মেধা যাচ্ছে, পুঁজিও যাচ্ছে বিদেশ
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের দুটি প্রধান শক্তি হলো মেধা ও মূলধন। অথচ আজ এই দুই শক্তিই ভিন্ন ভিন্ন পথে দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। একদিকে দেশের মেধাবী তরুণ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও দক্ষ পেশাজীবীদের একটি অংশ উন্নত কর্মসংস্থান, নিরাপদ জীবন ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়নের আশায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। অন্যদিকে দেশের অর্থ ও মূলধনের একটি অংশ বৈধ বিনিয়োগের পথে না গিয়ে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবৈধ অর্থপাচারের মাধ্যমে বিদেশে চলে যাচ্ছে। একটি দেশের জন্য এর চেয়ে বড় সতর্কবার্তা আর কী হতে পারে? মেধা যখন দেশের বাইরে ভবিষ্যৎ খুঁজে নেয় আর অবৈধ পথে অর্জিত বা পাচারের অর্থ যখন দেশের বাইরে আশ্রয় নেয়, তখন ক্ষতিটা শুধু বর্তমানের নয়, এর বোঝা বহন করতে হয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও।
আজ বাংলাদেশের সামনে চরম উদ্বেগজনকভাবে দুটি সংকট পাশাপাশি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে মেধার ব্যাপক পাচার এবং পুঁজির নিরবচ্ছিন্ন বিদেশমুখিতা। আমাদের মেধাবীরা আজ দেশ ছাড়ছেন মূলত উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব, যথাযথ সামাজিক মর্যাদার সংকট এবং জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা থেকে। যে তরুণদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তিতে দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা ছিলো, তাদের এই বাধ্য হয়ে দেশত্যাগ করা যেকোনো স্বাধীন ও স্বাবলম্বী রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক এবং কলঙ্কজনক। অন্যদিকে, বহু বছর ধরে দেশের কষ্টার্জিত অর্থ ও পুঁজি অনিয়ম ও পাচারের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে বিদেশে, যা জাতীয় অর্থনীতিকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে।
একদিকে যোগ্যতার অবমূল্যায়ন আর নিরাপত্তার অভাবে মেধা শূন্য হওয়া, অন্যদিকে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারে মূলধন ধ্বংস হওয়া এই দুই প্রাণঘাতী ব্যাধি একটি জাতির জন্য অত্যন্ত মারাত্মক। এই দ্বিমুখী ক্ষরণ অবিলম্বে থামাতে না পারলে দেশের দৃশ্যমান উন্নয়নের গতি যেমন থমকে যাবে, তেমনি ধসে পড়বে একটি সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণ আজ দেশ ছাড়ার সুযোগ খুঁজছেন। বিদেশে পড়াশোনা বা চাকরি একসময় ছিল অভিজ্ঞতা অর্জনের পথ; এখন অনেকের কাছে সেটি স্থায়ীভাবে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা শিক্ষার্থী, দক্ষ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ কিংবা উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ ভবিষ্যৎ গড়তে বিদেশকেই নিরাপদ মনে করছেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এর অন্যতম কারণ দীর্ঘস্থায়ী কর্মসংস্থানের সংকট। উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকতে হয় বহু তরুণকে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, সীমিত সুযোগ, দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়নের অভাব এবং অনিশ্চয়তা তাদের হতাশ করে তোলে। অনেকেই মনে করেন, একই পরিশ্রম বিদেশে করলে যোগ্য সম্মান, ভালো বেতন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাওয়া সম্ভব। ফলে দেশপ্রেমের আবেগের চেয়ে বাস্তব জীবনের নিরাপত্তাই তাদের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে।
শুধু চাকরির অভাব নয়, কর্মক্ষেত্রে পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব, তদবির কিংবা ব্যক্তিগত পরিচয় বেশি কার্যকর হয়ে উঠলে মেধাবীরা নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করেন। এতে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে হতাশা জন্ম নেয়। যে সমাজে যোগ্য মানুষ সম্মান হারায়, সেখানে মেধা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এ বাস্তবতার আরেকটি দিক হলো গবেষণা ও উদ্ভাবনের সীমিত পরিবেশ। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো গবেষণায় বড় বিনিয়োগ করে, নতুন ধারণাকে উৎসাহ দেয় এবং প্রতিভাবানদের জন্য আধুনিক অবকাঠামো তৈরি করে। আমাদের দেশেও মেধাবী মানুষের অভাব নেই; কিন্তু গবেষণার সুযোগ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা অনেককে বিদেশমুখী করে তুলছে। ফলাফল হিসেবে রাষ্ট্র হারাচ্ছে ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী, গবেষক ও উদ্ভাবকদের।
মেধা হারানোর পাশাপাশি আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো পুঁজির দেশত্যাগ। দেশীয় বিনিয়োগের পরিবর্তে অর্থ বিদেশে চলে গেলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যে অর্থ নতুন শিল্প, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ হতে পারত, সেই অর্থ দেশের বাইরে চলে গেলে অর্থনীতির ভেতরের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা, সুশাসন ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগকে গুরুত্ব দেন। এসব বিষয়ে আস্থার ঘাটতি তৈরি হলে অনেকেই নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারান। এতে শুধু বড় উদ্যোক্তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; ক্ষতিগ্রস্ত হন নতুন চাকরির অপেক্ষায় থাকা লাখো তরুণও।
মেধা ও পুঁজির এই যুগপৎ বহির্গমনের প্রভাব ধীরে ধীরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, প্রযুক্তি এবং প্রশাসনের ওপরও পড়ে। দক্ষ শিক্ষক কমে গেলে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অভিজ্ঞ চিকিৎসক কমে গেলে স্বাস্থ্যসেবার মান কমে যায়। গবেষক হারালে উদ্ভাবনের গতি থেমে যায়। দক্ষ উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগ কমে গেলে শিল্প সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ ক্ষতি শুধু একটি খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো তরুণদের মানসিক পরিবর্তন। একসময় অনেকেই বিদেশে পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন। এখন অনেকেই শুরু থেকেই স্থায়ীভাবে বিদেশে বসবাসের পরিকল্পনা করেন। এই পরিবর্তন আমাদের আত্মসমালোচনার দাবি রাখে। কেন একজন মেধাবী তরুণ নিজের দেশকে সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে দেখতে পারছেন না এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। অন্যদিকে বৈধ পথে অর্জিত অর্থও যদি দেশের ভেতরে বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদেশে চলে যায়, তাহলে অর্থনীতির ভেতরের চাকা দুর্বল হয়ে পড়ে। কর্মসংস্থান কমে যায়, উৎপাদন কমে, সরকারের রাজস্ব আয়ও সীমিত হয়। ফলে উন্নয়নের জন্য ঋণনির্ভরতা বাড়ে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। আমাদের রয়েছে তরুণ জনগোষ্ঠী, উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার সক্ষমতা, কৃষি ও শিল্পের বিস্তৃত সম্ভাবনা এবং প্রযুক্তি খাতে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ। কিন্তু এসব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে মেধাকে মর্যাদা দিতে হবে এবং বিনিয়োগের জন্য আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
সবার আগে প্রয়োজন যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ নিশ্চিত করা। নিয়োগ, পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে আধুনিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ নীতিমালা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। অর্থপাচার প্রতিরোধেও কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আর্থিক খাতে জবাবদিহি, আইন প্রয়োগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার না করলে এই সংকট কাটানো সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে বৈধ বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে দেশীয় পুঁজি দেশের উন্নয়নেই ব্যবহৃত হয়।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আস্থা। রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা, প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। একজন তরুণ যদি বিশ্বাস করেন যে নিজের যোগ্যতা দিয়ে তিনি দেশে সফল হতে পারবেন, তাহলে তিনি সহজে দেশ ছাড়তে চাইবেন না। একজন উদ্যোক্তা যদি নিশ্চিত হন যে তার বিনিয়োগ নিরাপদ থাকবে, তাহলে তিনি বিদেশের পরিবর্তে নিজের দেশেই নতুন শিল্প গড়বেন। মেধা ও মূলধন এই দুই শক্তিই একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। এদের কোনো একটিকেও অবহেলা করার সুযোগ নেই। তাই উন্নয়নের প্রকৃত সূচক হবে তখনই, যখন দেশের মেধাবীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ এই মাটিতেই দেখতে পাবেন এবং দেশের পুঁজি দেশের মানুষের কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে ব্যবহৃত হবে।
সময় এখনো পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। তবে প্রশ্ন হলো, আমরা কি মেধাকে ধরে রাখার মতো দেশ তৈরি করতে পারছি এবং অবৈধ পথে বিদেশে চলে যাওয়া অর্থের প্রবাহ ঠেকাতে পারছি? একজন মেধাবী তরুণ যখন নিজের ভবিষ্যৎ দেশের বাইরে খুঁজে নেন, তখন দেশ হারায় শুধু একজন নাগরিককে নয়, হারায় একটি সম্ভাবনাকে। আর যখন অবৈধ পথে দেশের অর্থ বিদেশে চলে যায়, তখন দেশ হারায় শুধু টাকা নয়, হারায় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের সম্ভাবনা। তাই মেধা পাচার ও অর্থপাচারকে বিচ্ছিন্ন দুটি সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটির সঙ্গে দেশের মানবসম্পদ, অন্যটির সঙ্গে অর্থনৈতিক শক্তি জড়িত। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ এবং তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা। মেধা ও মূলধনকে দেশে ধরে রাখতে পারাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রনৈতিক সাফল্য। কারণ মেধা যদি বিদেশে চলে যায় আর পুঁজি যদি অবৈধ পথে বিদেশে চলে যায়, তাহলে দেশের মাটিতে উন্নয়নের ভিত কতটা শক্ত থাকবে, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
