প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাবে না ফাইল, ৬ ব্যাংকের এমডি নিয়োগে নতুন নিয়ম
রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) পদে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এনেছে সরকার। সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) ও বেসিক ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগের জন্য আগামী সপ্তাহে প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানা গেছে। নতুন ব্যবস্থায় এসব পদে নিয়োগের জন্য আগের মতো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কারও নাম প্রস্তাব করে ফাইল পাঠাতে হবে না। ফলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদনেরও প্রয়োজন হবে না। অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কমিটির মাধ্যমে প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত হবে। নিয়োগ দেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এমডি বা সিইও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এমন পরিবর্তন এনে নতুন নীতিমালা জারি করেছে সরকার। এর আওতায় সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) ও বেসিক ব্যাংক পিএলসি'র এমডি বা সিইও পদে সরকার সরাসরি নিয়োগ দেবে না। সরকার কেবল প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি নিয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য মনোনীত প্রার্থীর নাম সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পাঠানো হবে। এমডি বা সিইও নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ব্যাংকের পর্ষদ।
তবে কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)সহ ৬টি বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি) ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) এমডিদের নিয়োগ দেবে সরকার। ব্যাংক খাতে শীর্ষ পদে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব বাড়ানো এবং প্রশাসনিক গতিশীলতা ফেরাতে নতুন এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে ৭ সদস্যের কমিটি
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, এমডি পদে প্রার্থী মনোনয়নের জন্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে ৭ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের মনোনয়ন কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা ও পেশাগত রেকর্ড পর্যালোচনা করবে। পাশাপাশি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে নম্বর দিয়ে প্রার্থীদের তালিকা প্রস্তুত করবে। কমিটির সুপারিশের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি নেওয়া বাধ্যতামূলক। অনাপত্তি পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ চূড়ান্ত নিয়োগ দেবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, এমডি পদে প্রার্থীর ন্যূনতম স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকতে হবে। অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, ফাইন্যান্স, ব্যাংকিং বা ব্যবসায় প্রশাসনে (এমবিএ) উচ্চতর ডিগ্রিধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য হবে না। প্রার্থীর বয়স হতে হবে সর্বনিম্ন ৪৫ বছর এবং সর্বোচ্চ ৬৫ বছর। নিয়োগ দেওয়া হবে ৩ বছরের চুক্তিতে।
গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ, ঋণখেলাপি, দুর্নীতির অভিযোগ কিংবা অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকলে প্রার্থী অযোগ্য হবেন। এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এমডি পদে নিয়োগ পরিচালনা পর্ষদের হাতে থাকলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদে পদোন্নতি ও পদায়নের বিষয়টি সরকার পরিচালনা করবে। এ ক্ষেত্রেও নতুন ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিবর্তে অর্থমন্ত্রী চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন।
এমডিদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে ৩০ সূচক
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৩ সেপ্টেম্বর পৃথক এক আদেশে ‘কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর্স’ (কেপিআই) নামে একটি কাঠামো জারি করেছে। দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানদের নতুন এ নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কাঠামো অনুযায়ী, প্রতি ৬ মাস অন্তর প্রায় ৩০টি সূচকের ভিত্তিতে এমডিদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা হবে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের পর পরবর্তী বোর্ড সভায় এই কাঠামোর আওতায় কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে তা চূড়ান্ত করা হবে। বর্তমানে যারা এমডি ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের প্রথম মূল্যায়ন হবে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়ের জন্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কেপিআই কাঠামোয় পাঁচটি প্রধান খাতে মোট ১০০ নম্বর বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকের সচ্ছলতা ও তারল্যের জন্য ২৫ শতাংশ, সম্পদের গুণগত মানের জন্য ২৫ শতাংশ, সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ২৫ শতাংশ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, গ্রাহকসেবা ও বাজার আচরণের জন্য ১৫ শতাংশ এবং মুনাফাযোগ্যতার জন্য ১০ শতাংশ নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই পাঁচটি প্রধান খাতের আওতায় প্রায় ৩০টি সুনির্দিষ্ট সূচক রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মূলধন ও ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত (সিআরএআর), নিট স্থিতিশীল তহবিল অনুপাত (এনএসএফআর), মোট ও নিট খেলাপি ঋণের অনুপাত (এনপিএল), সম্পদের বিপরীতে আয় (আরওএ), নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মকানুন অনুসরণ, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধসংক্রান্ত বিধিবিধান (এএমএল/সিএফটি) পরিপালন এবং কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) ও কৃষি খাতে ঋণ সম্প্রসারণ।
মূল্যায়নে যেসব শীর্ষ নির্বাহী ৭৫ বা তার বেশি নম্বর পাবেন, তাঁদের ‘গড় মানের ওপরে’ হিসেবে গণ্য করা হবে। ৬৫ থেকে ৭৫-এর কম নম্বরপ্রাপ্তদের ‘গড় মানের’ এবং ৬৫-এর নিচে নম্বর পাওয়া ব্যাংকপ্রধানদের ‘গড় মানের নিচে’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হবে। শেষোক্ত শ্রেণিতে থাকা কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা অবিলম্বে উন্নত করা প্রয়োজন বলে বিবেচনা করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, যেসব এমডি ও সিইও ৬৫ শতাংশের নিচে নম্বর পাবেন, তাঁদের সতর্ক করতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কর্মদক্ষতা আশানুরূপ না হলে কিংবা ব্যর্থতা দেখা দিলে পরিস্থিতি বিবেচনায় তাঁদের পদ থেকে অপসারণও করা হতে পারে।
খেলাপি ঋণ ও ঋণ কেন্দ্রীকরণেও নজরদারি
কেপিআই কাঠামোয় আরও একটি অতিরিক্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ছয়টি নির্দিষ্ট বিষয়ে ঘাটতি থাকলে মোট নম্বর থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ নম্বর পর্যন্ত কেটে নেওয়ার বিধান রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, কোনো নির্বাহী ১০০-এর মধ্যে ৭৫ দশমিক ৫০ নম্বর পেলেও ওই ছয়টি বিষয়ের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হলে তাঁর নম্বর থেকে ৫ দশমিক ০৮ পয়েন্ট কাটা যাবে। এতে তাঁর চূড়ান্ত স্কোর দাঁড়াবে ৭০ দশমিক ৪২।
খেলাপি ঋণসংক্রান্ত সূচকগুলোর মধ্যে থাকবে ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত, মন্দ ঋণের পরিমাণ, খেলাপি ঋণ থেকে বার্ষিক নগদ আদায় এবং অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ।
ঋণ ও আমানতের অনুপাত (এডিআর) সংক্রান্ত সূচকে দেখা হবে, ব্যাংকের মোট আমানতের কত অংশ ঋণ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে, নিয়মিত ঋণ আদায় হচ্ছে কি না এবং বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ৮৫ শতাংশ বা ৮৭ শতাংশ সীমা মানা হচ্ছে কি না।
অন্যদিকে, ঋণ কেন্দ্রীকরণসংক্রান্ত সূচকের মাধ্যমে যাচাই করা হবে, ব্যাংকের বড় অঙ্কের ঋণের কতটা শীর্ষ ১০ বা ২০ জন গ্রাহকের কাছে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকটি একক গ্রাহকের ঋণসীমা যথাযথভাবে অনুসরণ করছে কি না, তা-ও দেখা হবে।
এই কাঠামোর আওতায় ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও অগ্রাধিকারমূলক খাতের কার্যক্রমও মূল্যায়ন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে সিএমএসএমই, কৃষি ও পরিবেশবান্ধব সবুজ অর্থায়ন এবং ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা নতুন গ্রাহকদের প্রাতিষ্ঠানিক সেবার আওতায় আনার উদ্যোগ।
৬ ব্যাংকের এমডির নিয়োগ বাতিল
উল্লেখ্য, গতকাল ১৯ অক্টোবর বিকেলে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংক পিএলসির তিন এমডির চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর অগ্রণী ব্যাংকের এমডি মো. আনোয়ারুল ইসলাম, বিডিবিএলের এমডি মো. জসীমউদ্দিন এবং বেসিক ব্যাংকের এমডি মো. কামরুজ্জামান খানের নিয়োগ বাতিল করে সরকার।
এই প্রসঙ্গে ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী বলেন, "সিদ্ধান্তটি ভালো, তবে মূল্যায়নের সময়সীমা আরও কিছুটা দীর্ঘ হওয়া উচিত। যেকোনো চাকরির ক্ষেত্রেই জবাবদিহি থাকা দরকার।"
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংকের এমডিদের জন্য যে ফ্রেমওয়ার্ক নির্ধারণ করেছে, তা একটি ভালো পদক্ষেপ।" নির্ধারিত কাঠামোর আওতায় সার্বক্ষণিক তদারকির মধ্যে থাকলে ব্যাংক খাতে অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলেও মনে করেন তিনি।
/এসআই / আইই/
