প্রশাসন সম্প্রসারণে সরকারের উদ্যোগ, ৪২৭ নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব
সরকারি জনবলকাঠামো ও সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রশাসনের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন জনবলকাঠামো গঠন, গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, জনসেবা সম্প্রসারণ এবং বিশেষায়িত কার্যক্রমের জন্য অতিরিক্ত জনবল প্রয়োজন বলে মনে করছে সরকার। এই লক্ষ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পক্ষ থেকে নতুন পদ সৃষ্টি, বিদ্যমান পদের পুনর্বিন্যাস, নিয়োগবিধি চূড়ান্তকরণ এবং নতুন প্রতিষ্ঠানের জনবলকাঠামো নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সরকারি রাজস্ব খাতে অন্তত ৪২৭টি নতুন পদ যুক্ত হতে পারে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সরকারের প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পক্ষ থেকে জনবল নিয়োগসংক্রান্ত অন্তত ১৩টি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে কমিটি। পরে মন্ত্রিসভার অনুমোদন সাপেক্ষে এসব পদ সৃষ্টির ও পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সরকারি চাকরিতে সাড়ে পাঁচ লাখের বেশি পদ শূন্য
সর্বশেষ জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে বর্তমানে ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে সরকারি চাকরিতে কর্মরত আছেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, সরকারি অফিসগুলোতে মোট অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২টি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শূন্য পদের মধ্যে প্রথম শ্রেণির ৬৮ হাজার ৮৮৪টি, দ্বিতীয় শ্রেণির ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯টি, তৃতীয় শ্রেণির ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ১ লাখ ৭৮ হাজার ৭৩টি পদ রয়েছে।
সরকার মনে করছে, বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য রেখে জনগণকে শতভাগ সেবা নিশ্চিত করা কঠিন। এই কারণে একদিকে শূন্য পদ পূরণ, অন্যদিকে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পদ সৃষ্টি ও বিদ্যমান জনবলকাঠামো পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সেবা সম্প্রসারণে সচিব কমিটির উদ্যোগ
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, সরকারি সেবা নিশ্চিত করতে দক্ষ প্রশাসনের কোনো বিকল্প নেই। এটি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার। প্রশাসনে দক্ষ জনবল সৃষ্টি, শূন্য পদ পূরণ এবং সরকারি জনবলকাঠামো ও সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রশাসনের পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, এই বিষয়ে একটি সচিব কমিটি কাজ করছে। কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর প্রশাসন সম্প্রসারণে করণীয় নির্ধারণ করবে সরকার। নতুন জনবল নিয়োগ কিংবা শূন্য পদ পূরণের ক্ষেত্রে সেই সুপারিশের ভিত্তিতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন সাপেক্ষে পদ পূরণের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব ড. নাসিমুল গণির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সচিব কমিটির সভায় গবেষণা, তথ্যব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবিলা, শিক্ষা ও সামাজিক সেবাসহ বিভিন্ন খাতে জনবল বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে নতুন পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা, ফলপ্রসূতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়- এই তিনটি বিষয় সমান গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা হবে বলে জানা গেছে।
যেসব খাতে নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব
সচিব কমিটির সভায় উত্থাপিত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ৮টি শান্তি নিবাসের জন্য ৭২টি স্থায়ী পদ এবং আটজন খণ্ডকালীন চিকিৎসকসহ মোট ৮০টি পদ সৃষ্টি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সেন্টার ফর নেভাল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিএনআরডি) জন্য ৫২টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারিকৃত ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের আত্তীকরণের লক্ষ্যে ৬০টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব রয়েছে। কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা শিবিরসহ অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলায় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের গুদাম ও স্যাটেলাইট ফায়ার স্টেশনের জন্য ৩৯টি পদ এবং সেইফার প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ইমার্জেন্সি রেসপন্স কন্ট্রোল সেন্টারের জন্য ৩০টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য ১৫টি, পায়রা বন্দরের জন্য চারটি এবং বগুড়া ও নওগাঁ সড়ক বিভাগের জন্য ৩২টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব রয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এনএপিডি'র আইসিটি শাখা এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগেও নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে। এই দুই ক্ষেত্রে মোট ১৭টি পদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এর বাইরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্থাপত্য অধিদপ্তরের আটটি আউটসোর্সিং পদ রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে কয়েকটি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাবও করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সচিব কমিটির সভায় প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষে মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়া সাপেক্ষে এসব পদ পূরণের উদ্যোগ নেবে সরকার।
পুলিশের জনবল বাড়াতেও উদ্যোগ
প্রশাসনিক জনবল সম্প্রসারণের পাশাপাশি বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশের জনবল বৃদ্ধি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। এই লক্ষ্যে ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর ২৬ ফেব্রুয়ারি ১০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, পুলিশের জনবল বাড়াতে সরকার নিরলসভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কনস্টেবল নিয়োগের পাশাপাশি পুলিশ সার্জেন্টের ১৮০টি শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্বচ্ছতা ও যথাযথ পরীক্ষার মাধ্যমে এসব নিয়োগ দেওয়া হবে।
এ ছাড়া সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) মাধ্যমে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) নিয়োগের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
নতুন পদ সৃষ্টিতে বাড়বে দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়
অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতির মধ্যে রাজস্ব খাতে একের পর এক নতুন পদ সৃষ্টি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের ওপর স্থায়ী আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। প্রতিটি নতুন পদের বিপরীতে বেতন-ভাতা, উৎসব ভাতা, চিকিৎসাসুবিধা এবং অবসরের পর পেনশনসহ দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় তৈরি হয়।
তবে সচিবের পদমর্যাদায় সাবেক রেক্টর আউয়াল মজুমদার মনে করেন, প্রশাসনের পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে জনবলকাঠামো ও সেবা সম্প্রসারণের যৌক্তিকতা রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের বিপরীতে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকলে সেগুলোর বাস্তবায়ন স্থবির হয়ে পড়তে পারে।
তাঁর মতে, জনবল বাড়ানো মানেই অপচয় নয়। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানোই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যয় সংকোচনের নীতি অনুসরণের সময়ে নতুন পদ সৃষ্টির ফলে রাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
//আইই//
