গণমাধ্যমে কথা বলতে সরকারি কর্মচারীদের মানতে হবে ৫ শর্ত
অনুমতি ছাড়া গণমাধ্যমে কথা বলতে পারবেন না সরকারি কর্মচারীরা। বিভাগীয় প্রধান বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া সরকারি কর্মচারীরা গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য, নিবন্ধ, অভিমত, সাক্ষাৎকার বা লেখা প্রকাশ করলে তা হবে ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর লঙ্ঘন যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিষয়টি প্রতিপালনের জন্য সংশ্লিষ্টদের আবারও মনে করিয়ে দিয়ে সব মন্ত্রণালয়, বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের শুরুতেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯-এর ২২-এর ধারার ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো কোনো সরকারি কর্মচারী বিভাগীয় প্রধানের অনুমোদন ছাড়া কিংবা প্রকৃত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র ছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে বেতার ও টেলিভিশনের সংবাদ, টকশো, আলোচনা অনুষ্ঠান, পত্র-পত্রিকা বা অনলাইন মাধ্যমে বক্তব্য, অভিমত, নিবন্ধ বা পত্র প্রকাশ করছেন। দেশের বিভিন্ন সংবাদ পত্রে সরকারের নীতি-নির্ধারণী অনেক বিষয়েও তারা বক্তব্য বা মতামত দিচ্ছেন। যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ইতোমধ্যেই বিষয়টি অবহতির জন্য সরকারের সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে দেশের সকল বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারি বিভাগীয় প্রধান বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য, অভিমত বা সাক্ষাৎকার দিতে কিংবা নিবন্ধ প্রকাশ করতে পারেন না। ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ নিষেধ। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গণমাধ্যমে কথা বলা, তথ্য দেওয়া বা লেখালেখির জন্য নিজ দপ্তরের প্রধান বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। সরকারি কর্মচারীরা অনলাইন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন কোনো অভিমত বা বক্তব্য প্রকাশ করতে পারবেন না, যা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে বা জাতীয় ঐক্যের পরিপন্থী।
সরকার মনে করে, অনুমতি ছাড়া কথা বললে সরকারের কাজের গোপনীয়তা নষ্ট হওয়া, ভুল তথ্য ছড়ানো এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নীতিগত দ্বন্দ্ব তৈরির ঝুঁকি থাকে। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া গোপন রাখা একজন কর্মচারীর আইনি দায়িত্ব। অনুমতি ছাড়া কথা বললে সরকারের কাজের সমন্বয়ে ব্যাঘাত ঘটে এবং বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। মুখপাত্র বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছাড়া সবার কথা বলার অধিকার থাকলে দাপ্তরিক শৃঙ্খলা নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। সরকারি নিয়মানুযায়ী এই অবস্থান অত্যন্ত কঠোর এবং এটি লঙ্ঘিত হলে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। সরকারি চাকরিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। নিজ দপ্তরের কাজের প্রচারণার বাইরে সরকারের নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্য বা রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারমূলক কোনো পোস্ট ও মন্তব্য করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মাঝেমধ্যেই প্রশাসনের তরফ থেকে সরকারি কর্মচারীদের এই বিধি-বিধান মনে করিয়ে দিয়ে সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে নির্দেশনা পাঠানো হয়। বিভাগীয় দায়িত্বের অংশ হিসেবে মুখপাত্র বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কেবল দাপ্তরিক বিষয়ে কথা বলতে পারেন। এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অভিমত দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা গণমাধ্যমে কথা বলার আগে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেবেন কি না, তা কথার বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভর করবে। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯-এর বিধি ২২ অনুযায়ী শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও ক্রীড়া; এই চার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই যে কোনো সরকারি কর্মচারি বেতার, টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। অথবা সংবাদপত্র বা সাময়িকীতে নিজ নামে নিবন্ধ বা পত্র লিখতে পারবেন।
উল্লিখিত ৪ বিষয়ের বাইরে গণমাধ্যমে কথা বলতে হলে কর্মচারীকে বিভাগীয় প্রধানের কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। বিভাগীয প্রধান শর্ত সাপেক্ষে কর্মচারীকে গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি দিতে পারবেন।
শর্তগুলো হলো: ১. গণমাধ্যমে প্রচারিত কোনো কর্মচারীর বক্তব্য, নিবন্ধ বা পত্র যেন সরকারি কর্মচারীর ন্যায়পরায়ণতাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে। ২. গণমাধ্যমে প্রচারিত কোনো কর্মচারির বক্তব্য যেন বাংলাদেশের নিরাপত্তা কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না করে। ৩. কোনো কর্মচারীর বক্তব্য বা লেখা জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার পরিপন্থী হওয়া যাবে না। ৪. কোনো কর্মচারীর বক্তব্যে বা লেখায় আদালত অবমাননা, মানহানি বা কোনো অপরাধ উসকানির মতো বিষয়য়ও থাকা যাবে না। ৫. সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯-এর বিধি ২২ অনুযায়ী সরকারের উন্নয়নমুলক কর্মকাণ্ড জনগণকে অবহিত করার লক্ষ্যে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকগণ গণমাধ্যমে কথা বলতে পারবেন।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ মোতাবেক অনুমতি ছাড়া গণমাধ্যমে কথা বললে বা লেখালেখি করলে তা ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হয়, যার জন্য চাকরি থেকে বরখাস্তসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শাস্তির বিধান রয়েছে। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৩৯ ও ৪১ ধারা অনুযায়ী, কোনো কর্মচারী বিধিবহির্ভূত কাজ বা ‘অসদাচরণ’ করলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। বিধি লঙ্ঘনের মাত্রা ও তদন্তের ভিত্তিতে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা’ অনুযায়ী নিম্নলিখিত লঘুদণ্ড বা গুরুদণ্ড দেওয়া হতে পারে। তিরস্কার পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিতকরণ, নিম্নপদে বা নিম্নতর বেতন স্কেলে অবনমন, বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান, চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারণের বিধান রয়েছে।
উল্লেখ্য, গণমাধ্যমে কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য বা লোখা প্রচার করা কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির অংশ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ক্ষেত্রে উল্লিখিত বিধান প্রযোজ্য হবে না।
এ প্রসঙ্গে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবিএম মোশাররফ হোসাইন ভূইঞা জানিয়েছেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯ মেনে চলা বাধ্যতামূলক। অবশ্যই সরকারি কর্মচারীরা যদি বিভাগীয় প্রধানের অনুমতি না নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলেন, বা প্রবন্ধ লেখেন, যা সরকারকে যদি বিব্রত করে, তা হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
/এসআই/
