অক্সফোর্ডে সম্পূর্ণ বিনা খরচে পড়ছেন বাংলাদেশের নাজিফা
যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ অর্থায়নে স্নাতকোত্তর (এমফিল) পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছেন বাংলাদেশের মেয়ে নাজিফা বিনতে হারুন। ১৪১টি দেশের যোগ্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে প্রতিবছর মাত্র একজনকে নির্বাচিত করা হয়, এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ বৃত্তি—‘ওডিআইডি ডিএসি’ অর্জন করেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি অক্সফোর্ডের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা করছেন। শিক্ষাজীবনের শুরুতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়লেও পরে বিশ্বব্যবস্থা, রাজনীতি ও মানবসমাজের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। সেই আগ্রহ থেকেই বাংলাদেশের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে রাজনীতি, দর্শন ও অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ইতালির ইউনিভার্সিটি অব ত্রেন্তোতে এক সেমিস্টার অধ্যয়নের জন্য পূর্ণাঙ্গ ইরাসমাস প্লাস আইসিএম বৃত্তিও অর্জন করেন। ইতালিতে বিনিময় কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় সীমিত বাজেটে ইউরোপের ২১টি দেশ ভ্রমণ করেন নাজিফা। ভিন্ন সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করে। নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর পড়াশোনা ও পেশাগত জীবনেও কাজে এসেছে। স্নাতক শেষে উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকে কাজ করেন নাজিফা। পরে যুক্ত হন মাই সোলি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে। বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা কিশোরীদের নিয়ে কাজ করা একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার কার্যক্রমেও অংশ নেন তিনি। এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জীবন ও সামাজিক সমস্যাগুলো কাছ থেকে বোঝার সুযোগ পান। পাশাপাশি সামাজিক বিষয় নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন থেকে ৩ দশমিক ৯-এর বেশি সিজিপিএ নিয়ে ‘সুমা কাম লডে’ সম্মান অর্জন করেন নাজিফা। তাঁর একাডেমিক ফলাফল সব সেমিস্টারে একই রকম ছিলো না। কয়েকটি সেমিস্টারে ফলাফল খারাপ হওয়ায় কিছু কোর্স পুনরায় সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তী সময়ে ভালো ফলাফলের মাধ্যমে নিজের একাডেমিক অবস্থান শক্তিশালী করেন। অক্সফোর্ডে আবেদনের সময় উন্নয়ন অধ্যয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত স্নাতক পর্যায়ের কোর্সগুলোও আলাদাভাবে তুলে ধরেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ক্লাবের শীর্ষ নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করেন নাজিফা। প্রথম বর্ষেই একটি একাডেমিক দলের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সহপাঠীদের পড়াশোনায় সহায়তা করতে পিয়ার টিউটর হিসেবেও কাজ করেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, দল পরিচালনা এবং অন্যদের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা তুলে ধরেছে। অক্সফোর্ডে আবেদনের ক্ষেত্রে নিজের অভিজ্ঞতাগুলোকে কীভাবে উপস্থাপন করেছেন, সেটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দায়িত্ব ও পদবির তালিকা না দিয়ে প্রতিটি কাজে কী করেছেন, কী অবদান রেখেছেন এবং সেসব অভিজ্ঞতা কীভাবে তাঁর একাডেমিক আগ্রহের সঙ্গে যুক্ত—তা ব্যাখ্যা করেন নাজিফা। আবেদনপত্রের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অংশ ছিলো উদ্দেশ্যপত্র লেখা। সেখানে নিজের জীবনের সব ঘটনা তুলে ধরার পরিবর্তে কেন উন্নয়ন অধ্যয়ন করতে চান এবং অক্সফোর্ডের নির্দিষ্ট শিক্ষাক্রম তাঁর ভবিষ্যৎ লক্ষ্য অর্জনে কীভাবে সহায়তা করবে, তা স্পষ্ট করার চেষ্টা করেন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া প্রশ্ন, গবেষণার আগ্রহ এবং প্রাসঙ্গিক কোর্সের সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেন। স্নাতক পর্যায়ের একটি কোর্সে শেখা বিশেষায়িত তত্ত্বকে নিজের গবেষণার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেন নাজিফা। মূল গবেষণা প্রশ্নকে চারটি উপপ্রশ্নে ভাগ করে প্রতিটির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কোর্সের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন। একই সঙ্গে এই শিক্ষাক্রম থেকে কী শিখতে চান এবং নিজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সহপাঠী ও একাডেমিক পরিবেশে কী অবদান রাখতে পারবেন, সেটিও তুলে ধরেন। নাজিফার মতে, আবেদনপত্রে চমকপ্রদ শোনানোর চেয়ে নির্ভুল ও সুনির্দিষ্ট হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজের গবেষণার লক্ষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে স্পষ্ট সংযোগ থাকা প্রয়োজন। সুপারিশপত্রের প্রস্তুতিও ছিলো দীর্ঘমেয়াদি। স্নাতক পর্যায় থেকেই শিক্ষকদের সঙ্গে নিজের একাডেমিক আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতেন তিনি। আবেদনের সময়সীমার প্রায় ৪ মাস আগে সম্ভাব্য সুপারিশকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিক্ষাক্রমের বিবরণ, নিজের জীবনবৃত্তান্ত এবং উল্লেখযোগ্য কাজ ও অর্জনের তালিকা ভাগ করে নেন। অক্সফোর্ডে ভর্তি ও বৃত্তি পাওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রথমে শিক্ষাক্রমে ভর্তির যোগ্যতা মূল্যায়ন করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট বৃত্তির শর্ত পূরণকারী প্রার্থীদের বিবেচনা, বিভাগীয় পর্যায়ে বাছাই বা মনোনয়ন এবং বৃত্তি কমিটির মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নাজিফার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, কিছু বৃত্তির জন্য মূল স্নাতকোত্তর আবেদনের সময়ই যোগ্য বৃত্তি নির্বাচনের সুযোগ থাকে। তবে প্রতিটি বৃত্তির নিজস্ব নিয়ম ও সময়সীমা যাচাই করা জরুরি। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে নাজিফার পরামর্শ, আবেদন করার আগেই নিজের যোগ্যতা নিয়ে হাল ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। ভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা কিংবা নিজ দেশের বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞানকে দুর্বলতা না ভেবে যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারলে তা আন্তর্জাতিক শিক্ষাঙ্গনে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করতে পারে। পাশাপাশি একটি বৃত্তির ওপর নির্ভর না করে বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগ, কলেজ ও বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নের সুযোগ খুঁজে দেখার পরামর্শও দেন তিনি। নাজিফার অক্সফোর্ডযাত্রা কেবল একটি মর্যাদাপূর্ণ বৃত্তি অর্জনের গল্প নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, নিজের আগ্রহ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাডেমিক লক্ষ্যকে যুক্ত করার উদাহরণ। তাঁর অভিজ্ঞতা দেখায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেতে ভালো ফলাফলের পাশাপাশি প্রয়োজন সুস্পষ্ট লক্ষ্য, ধারাবাহিক প্রচেষ্টা এবং নিজের সক্ষমতাকে যথাযথভাবে উপস্থাপনের দক্ষতা। /এমএএইচ/