ডিসি অফিসের এলআর ফান্ড: বন্ধ না কি সংস্কারের পথে?
জেলা প্রশাসনের লোকাল রিলেশন্স ফান্ড (এলআর ফান্ড) বন্ধ করা হবে, নাকি সংস্কারের মাধ্যমে এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনা হবে- এ নিয়ে সরকারের সক্রিয় বিবেচনা চলছে। দীর্ঘদিন ধরে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত এই তহবিলের অর্থ ভিআইপি প্রটোকল, আপ্যায়ন ও সরকারি দিবস উদযাপনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হচ্ছে। কিন্তু অর্থ সংগ্রহের উৎস, ব্যয়ের খাত এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। সরকারি নিরীক্ষার আওতায় না থাকায় তহবিলটি নিয়ে বিতর্কও দীর্ঘদিনের। অপব্যবহার রোধ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সুস্পষ্ট বিধিমালা প্রণয়নের প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসনামল থেকে চলে আসা এলআর ফান্ড মূলত স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন জরুরি ব্যয় নির্বাহের জন্য গড়ে ওঠা একটি তহবিল। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের অধীনে এটি পরিচালিত হয়। তহবিল সংগ্রহ ও পরিচালনা নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ২০১৬ সালের ১০ আগস্ট একটি পরিপত্র জারি করে। ওই পরিপত্রে ফান্ডটি পুরোপুরি বন্ধ করার নির্দেশনার পাশাপাশি সাময়িকভাবে এর যথেচ্ছ ব্যবহার রোধে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়। পরিপত্রটি এখনো কার্যকর রয়েছে।
দীর্ঘদিনের এই চর্চা বন্ধ না হয়ে চলমান থাকায় তহবিলটির আইনগত ভিত্তি, অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতি এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার এখন তহবিলটি সরাসরি বন্ধ করার পরিবর্তে এর অর্থ ব্যবহারের আইনি ভিত্তি তৈরি এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় পরিচালনার উদ্যোগ নিচ্ছে।
অর্থ সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগ
সাধারণত স্থানীয় পর্যায়ের বেসরকারি ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এলআর ফান্ডে অর্থ জমা দেন। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন উন্নয়নকাজ, ট্রেড লাইসেন্স কিংবা লটারির অনুমোদন পেতে নির্ধারিত ফি'র অতিরিক্ত অর্থ হিসেবে অথবা বাধ্য হয়ে ঠিকাদারদের কেউ কেউ এই তহবিলে টাকা জমা দেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভয়ভীতি দেখিয়ে কিংবা বিভিন্ন অজুহাতে স্থানীয় প্রশাসন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগ "সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন' বলে দাবি করেছেন জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। তাঁদের ভাষ্য, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ফি থেকে পাওয়া অতিরিক্ত অর্থ এলআর ফান্ডে জমা করা হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মাঠ প্রশাসনের সংগৃহীত অর্থ এলআর ফান্ডে জমা করা হলেও তহবিলটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) কর্তৃত্বে এটি পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে এর সুস্পষ্ট আইনগত ভিত্তি নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করেই তহবিলের অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয় করা হয়।
সরকারি কর্মচারী আচরণবিধির ৮ ও ৯ ধারার ক্ষমতাবলে জেলা প্রশাসকেরা আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন। এ জন্য সরকারকে আগাম জানানোর প্রয়োজন হয় না। বেঙ্গল ফেমিন কোডে বলা হয়েছে, কোনো এলাকাকে দুর্ভিক্ষপীড়িত ঘোষণা করা হলে সেখানে মানুষের সহায়তায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তহবিল সংগ্রহ করে তা কাজে লাগাতে পারে। তবে বাস্তবে সারা বছরই এলআর ফান্ডে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এই অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, তার বিস্তারিত হিসাব জনসমক্ষে দৃশ্যমান নয়।
তহবিলের অর্থ কোথায় ব্যয় হয়
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক গবেষণায় এলআর ফান্ডের অর্থ ব্যয়ের যে চিত্র তুলে ধরেছে, তাতে তহবিলটির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন আরও স্পষ্ট হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, তহবিলের ৩১ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় ভিআইপিদের প্রটোকল, তাঁদের ব্যক্তিগত ব্যয় এবং রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের পেছনে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস উদযাপনে ব্যয় হয় ৩২ শতাংশ অর্থ। অন্যদিকে, যেসব উদ্দেশ্যে তহবিলটি গঠন করা হয়েছে, সেসব খাতে ব্যয় হয় মাত্র ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
গবেষণায় কিছু ক্ষেত্রে তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ এবং ব্যক্তিগত বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে ব্যয়ের অভিযোগও উঠে এসেছে। এলআর ফান্ডসংক্রান্ত তথ্য সাধারণত প্রকাশ করা হয় না। এমনকি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এই বিষয়ে জবাবদিহিরও বাধ্যবাধকতা নেই বলে টিআইবি'র গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এই বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, "এলআর ফান্ডের অর্থ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস পালন, সার্কিট হাউস, রেস্ট হাউস ও বাংলো ব্যবস্থাপনা, আপৎকালীন ব্যয়, জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম, কার্যালয়ে আগত অতিথিদের আপ্যায়ন এবং প্রটোকলসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের জন্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। তবে এই তহবিলের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরীক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।"
বন্ধের বদলে সংস্কারের পরিকল্পনা
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এলআর ফান্ডের অর্থ ব্যবহারে আইনি ভিত্তি তৈরি করে একটি নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। সূত্রের দাবি, মাঠ প্রশাসনের এই তহবিল সরাসরি বন্ধ না করে সংস্কার, নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় পরিচালনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের বিবেচনায়, মাঠ প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ও আপৎকালীন ছোটখাটো ব্যয় নির্বাহে এলআর ফান্ড দীর্ঘদিনের প্রচলিত একটি ব্যবস্থা। বিভিন্ন দাপ্তরিক আপ্যায়ন কিংবা তাৎক্ষণিক ব্যয়ের জন্য সব সময় পর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ থাকে না। বিকল্প হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে সংগৃহীত অর্থ বা অনুদান ব্যবহার করা হয়। এই কারণে তহবিলটি পুরোপুরি বন্ধ না করে সুনির্দিষ্ট আয়-ব্যয়ের কাঠামোর মধ্যে আনার কথা ভাবছে সরকার।
সূত্র আরও জানিয়েছে, প্রস্তাবিত নীতিমালায় কোন কোন উৎস থেকে তহবিলের অর্থ সংগ্রহ করা যাবে, সেই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে। প্রতি মাসে কী পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেই বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানোর বিধানও রাখা হবে। একই সঙ্গে কোন কোন খাতে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার বিস্তারিত হিসাব মাঠ প্রশাসনকে দিতে হবে।
প্রতিবছর তহবিলটির নিরীক্ষার ব্যবস্থাও রাখার কথা রয়েছে। নিরীক্ষায় অনিয়ম বা অস্বচ্ছতা ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান প্রস্তাবিত নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে জানা গেছে।
এলআর ফান্ড নিয়ে টিআইবি'র সুপারিশ
এলআর ফান্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে সরকারি বাজেট বরাদ্দের সুপারিশ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে আইনবহির্ভূত এই ধরনের তহবিল সংগ্রহ ও পরিচালনা বন্ধ করতে হবে। যেসব খাতে বর্তমানে এলআর ফান্ডের অর্থ ব্যয় হয়, সেসব খাতের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয়ের যথাযথ প্রাক্কলনের ভিত্তিতে পর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ দিতে হবে।
টিআইবি আরও বলেছে, তহবিলটি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এর আয়-ব্যয় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে তহবিলটিকে সরকারি নিরীক্ষা কার্যক্রমের আওতায় আনতে হবে। যথাযথ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তহবিলের আয়-ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য জেলা তথ্য বাতায়নসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশেরও সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া সরকারি সফরে মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের সার্কিট হাউস, রেস্ট হাউস ও বাংলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে ন্যায্য ও বৈধ বিল সরকারি তহবিল থেকে সরাসরি কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয় করার সুপারিশ করেছে টিআইবি।
কী বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা
এই বিষয়ে জানতে চাইলে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম বৈঠকে থাকার কথা জানিয়ে মন্তব্য এড়িয়ে যান। তবে হবিগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ বলেন, এলআর তহবিলের যাবতীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব বছর শেষে নিয়মিত নিরীক্ষা করা হয়। এই তহবিল চালু থাকবে, নাকি বন্ধ হবে- সেই বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার একসময় এলআর তহবিলের "কোনো আইনগত ভিত্তি নেই" বলে মন্তব্য করেছিলেন। বর্তমানে এই বিষয়ে কথা বলতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, জেলা প্রশাসনের এলআর ফান্ড দীর্ঘদিনের চর্চার অংশ হলেও সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। আলোচনার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হবে।
সব মিলিয়ে, এলআর ফান্ড নিয়ে সরকারের সামনে এখন দু'টি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থাটি বন্ধ করা হবে, নাকি আইনি ভিত্তি ও কার্যকর নিরীক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে সংস্কার করা হবে।
//আইই//
