সিলেট থেকে ম্যানচেস্টার
যেভাবে প্রবাসে ‘সামুদ্রিক খাবারের রাজা’ হয়ে উঠলেন ইকবাল আহমেদ
সিলেটের বালাগঞ্জ থেকে ওল্ডহ্যাম, আর সেখান থেকে বিশ্বজুড়ে হিমায়িত সামুদ্রিক খাবারের এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন ইকবাল আহমেদ। পারিবারিক ব্যবসার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে একটি আন্তর্জাতিক খাদ্য সরবরাহ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত এই ব্রিটিশ সিলেটি উদ্যোক্তা। মাত্র ১৫ বছর বয়সে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমানো এই কিশোরই আজ ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় বাণিজ্যিক মহলে পরিচিত ‘মিস্টার শ্রিম্প’ বা ‘কিং প্রন’ নামে। তিনি সানডে টাইমস রিচ তালিকাতে অবস্থান করা শীর্ষস্থানীয় ব্রিটিশ বাংলাদেশি।
১৯৫৬ সালের ৪ আগস্ট সিলেট বিভাগের ওসমানীনগর উপজেলার বুরুঙ্গা ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন ইকবাল আহমেদ। ১৯৭১ সালে যুক্তরাজ্যে গিয়ে সিটি কলেজ ওয়েস্টমিনস্টারে পড়াশোনা শেষ করেন। কয়েক বছর পর ওল্ডহ্যামে তাঁদের পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন। পরবর্তীতে তাঁর দুই ভাই কামাল ও বিলালও তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন। তিন ভাইয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১৯৯২ সালের মার্চ মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সিমার্ক গ্রুপ’। ইকবাল আহমেদ এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) দায়িত্ব পালন করছেন।
সিমার্ক গ্রুপের মূল কাজ হিমায়িত খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ইবকো’র মাধ্যমে ক্যাটারিং ব্যবসায় পণ্য সরবরাহ করা। উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক চিন্তার অধিকারী ইকবাল আহমেদই প্রথম রেফ্রিজারেটেড কন্টেইনারের মাধ্যমে হিমায়িত সামুদ্রিক খাবার আমদানি-রপ্তানি শুরু করেন। এছাড়া যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) সর্বপ্রথম 'ব্ল্যাক টাইগার' চিংড়ি আমদানি করার কৃতিত্বও তাঁর। বর্তমানে সিমার্কের ‘মিস্টার প্রন’, ‘লিলি’, ‘ক্লাসিক’ ও ‘টাইগার’ ব্র্যান্ডের পণ্য বাংলাদেশি মালিকানাধীন ছোট মুদি দোকান থেকে শুরু করে কারফুর ও কস্টকোর মতো বিশ্বখ্যাত ইউরোপীয় সুপারমার্কেট চেইনে সরবরাহ করা হচ্ছে।
ম্যানচেস্টারভিত্তিক সিমার্ক আজ ইউরোপের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় হিমায়িত খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, যার বার্ষিক টার্নওভার বা লেনদেন প্রায় ৬ কোটি পাউন্ড। ইউরোপে সাফল্যের পর ২০০১ সালে উত্তর আমেরিকার বাজারে বিতরণের সুবিধার্থে নিউ জার্সি এবং ব্রুকলিনে নতুন সেলস অফিস খুলে প্রতিষ্ঠানটি। সামুদ্রিক খাবারের পাশাপাশি ইকবাল আহমেদ ম্যানচেস্টারে ‘ভারমিলিয়ন’ রেস্টুরেন্ট, ‘সিনাবার’ নাইটক্লাব, হোটেল এবং রিয়েল এস্টেট খাতেও নিজের ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছেন।
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংযোগ তৈরিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেন দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখতে পারেন, সেজন্য তিনি ‘এনআরবি ব্যাংক’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সমাজসেবাতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ২০১৪ সালে নিজ জন্মভূমি সিলেটে একটি মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি তিনি নিজের ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০১ সালে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘ওবিই’ (OBE) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এছাড়া ২০১২ সালে তিনি ‘আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং নর্থ রিজিয়ন এন্টারপ্রেনার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারসহ একাধিক সম্মাননা লাভ করেন। একটি ছোট পারিবারিক দোকান থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক খাবারের বিশাল বাজার জয় করার এই গল্প সিলেট থেকে ম্যানচেস্টারে ছড়িয়ে থাকা বিশ্বব্যাপী প্রবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য এক অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস।
/এমএএইচ/
