এলপিজি বাজারে অরাজকতা: আমদানি আছে, গ্যাস নেই নির্ধারিত দামে
বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লেও এলপিজির বাজারে স্বস্তি নেই। আমদানিকারকদের দাবি, দেশে সরবরাহ পর্যাপ্ত। কিন্তু নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার মিলছে না। এই অবস্থায় আবারো দাম বাড়াতে চাচ্ছে কোম্পানিগুলো। এই বিষয়ে আগামী ২৯ অক্টোবর গণশুনানির দিন ধার্য করেছে বিইআরসি। অথচ শীর্ষ আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে চালান আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ উঠেছে। ফলে র্নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি, উৎপাদক কোম্পানি এবং সরবরাহকারী ব্যবসায়ীদেও কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে ভোক্তারা। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে- এলপিজি বাজারে আসলে কী ঘটছে, আর ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব কার?
দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে ভোগান্তি যেন কাটছেই না। মাসে মাসে দাম সমন্বয় করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু সেই নির্ধারিত দামেও সিলিন্ডার পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা। কোথাও সিলিন্ডার মিলছে না, আবার কোথাও অতিরিক্ত কয়েক শ টাকা দিয়েও গ্যাস কিনতে হচ্ছে। সর্বশেষ ৪ অক্টোবর ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু কোথাও এই দামে তরল সিলিন্ডার গ্যাস মিলছে না। বিভিন্ন এলাকায় এই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত, যা নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি।
সংকটের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, আমদানিকারক ও অপারেটরদের একাংশের দাবি, দেশে এলপিজির সরবরাহ পর্যাপ্ত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। সেপ্টেম্বরে আমদানির পরিমাণও প্রায় একই পর্যায়ে ছিল। কিন্তু আমদানির এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাজারে পণ্য পাওয়ার বাস্তবতার মিল নেই।
এর মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) প্রতিবেদনে দেশের পাঁচটি বড় এলপিজি কোম্পানির বিরুদ্ধে আমদানির চালান আটকে রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে আইগ্যাস, ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি ও যমুনার নাম এসেছে।
অন্যদিকে, বাজার তদারকির অভিযানে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের গুদামে সিলিন্ডার মজুদের ঘটনা সামনে আসছে। ব্যবসায়ীদের একাংশ বলছেন, অভিযানের নামে তাঁদের হয়রানি করা হচ্ছে। এর প্রতিবাদে ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে এলপিজির দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছিলো ব্যবসায়ীরা। দাবি পূরণ না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিক্রি বন্ধের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকারের কঠোর পদক্ষেপে ব্যবসায়ীরা পিছু হটেছে। তারা সরকারের কঠোর হুঁশিয়ারির মুখে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছে। কঠোর পদক্ষেপের অংশ হিসাবে বাজাওে এলপি গ্যাস বিক্রিতে যে কোন প্রকার কারসাজি রোধে সরকার জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ দিয়েছে।
ফলে সংকটের দায় নিয়ে আমদানিকারক, পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চললেও সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল শহুরে পরিবারগুলোর পাশাপাশি পাইপলাইনের গ্যাস না থাকা বহু গ্রামের পরিবারও এখন এই সংকটের সরাসরি শিকার। ত্রি-চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে বাধ্য হচ্ছেন তারা বাড়তি দামে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে।
প্রশ্ন হচ্ছে, আমদানি পর্যাপ্ত থাকলে বাজারে সংকট কেন? মজুদ কোথায়, কার হাতে এবং কেন নির্ধারিত দামে পণ্য পাওয়া যাচ্ছে না? ব্যবসায়ীদের অভিযোগের পেছনে বাস্তব সমস্যা থাকলে তার সমাধান কী? আর বাজারে অনিয়ম থাকলে তা বন্ধ করার দায়িত্ব কার?
পাঁচ বছরে সিলিন্ডারের দাম প্রায় দ্বিগুণ
এলপিজির বাজারে বর্তমান অস্থিরতা বুঝতে হলে গত কয়েক বছরের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র দেখা প্রয়োজন। ২০২১ সালের এপ্রিলে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ছিল ৯৭৫ টাকা। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৪০ টাকায়। অর্থাৎ পাঁচ বছরে নির্ধারিত দাম বেড়েছে ৯৬৫ টাকা বা প্রায় ৯৯ শতাংশ।
এই সময়ে দাম শুধু বাড়েনি, একাধিকবার কমেছেও। বিশ্ববাজারের দর, আমদানি ব্যয়, জাহাজভাড়া, বাণিজ্যিক প্রিমিয়াম ও ডলারের বিনিময় হার বিবেচনায় নিয়ে বিইআরসি প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করেছে। কিন্তু দাম কমানোর সিদ্ধান্তের সুফলও অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তার কাছে পুরোপুরি পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু অক্টোবরের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে তা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়। এক মাসে ২৫২ টাকা বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের রান্নার ব্যয়ে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
তবে দাম বৃদ্ধি আর বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি—দুটি আলাদা সমস্যা। আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি ব্যয় বাড়লে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সরকার নির্ধারিত মূল্য কার্যকর থাকা অবস্থায় কেন গ্রাহককে তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিতে হবে, তার জবাবও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে।
এখানেই বিইআরসির মূল্য নির্ধারণব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কাগজে দাম নির্ধারণ করাই যদি শেষ কথা হয়, আর বাজারে সেই দামে পণ্য না মেলে, তাহলে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে?
আমদানি পর্যাপ্ত, তবু বাজারে সংকট কেন?
এলপিজি বাজারের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এটি। আমদানিকারক ও অপারেটরদের বক্তব্য, দেশে চাহিদা মেটানোর মতো গ্যাস রয়েছে। তাদের সংগঠনও সরবরাহ সন্তোষজনক বলে জানিয়েছে। কিন্তু খুচরা বাজারের চিত্র ভিন্ন। দোকানে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, অগ্রিম চাহিদা দিয়েও অনেক বিক্রেতা পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরবরাহব্যবস্থার এই অসংগতির অন্তত তিনটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমত, আমদানি হওয়া গ্যাসের সবটুকু একই সময়ে বাজারে পৌঁছায় না। বন্দরে পণ্য আসা, জাহাজ থেকে খালাস, টার্মিনালে সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ এবং পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছানোর মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকে। এসব ধাপে কোনো বাধা তৈরি হলে আমদানির পরিমাণ যথেষ্ট থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় বাজারে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরও বাড়বে—এমন প্রত্যাশা থেকে আমদানিকারক বা অন্য কোনো পর্যায়ের ব্যবসায়ী পণ্য ছাড়তে বিলম্ব করছেন কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে চালান আটকে রাখার যে অভিযোগ উঠেছে, তার গুরুত্ব এখানেই। অভিযোগ সত্য হলে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে পরে বেশি দামে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য চালানভিত্তিক তথ্য, খালাসের সময়, মজুদের পরিমাণ এবং বিক্রির হিসাব পরীক্ষা করা জরুরি।
তৃতীয়ত, বাজারে সক্রিয় কোম্পানির সংখ্যা কমে গেলে প্রতিযোগিতা দুর্বল হতে পারে। ব্যবসায়ীদের সংগঠনের দাবি, বর্তমানে মাত্র ছয়-সাতটি কোম্পানি সক্রিয়ভাবে ব্যবসা করছে এবং বিপুলসংখ্যক সিলিন্ডার অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এই দাবি সত্য হলে বাজারে প্রতিযোগিতা, সিলিন্ডারের ব্যবহার এবং সরবরাহের সক্ষমতা নিয়ে আলাদা করে তদন্ত প্রয়োজন।
সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের হিসাব মিলিয়ে দেখা। কত গ্যাস আমদানি হয়েছে, কতটা খালাস হয়েছে, কতটা বোতলজাত করা হয়েছে, কোম্পানির গুদামে কত রয়েছে এবং পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা কত পেয়েছেন—এসব তথ্য এক জায়গায় আনতে হবে।
মজুদদারির অভিযোগ
এলপিজি বাজারের সংকটের মধ্যে পাঁচটি বড় কোম্পানির বিরুদ্ধে পণ্য আটকে রাখার অভিযোগ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে কিছু আমদানির চালান আটকে রাখা হয়েছিল কি না এবং অক্টোবরের মূল্যবৃদ্ধির আগে আমদানি করা গ্যাস পরে বেশি দামে বাজারে ছাড়া হয়েছে কি না, তা তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত প্রতিটি চালানের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ হিসাব যাচাই করা। চালান কখন দেশে এসেছে, কখন খালাস হয়েছে, কোথায় সংরক্ষণ করা হয়েছে, কতটা বাজারে ছাড়া হয়েছে এবং কতটা অবশিষ্ট রয়েছে—এসব তথ্যের সঙ্গে কোম্পানির বিক্রির নথি মিলিয়ে দেখতে হবে।
তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না মিললে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অযথা দায়ী করা যাবে না। বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে পারছে না কেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা?
বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে। কিন্তু বাজারে নির্ধারিত মূল্য কার্যকর না হলে শুধু নতুন দাম ঘোষণা করে ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়।
অক্টোবর মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অথচ বিভিন্ন স্থানে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাম নেওয়ার খবর এসেছে। অর্থাৎ গ্রাহককে নির্ধারিত দামের চেয়ে বাড়তি টাকা গুণতে হচ্ছে গ্যাস পেতে।
এই ব্যবধানের পেছনে প্রকৃত সরবরাহসংকট, পরিবহন ব্যয়, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার কমিশন, কোম্পানির মূল্যনীতি কিংবা বাজারে অনিয়ম—কোন উপাদান কতটা ভূমিকা রাখছে, তা আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিইআরসির দায়িত্ব শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের দরের সঙ্গে মিলিয়ে দাম নির্ধারণ করা নয়; নির্ধারিত মূল্য কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশন, জ্বালানি বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। কোনো এলাকায় নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া না গেলে ভোক্তা কোথায় অভিযোগ করবেন, কত সময়ের মধ্যে অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার।
সিলিন্ডার আছে, অথচ গ্যাসের সংকট—সমাধান কোথায়?
পরিবেশ ব্যবসায়ীদের দাবি হচ্ছে, অনেক কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত থাকায় বিপুলসংখ্যক সিলিন্ডার অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। তাদের ভাষ্য, দেশে এলপিজি আমদানির টার্মিনাল আছে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের কাছে। তবে ছয়টি কোম্পানির হাতে গ্যাসের মজুদ কেন্দ্রীভূত থাকায় সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় তিন কোটি খালি সিলিন্ডার পড়ে আছে। এসব সিলিন্ডার কাজে লাগিয়ে গ্যাস ভরে বাজারজাত করা গেলে সংকট কমতে পারে।
সিলিন্ডার পুনরায় ব্যবহার করতে হলে মালিকানা, নিরাপত্তা, পরীক্ষার মেয়াদ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বোতলজাতকরণের মান নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সিলিন্ডারের সংখ্যা বাড়ালেই সরবরাহ বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে নিরাপদ ও আইনসম্মত উপায়ে অব্যবহৃত সিলিন্ডার বাজারে ফেরানো গেলে তা সরবরাহব্যবস্থার চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে এ বিষয়ে দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিতে হবে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে, তাদের সিলিন্ডার ও অন্যান্য সম্পদ কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে আইনসম্মত ব্যবস্থা খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো জরুরি
এলপিজি বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে হলে সরবরাহের ওপর নির্ভরযোগ্য তথ্যের পাশাপাশি প্রতিযোগিতার অবস্থাও পরীক্ষা করতে হবে। ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী, সক্রিয় কোম্পানির সংখ্যা কমে থাকলে বাজারে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। এতে সরবরাহে কোনো বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব পুরো বাজারে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
প্রতিযোগিতা কমিশনের উচিত বাজারে কোনো প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করছে কি না, সরবরাহ সীমিত করার মাধ্যমে মূল্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না এবং নতুন প্রতিষ্ঠান প্রবেশে কোনো অযৌক্তিক বাধা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা।
এখানে লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু কোনো প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি দেওয়া নয়; বরং এমন বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকবে, ব্যবসায়ীরা ন্যায্য মুনাফা করতে পারবেন এবং ভোক্তারা প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ দামে পণ্য কিনতে পারবেন।
শুধু অভিযান নয়, সরবরাহের পূর্ণাঙ্গ হিসাব
বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের সামনে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি— দুই ধরনের কাজ রয়েছে। প্রথমত, আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত প্রতিদিনের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। কোন কোম্পানি কত গ্যাস আমদানি করেছে, কতটা খালাস করেছে, কতটা বোতলজাত করেছে, কতটা গুদামে রয়েছে এবং কতটা বাজারে সরবরাহ করেছে— এসব তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ওঠা অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। তদন্তে আমদানির চালান আটকে রাখা, অস্বাভাবিক মজুদ বা বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করার জন্য আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত ব্যয় ও কমিশনের স্বচ্ছ কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসায়ীদের কমিশনসংক্রান্ত অভিযোগ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে যাচাই করতে হবে। বাস্তব ব্যয়ের সঙ্গে কমিশনের অসামঞ্জস্য থাকলে তার যৌক্তিক সমাধান প্রয়োজন।
চতুর্থত, অভিযান ও জরিমানার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কোথায় কী অনিয়ম পাওয়া গেছে, কী প্রমাণের ভিত্তিতে জরিমানা করা হয়েছে এবং আপিলের সুযোগ কী— এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে হয়রানির অভিযোগ কমবে এবং ভোক্তারাও আস্থা পাবেন।
দীর্ঘমেয়াদে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি, নিরাপদ সিলিন্ডারের ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা জরুরি।
ভোক্তার স্বার্থই হোক বাজার ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দু
সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন কথার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান দূর করা। বাজারে সংকট নেই— এমন বক্তব্য তখনই মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন তারা নির্ধারিত দামে দোকানে গিয়ে সিলিন্ডার কিনতে পারবেন। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবিও তখনই গ্রহণযোগ্যতা পাবে, যখন তাঁরা সরবরাহ, ব্যয় ও কমিশনের বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য উপস্থাপন করবেন এবং ভোক্তার ওপর অন্যায্য চাপ সৃষ্টি করবেন না।
এলপিজি কোনো বিলাসপণ্য নয়; লাখ লাখ পরিবারের দৈনন্দিন রান্নার জ্বালানি। এই বাজারের অস্থিরতার মূল্য দিতে হচ্ছে সেই সাধারণ মানুষকেই, যাদের পক্ষে প্রতিবার বাড়তি টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কেনা সম্ভব নয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘‘যে হারে দাম বাড়ানো হচ্ছে, তাতে ভোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে তা সামাল দেওয়া খুব কঠিন হবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, বিইআরসির নির্ধারিত দামে কোথাও বাজারে এলপিজি বিক্রি হয় না। ফলে ভোক্তাদের আরও বেশি দামে কিনতে হয়।’’
তিনি বলেন, ‘‘এলপিজি খাতে অনিয়ম প্রতিরোধের দায়িত্ব বিইআরসি, প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিদপ্তর ও বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অসাধু ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। দরকার হলে আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে নতুন করে লাইসেন্স দিতে হবে। এলপিজি ব্যবসা কারও ব্যক্তিগত বা পৈতৃক সম্পত্তি নয় যে, ইচ্ছামতো দাম বাড়াবে এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে না।’’
