অর্থনৈতিক গতিমন্থরতায় রাজস্ব ঘাটতি পৌঁছাল ৪৩,০০০ কোটি টাকায়
দেশের অর্থনৈতিক স্থবিরতার সরাসরি আঘাত পড়েছে রাজস্ব আদায়ে। এর ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতির মুখ দেখেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
শিল্পোৎপাদন, বিক্রিবাট্টা ও অভ্যন্তরীণ ভোক্তা চাহিদার অন্যতম প্রধান নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) আদায়ে রেকর্ড ১৬ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এনবিআরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এর ফলে বিগত অর্থবছরের একই সময়ের ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সার্বিক রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ২ শতাংশেরও নিচে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ১.৩৫ লাখ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৯২ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা এই বিশাল ঘাটতির জন্য ব্যবসার গতিমন্থরতা, ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, প্রত্যাশিত আমদানি না হওয়া, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবন্নগ সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতিসহ সার্বিক অর্থনৈতিক স্থবিরতাকে দায়ী করেছেন। এছাড়া হঠাৎ করে নীতি পরিবর্তন করে ভ্যাট পরিশোধের সময়সূচিতে পরিবর্তন এবং কর আদায়ের ক্ষেত্রে এনবিআরের প্রশাসনিক দুর্বলতাকেও কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন কেউ কেউ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, সামষ্টিক অর্থনীতির নাজুক পরিস্থিতিই মূলত রাজস্ব আদায়ে এই ধসের প্রধান কারণ।
তিনি বলেন, “অর্থনীতি দুর্বল, রাজস্ব আদায় কম হওয়ার, এটিই মূল কারণ। এছাড়া যা আদায়যোগ্য, তাও ফাঁকির কারণে সরকারের কোষাগারে আসছে না।”
তিনি বলেন, “ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগ পুরোপুরি মন্থর হয়ে আছে।। লম্বা সময় ধরে ৮ শতাংশের উপরে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ভোগ ব্যয় কমে গেছে। কিছু পণ্য বিক্রি হবে না বলে আমদানিকারকরাও সেগুলো আমদানি করছেন না।”
এনবিআরের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “প্রতি মাসের স্থলে তিন মাসে ভ্যাট আদায়ের পলিসির কারণে আদায় কম হয়েছে। এছাড়া বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশিত ভাট আদায় না হওয়া, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে ভ্যাট আদায় কিছুটা কম হয়েছে।” তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী মাসগুলোতে আদায় বাড়বে।
এফবিসিসিআই-এর প্রশাসক মো. ফজলুল হকও মনে করেন যে, সার্বিক অর্থনীতির প্রতিকূল পরিস্থিতি রাজস্ব আদায়ে বাধা সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, “বিক্রিবাট্টা কমেছে, বিনিয়োগও কম, এদিকে সরকারের এডিপি বাস্তবায়নের হারও নিচের দিকে, সার্বিকভাবে মানুষের হাতে মানি সার্কুলেশন কম। আবার আমদানিও তেমন বাড়েনি” –উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এসবেরই প্রভাব পড়েছে সরকারের রাজস্ব আদায়ে।”
তিনি আরও বলেন, প্রতি মাসে ভ্যাট আদায়ের পরিবর্তে তিন মাস পর পর পরিশোধের সিদ্ধান্তের কারণেও ভ্যাট আদায়কে সাময়িকভাবে ব্যাহত করেছে।
তবে তিন মাস পর পর ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত, এর আদায় কমে যাওয়ার কারণ, এমন যুক্তির সঙ্গে একমত নন ড. জাহিদ। তিনি বলেন, “সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের রাজস্ব আদায়ের সময় ইতোমধ্যে পার হয়েছে। ফলে ওই সময়ের মধ্যে ভ্যাট আদায় হয়ে যাওয়ায়, এক মাসের স্থলে তিন মাস পর পর করায় আদায় কমেছে, ওই যুক্তি এখানে খাটে না।”
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার মোট ৬.০৪ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের চেয়েও প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। অথচ গত অর্থবছরে রাজস্ব আদায় বেড়েছিল ১২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বাজেট প্রণয়নের সময় থেকেই এই লক্ষ্যমাত্রাকে অবাস্তব বলে সতর্ক করে এসেছিলেন।
জাহিদ হোসেন বলেন, “বাজেটের সময়ই বলা হয়েছিল যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, তা আদায়যোগ্য নয়। এখন তাই দেখা যাচ্ছে।”
ভ্যাটের ধাক্কায় সব পণ্ড
রাজস্বের এই সার্বিক সংকোচন সত্ত্বেও এনবিআরের তথ্য বলছে, প্রথম প্রান্তিকে আয়কর সংগ্রহে বার্ষিক ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে এবং আমদানি শুল্ক আদায় বেড়েছে ৭ শতাংশের বেশি। কিন্তু, ভ্যাট আদায়ে নাটকীয় ধসের কারণে এই অর্জনগুলো রাজস্বের সার্বিক প্রবৃদ্ধিতে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আয়কর আদায়ে এই সাময়িক উল্লম্ফন দীর্ঘস্থায়ী না-ও হতে পারে। কারণ সেপ্টেম্বরের আগেই কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সরকারি প্রণোদনা ও তাগিদের কারণে, শুরুতে করদাতারা দ্রুত আয়কর জমা দিয়েছিলেন। তাই সার্বিকভাবে পুরো বছরে আয়করের এই প্রবৃদ্ধি থাকবে না।
স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব বাড়ার আশাও কম
বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি থমকে যাওয়া এবং রাজস্ব খাতে কোনো বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের অনুপস্থিতির কারণে সামনের মাসগুলোতে রাজস্ব আদায়ে দ্রুত কোনো বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন না অর্থনীতিবিদরা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন নিকট ভবিষ্যতে রাজস্ব ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, “বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিও থমকে গেছে। রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কার ছাড়া, আগামী মাসগুলোতে রাজস্ব আদায়ে বড় কোনো উল্লম্ফন ঘটার সম্ভাবনা কম।”
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের গতি মন্থর হওয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “এতদিন একটি ভরসার জায়গা ছিল রেমিট্যান্স, যা মাসে গড়ে তিন বিলিয়ন ডলার করে আসতো। সেটিও এখন কমতির দিকে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ায়, আগামী মাসগুলোতে রেমিট্যান্সের ঘুরে দাঁড়ানোর আশাবাদকে আরও ঘোলাটে করে তুলতে পারে।”
এমন এক সময়ে এই রাজস্ব সংকট তীব্র রূপ নিচ্ছে, যখন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের অর্থনীতির পূর্বাভাস কাটছাঁট করছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক হালনাগাদ তথ্যে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা গত ৩৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
অন্যদিকে আইএমএফের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’- প্রতিবেদনে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশে বহাল থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের পারিবারিক বাজেট ও সামগ্রিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের ওপর মূল্যস্ফীতির এই নিদারুণ বোঝা চেপেই থাকবে।
/কেআর/
