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করেছে, এল নিনো দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের পর দেশটি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ব্যাংকটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এরপর আগামী বছরের শুরুর দিকে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিতে পারে। এল নিনোর তীব্রতা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মত এল নিনোর তীব্রতা কীভাবে পরিমাপ করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে এটি কতটা শক্তিশালী বলে বিবেচিত হবে। বিভিন্ন সংস্থার ভিন্ন পদ্ধতির কারণে আগের ঘটনাগুলোর সঙ্গে সরাসরি তুলনা করাও কঠিন। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর একে ‘নজিরবিহীন’ বলেছে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থার মতে, পর্যবেক্ষণ করা ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাভাসদাতারা এখনো একে রেকর্ড গড়া ঘটনা হিসেবে ঘোষণা করেননি। মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ুবিজ্ঞানী এমিলি বেকার বলেন, ‘যে পদ্ধতিতেই মাপা হোক, আমরা খুব শক্তিশালী একটি এল নিনো দেখছি।’ তবে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এর অবস্থান কোথায়, তা বোঝা যাবে ঘটনাটি শেষ হওয়ার পর। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের সব মহাসাগর উষ্ণ হচ্ছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (এনওএএ) এখন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব-মধ্যাঞ্চলের তাপমাত্রার সঙ্গে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সমুদ্রের বাকি অংশের তাপমাত্রার পার্থক্য বিবেচনা করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ পার্থক্য বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ওপর এল নিনোর প্রভাব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংখ্যায় এল নিনো ৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস: এএফপির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগস্টে এল সালভাদরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। কপারনিকাস স্যাটেলাইট, ভূ-পৃষ্ঠের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র ও মডেলভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এ হিসাব করা হয়েছে। পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সুবিধা না থাকায় অনেক দেশ নিজেদের বিস্তারিত জলবায়ু-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করতে পারে না। ১৯৮২ সাল এনওএর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮২ সালে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো দেখা গিয়েছিল। চলতি বছরের ঘটনাটি সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। ৪৪ শতাংশ সর্বশেষ বৈশ্বিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রবালপ্রাচীর গঠনকারী প্রজাতির ৪৪ শতাংশ অংশ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এরপর চতুর্থ বৈশ্বিক প্রবাল বিবর্ণতার ঘটনা ও চলতি বছরের এল নিনো প্রবালপ্রাচীরের ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা এনওএর নতুন সূচক অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সমুদ্রের অন্যান্য অংশের তুলনায় ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকলে এবং এ পার্থক্য টানা তিন মাস বজায় থাকলে, সেটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। তাপমাত্রার এই পার্থক্য সামান্য মনে হলেও এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন (ইএনএসও) প্রতি বছর বিশ্বের জলবায়ুর পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক কারণ। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহাসাগরের কোথায় তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ছে, তার পরিবর্তন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলে। এতে কোথাও তাপমাত্রা কমে ও বৃষ্টি বাড়ে, আবার অন্য কোথাও তাপমাত্রা বাড়ে এবং খরা তীব্র হয়। দূরবর্তী অঞ্চলের আবহাওয়ায় এ ধরনের প্রভাবকে ‘টেলিকানেকশন’ বলা হয়। তবে এল নিনো ও এর বিপরীত অবস্থা লা নিনা বিশ্বজুড়ে নির্দিষ্ট ধরনের আবহাওয়া তৈরির সম্ভাবনা বাড়ালেও তা নিশ্চিত করে না। লা নিনার সময় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে।- সূত্র এএফপি কেআর/

জলবায়ু-স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় বাংলাদেশের স্কোর ১৩, অর্থায়নে শূন্য
জলবায়ু-স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় বাংলাদেশের স্কোর ১৩, অর্থায়নে শূন্য

গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ অ্যালায়েন্স (জিসিএইচএ) প্রকাশিত ২০২৬ সালের ‘হেলদি এনডিসি স্কোরকার্ডে’ এই তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে ৮টি বিভাগে ১৩২টি দেশের ১১৭টি জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনা মূল্যায়ন করে এই স্কোরকার্ড তৈরি করা হয়েছে। স্বাস্থ্যগত সহ-সুফলের স্বীকৃতিতে বাংলাদেশ ৪-এর মধ্যে ৪ এবং স্বাস্থ্য খাতের কার্যক্রমে ৪-এর মধ্যে ৩ পয়েন্ট পেয়েছে। বায়ুদূষণ ও সমন্বিত শাসনব্যবস্থায় পেয়েছে ২ পয়েন্ট করে। স্বাস্থ্যগত প্রভাব ও ন্যায়সংগত রূপান্তরে পেয়েছে ১ পয়েন্ট করে। মূল্যায়নে বাংলাদেশের সমান ১৩ পয়েন্ট পেয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ইন্দোনেশিয়ার স্কোর ১১ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১২। সর্বোচ্চ ২৯ পয়েন্ট পেয়েছে কলম্বিয়া। নাইজেরিয়া ২৫ এবং কম্বোডিয়া ২৪ পয়েন্ট নিয়ে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। জাপান, ভারত ও নিউজিল্যান্ড পেয়েছে মাত্র ২ পয়েন্ট করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সর্বোচ্চ স্কোর পাওয়া ২০টি দেশের মধ্যে ১৯টিই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আওতায় দেশগুলো জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পরিকল্পনা জমা দেয়। বাংলাদেশের পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর এবং টেকসই পরিবেশের অধিকার স্বীকার করা হয়েছে। জাতীয় জলবায়ু কার্যক্রমে জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। মূল্যায়নে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষম স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে আগাম পরামর্শসেবা চালু এবং জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। চিকিৎসাশিক্ষার পাঠ্যক্রম ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণেও জলবায়ু ও স্বাস্থ্যবিষয়ক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য পোড়ানো ছাড়া অন্যান্য পদ্ধতির ব্যবহার, হাসপাতালে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যমান সরকারি ভবন, প্রতিষ্ঠান, বিদ্যালয় ও হাসপাতালের ৫০ শতাংশে এবং নতুন এসব স্থাপনার সবগুলোতে ছাদে সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ। পরিবহণ, কৃষি, পানি, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জলবায়ুবান্ধব উদ্যোগের স্বাস্থ্যগত সুফলও তুলে ধরা হয়েছে মূল্যায়নে। এর মধ্যে রয়েছে হাঁটা ও সাইকেল চালানো উৎসাহিত করা, জলবায়ু সহনশীল খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য বজায় রাখা এবং পুষ্টির মান উন্নত করা। পয়োনিষ্কাশন, কঠিন বর্জ্য ও পানি সরবরাহসেবা থেকে নির্গমন কমালে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি হবে, বিশেষ করে শিশু ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে। পাশাপাশি, বন্যা ও চরম আবহাওয়ার সময় এবং পরে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি কমাতে সহনশীল পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে বায়ুদূষণ কমানো এবং পরিচ্ছন্ন রান্নার ব্যবস্থা উৎসাহিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর লক্ষ্য শিশুদের শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষা। এছাড়া ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরের ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাকে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার’-এর তথ্য উদ্ধৃত করে স্কোরকার্ডে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ২৫৯ দশমিক ২। জিসিএইচ-এর নির্বাহী পরিচালক ডা. জেনি মিলার বলেন, সরকারগুলোকে বুঝতে হবে, কার্যকর জলবায়ু পদক্ষেপের জন্য বায়ুর মান উন্নত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন ঝুঁকির মুখে রয়েছে। মূল্যায়নে অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের শূন্য স্কোর জলবায়ু ও স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। বৈশ্বিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। প্যারিস চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সহায়তা পাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারকদের জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনার শক্তিশালী দিক, ঘাটতি ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করতে সহায়তা করাই এই স্কোরকার্ডের উদ্দেশ্য। পাশাপাশি, বিভিন্ন দেশ জলবায়ু প্রতিশ্রুতিতে স্বাস্থ্যকে কতোটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা তুলনা করার সুযোগও তৈরি করে এটি। /কেআর/এমএএইচ/

জলবায়ুর স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় ১৪০ কোটি ডলার অর্থায়ন সম্ভব: গবেষণা
জলবায়ুর স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় ১৪০ কোটি ডলার অর্থায়ন সম্ভব: গবেষণা

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সি৩ইআর) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এইচএনএপি) ২০২৬–২০৩১ বাস্তবায়নে অর্থায়নের সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন। তীব্র তাপপ্রবাহ, জলবায়ু-সংবেদনশীল রোগ, অনিরাপদ পানি এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার মতো সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের জন্য অর্থ সংগ্রহের পথও তুলে ধরা হয়েছে। জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবীর বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় জাতীয় স্বাস্থ্য অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৬-৩০ বাস্তবায়নের বাংলাদেশের জন্য আগামী ৫ বছরে ১৭ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন (১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) হবে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সিথ্রিইআর) উপদেষ্টা ড. আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য খাতে ক্রমবর্ধমান চাপ বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও অর্থায়নে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য, পানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এইচএনএপি দিকনির্দেশনা দেবে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের এ উদ্যোগকে সহায়তা দিতে আন্তর্জাতিক অভিযোজন অর্থায়নও প্রয়োজন, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় অনুদানের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া জরুরি। গবেষণায় চারটি উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় সরকারি অর্থায়ন থেকে ৩৮ কোটি ডলার, অন্যান্য খাতের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অবদান থেকে ৩৬ কোটি ডলার, উন্নয়ন সহযোগীদের কর্মসূচি থেকে ৫২ কোটি ডলার এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নব্যবস্থা থেকে ১৪ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এগুলো প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা, নিশ্চিত অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি নয়। একাধিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করা গেলে শুধু স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের ওপর নির্ভরতা কমবে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। দেশীয় বিনিয়োগে মেটানো সম্ভব ৫৩ শতাংশ দেশীয় অর্থায়নের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের কথা বলা হয়েছে। সরকারি প্রকল্প তৈরির সময় জলবায়ু সহনশীলতার বিষয়টি যুক্ত করা গেলে এসব অর্থ দিয়ে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুতি এবং চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা সম্ভব হতে পারে। স্বাস্থ্য খাতের বাইরের বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। উন্নত নিকাশিব্যবস্থা ও পয়োনিষ্কাশনের মাধ্যমে রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং বন্যাসহিষ্ণু অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখাও সহজ হবে। গবেষণার প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশীয় অর্থায়ন ও অন্যান্য খাতের অবদান মিলিয়ে এইচএনএপির মোট অর্থায়ন চাহিদার প্রায় ৫৩ শতাংশ সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে। তবে অন্যান্য খাতের বিনিয়োগের শুধু স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অংশটুকুই এ পরিকল্পনার অর্থায়ন হিসেবে গণনা করা হবে। একই অর্থ একাধিকবার হিসাব করা এড়াতে সুস্পষ্ট হিসাবপদ্ধতি অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সুযোগ গবেষণায় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সবচেয়ে বড় একক উৎস হিসেবে প্রায় ৩৭ শতাংশ অর্থায়ন পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের কর্মসূচিগুলোকে এইচএনএপির অগ্রাধিকারের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে। সম্ভাব্য অর্থায়নের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্য অবকাঠামো, রোগ পর্যবেক্ষণ, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি। প্রস্তাবিত অর্থায়নের মধ্যে সহজ শর্তের ঋণ ও বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এ অর্থায়ন নির্ভর করবে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমঝোতার ওপর। অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে এইচএনএপিতে স্থানান্তর করা যাবে না। এ ছাড়া গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, অ্যাডাপটেশন ফান্ড এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য তহবিলের (এলডিসিএফ) মাধ্যমে অর্থায়নের সম্ভাবনাও চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব তহবিলে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প প্রস্তাব দিয়ে রোগের আগাম সতর্কবার্তা, তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কে পরামর্শ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং উপকূলীয় ও বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষের অভিযোজন কার্যক্রমে সহায়তা চাওয়া যেতে পারে। আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনের (কপ৩১) আগে এ অর্থায়ন পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় রোগ প্রতিরোধ ও আগাম প্রস্তুতির মতো কার্যক্রমে অনুদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ, এসব কার্যক্রম থেকে সরাসরি আয় হয় না। প্রস্তাবিত ১৪ কোটি ডলারের মধ্যে কতটা অনুদান পাওয়া সম্ভব হবে এবং এর বিপরীতে অন্য উৎস থেকে কত অর্থায়ন প্রয়োজন হবে, তা নির্ধারণে আরও প্রকল্প প্রস্তুতি ও মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য উৎসের অর্থের সঙ্গে দ্বৈত হিসাব এড়ানোর বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। চার অগ্রাধিকার খাতে প্রয়োজন ৯৬ কোটি ডলার এইচএনএপির বিনিয়োগ কাঠামোর চারটি উপাদানে মোট ৯৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার, অর্থাৎ পরিকল্পনার মোট অর্থায়ন চাহিদার ৬৯ শতাংশ প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে জলবায়ু সহনশীল ও কম কার্বন নিঃসরণকারী অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থার জন্য ৩৫ কোটি ডলার; সমন্বিত ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কবার্তা ও নিঃসরণ পর্যবেক্ষণের জন্য ২৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার; জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী গড়ে তুলতে ২১ কোটি ডলার এবং নেতৃত্ব ও সুশাসন জোরদারে ১৪ কোটি ডলার প্রয়োজন হবে। প্রস্তাবিত কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে বন্যা ও উপকূলীয় দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং দুর্যোগের সময় টিকাদান কার্যক্রম চালু রাখতে টিকা সংরক্ষণের শীতল সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা। আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে রোগ পর্যবেক্ষণব্যবস্থার সমন্বয় করা গেলে রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি আরও কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টনে অর্থায়ন নিশ্চিত করার সুপারিশ গবেষণায় স্বাস্থ্য খাতের নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যয় নির্ধারণ ও অর্থায়ন পরিকল্পনা তৈরির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন এবং জলবায়ু ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের হিসাব রাখতে সরকারের আইবাস++ (iBAS++) হিসাবব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট কোড চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলে আবেদন করার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মাধ্যমে সমন্বয়েরও সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, পরিকল্পনা কমিশন জলবায়ু ও স্বাস্থ্যবিষয়ক মূল্যায়নে সহায়তা করতে পারে এবং বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগের মধ্যে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অবদান চিহ্নিত করতে পারে। বিদ্যমান অর্থের উৎস চিহ্নিত করা, উন্নয়ন সহযোগীদের অবদান নিয়ে সমঝোতা করা এবং সুস্পষ্ট সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য স্বাস্থ্যগত ফলাফলসহ প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা গেলে এ অর্থায়ন পরিকল্পনাকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করার পথ তৈরি হতে পারে। - কেআর