বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ বৈঠক: বাংলাদেশের অর্থনীতির আয়নায় এক কঠিন সত্যের প্রতিচ্ছবি
ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে রবিবার (১৮ অক্টোবর) পর্দা নেমেছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সপ্তাহব্যাপী বার্ষিক সভার। বিশ্ব অর্থনীতি যখন ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় জর্জরিত, ঠিক সেই সময় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো বাংলাদেশের অর্থনীতি। গত চার দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিধারা, নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা এবং দারিদ্র্য বিমোচনের মন্থর গতি নিয়ে বৈশ্বিক ঋণদাতা সংস্থাগুলো যে চিত্র এঁকেছে, তা দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য এক বড় ধরনের সতর্কবার্তা।
বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এর এই বৈশ্বিক মহামঞ্চে আইএমএফ তাদের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রকাশ করেছে, যেখানে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বেশ হতাশাজনক প্রাক্কলন তুলে ধরা হয়েছে। আইএমএফ-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩.২ শতাংশে নেমে যেতে পারে। গত প্রায় চার দশকের মধ্যে বা বিগত ৩৮ বছরের ইতিহাসে এটি হবে দেশের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। এর আগে ১৯৮৮-১৯৮৯ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.১১ শতাংশে নেমেছিলো। এমনকি বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের সময়েও (২০১৯-২০২০ অর্থবছর) বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিলো ৩.৪৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তোলা মূল্যস্ফীতির পারদ আরও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ খাতের স্থবিরতা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর উদ্বেগের বিষয়সমূহ
বৈঠকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে জোরালোভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রধান উদ্বেগের ক্ষেত্রগুলো ছিলো ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি ও খেলাপি ঋণ, বাড়ন্ত দারিদ্র, মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের খরা।
ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি ও খেলাপি ঋণ: দেশের ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা এবং খেলাপি ঋণের পাহাড় অর্থনীতিকে গ্রাস করে চলেছে। তারল্য সংকট এবং আস্থার অভাবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সংকুচিত হয়েছে। আবার কিছু ব্যাংক উদ্বৃত্ত তারল্য নিয়ে বসে আছে। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ নেই।
বাড়ন্ত দারিদ্র্য: সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণার বরাতে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, গত চার বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ নতুন করে দরিদ্র সীমার নিচে চলে গেছে। ‘উন্নয়ন ন্যারেটিভস’-এর আড়ালে আয় বৈষম্য এবং প্রান্তিক মানুষের দুর্দশা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়িত্ব: বাজারে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের খরা: উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। ফলে অর্থনীতিতে ‘কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি’ তৈরি হয়েছে, যা বেকার যুবসমাজকে হতাশ করছে।
আন্তর্জাতিক প্রেসক্রিপশন বনাম ‘স্বদেশী সংস্কার’ কৌশল
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক-এর বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল প্রথাগত ঋণ নির্ভরতা বা আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপিয়ে দেওয়া শর্তের বাইরে গিয়ে ‘হোমগ্রাউন্ড রিফর্ম এজেন্ডা’ বা নিজস্ব কাঠামোগত সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরেছে। সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, বৈদেশিক ঋণের কঠোর শর্ত মেনে চলার চেয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎসের সদ্ব্যবহার, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার মতো বিষয়গুলোতে দেশীয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সংস্কার চালানো হবে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, নিজস্ব সংস্কারের কথা বলা ইতিবাচক হলেও, বৈশ্বিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর আর্থিক সহায়তা এবং পলিসি সাপোর্ট ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত দুরূহ। ঐতিহ্যগতভাবে আইএমএফ-এর ঋণের কিস্তি ছাড়ের ক্ষেত্রে ভর্তুকি কমানো, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এবং ইউটিলিটি সার্ভিসের দাম বাড়ানোর যে চাপ থাকে, তা অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতিকে আরও উস্কে দিতে পারে।
বৈঠক থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ বৈঠক থেকে বাংলাদেশ বড় অংকের কোনো নতুন অনুদান বা সহজ শর্তের বেলআউট প্যাকেজ অর্জন করতে পারেনি। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভেতরের ক্ষতগুলো আরও স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়েছে। এই বৈঠক থেকে প্রাপ্ত অর্জনগুলোকে বিবেচনায় নিলে দাঁড়ায়- বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ, নিজস্ব সংস্কারের গুরুত্ব অনুধাবন এবং দরকষাকষির বার্তা।
বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ: বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর কঠোর প্রাক্কলন দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য আত্মতুষ্টিতে ভোগার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশে নেমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি প্রায় ১১ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছানোর পূর্বাভাস সরকারকে অর্থনীতির আসল চালচিত্রের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
নিজস্ব সংস্কারের গুরুত্ব অনুধাবন: বিদেশি সংস্থার প্রেসক্রিপশনের অন্ধ অনুকরণ না করে ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, রাজস্ব খাতের সংস্কার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নিজস্ব রূপরেখা আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরার সুযোগ পাওয়া গেছে। বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে ব্যাংকিং খাত সংস্কারের জন্য প্রকল্প সহায়তার কথা বললেও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবায়নই ছিলো মূল চাবিকাঠি।
দরকষাকষির বার্তা: বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তার ক্ষেত্রে নিজেদের শর্ত ও সক্ষমতার বিষয়টি স্পষ্ট করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলা এবং সবুজ অর্থায়নে আন্তর্জাতিক তহবিলের দাবি জোরালো করা হয়েছে।
অর্থনীতির ক্ষত সারাতে করণীয়
কোনো বৈশ্বিক বৈঠকের প্রতিবেদন বা পূর্বাভাস দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে না; তা কেবল আয়না হিসেবে কাজ করে। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশকে অবিলম্বে কিছু সুনির্দিষ্ট ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এই পদক্ষেপে প্রথমেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এক্ষেত্রে মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে যথাযথ সমন্বয় ঘটিয়ে বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। সরবরাহ চেইন সচল রাখতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য দমন এবং কৃষি খাতে সরাসরি সহায়তা বাড়াতে হবে।
ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও তারল্য ফেরানো অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ আদায়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শন করতে হবে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে খাতটিতে সুশাসন ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। শুধু মেগা প্রকল্পের পেছনে ছুট না দিয়ে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে সহজ শর্তে ঋণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দেশে দ্রুত কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
রাজস্ব সংগ্রহ আধুনিকায়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে কর ফাঁকি রোধ এবং অটোমেশনের মাধ্যমে রাজস্ব প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে, যাতে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘এবারের বৈঠকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর সঙ্গে আমাদের বৃহৎ নীতি ঐকমত্য হয়েছে— ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, কর আদায় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা।’
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুরের মূল্যায়ন হলো, ‘এবারের বৈঠকে কোনো চেক হাতে আসেনি, কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো আস্থা। নতুন সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে পাঁচ বছরের যে উন্নয়ন কাঠামো তৈরি হচ্ছে, তাতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক পাশে থাকবে— এই বার্তাটা গেছে।’
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর এবারের বার্ষিক বৈঠক শেষ হয়েছে একরাশ উদ্বেগ আর সাবধানবাণী উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। প্রবৃদ্ধি চার দশকের সর্বনিম্নে নামার শঙ্কা এবং মূল্যস্ফীতির অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে গতানুগতিক নীতিমালার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দেশীয় সংস্কারের যে কথা বলা হচ্ছে, তার বাস্তবায়ন কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠে প্রয়োগ করতে হবে। অন্যথায়, আন্তর্জাতিক সংস্থার এই সতর্কবার্তা অদূর ভবিষ্যতে এক গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে।
