অর্থনৈতিক উন্নয়নে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশল
কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে পোশাক শিল্প ও রেমিটেন্স। এই দুই খাতের যেকোনো একটিতে প্রবৃদ্ধি স্থবির হলে পুরো অর্থনীতি থমকে যায়। পোশাক শিল্পের পাশাপাশি কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ওষুধ, আইটি ও চামড়া শিল্প গত কয়েক বছরে কাঙ্ক্ষিত রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। রপ্তানি প্রণোদনা ও শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে পোশাক খাতকে যেভাবে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো হয়েছে, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের আগেই অর্থনীতির অন্য সম্ভাবনাময় খাতগুলোতেও এই ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া জরুরি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটানো, ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি ও খেলাপি ঋণ আদায় হতে পারে বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
রপ্তানি বাণিজ্যের ধীরগতি দেশের অর্থনীতির গতিকে মন্থর করে দিয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) তৈরি পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছে ২৫.৮০ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৬.৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি কমেছে ১৩.২১ শতাংশ। পাশাপাশি মোট পণ্য রপ্তানিও ১২.২১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থাপনার জটিলতা, বন্দর খালাসে দীর্ঘসূত্রিতা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্ক (reciprocal tariffs) আরোপ এর পেছনে প্রধান কারণ। এছাড়া কৃষিপণ্য, পাটজাত পণ্য এবং সিরামিক খাতও প্রত্যাশিত আয় অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এই স্থবিরতা মোকাবিলায় বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে প্রায় ৩.৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী বহু তরুণ-তরুণী শিক্ষা বা কর্মসংস্থান—কোনোটিতেই যুক্ত নয় (NEET), যা ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য মারাত্মক উদ্বেগের বিষয়। দেশের মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৪৪.৭ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত থাকলেও জিডিপিতে এর অবদান কম। অন্যদিকে, শিল্প খাতে কর্মসংস্থান মাত্র ১৭.৪ শতাংশ। পর্যাপ্ত শ্রমশক্তি নিয়োগের আগেই শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে যাওয়ায় ‘প্রি-ম্যাচিওর ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’-এর লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তাছাড়া, দীর্ঘস্থায়ী শাসন ব্যবস্থার অনিশ্চয়তার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে ধীরচলো নীতি গ্রহণ করেছেন। ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ৩২.০৫%, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ২৮.৫৪ শতাংশে। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ মাত্র ৬.০৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নেমে এসেছে ৬.১০ শতাংশে, যা সম্প্রতি সর্বনিম্ন। অন্যদিকে সরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২.১৯ শতাংশে। উচ্চ সুদহার, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হচ্ছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা, যার বড় অংশই মাত্র ৫,৭৫৫ জন গ্রাহকের কাছে আটকে আছে। তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও চামড়ার মতো উৎপাদনমুখী খাতের বড় ঋণগ্রহীতারা খেলাপির তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখিয়ে অবিলম্বে খেলাপি ঋণ আদায় করতে হবে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতে সহজ শর্তে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে হবে।
অন্যদিকে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় চাপ তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সার্বিক মুদ্রাস্ফীতি ৮.৫৮ শতাংশে নামলেও মজুরি বৃদ্ধির হার ৮.১২ শতাংশে স্থির থাকায় প্রকৃত আয় বাড়েনি। বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এবং আমদানিকৃত পণ্যের মজুতের সঠিক তথ্যের অভাবে নিত্যপণ্যের দাম নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজার তদারকি জোরদার ও সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করার মাধ্যমে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে আনা জরুরি।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ বাংলাদেশের বড় অর্জন হলেও এতে বাণিজ্যিক ঝুঁকি বাড়ছে। উত্তরণের পর শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা, অগ্রাধিকারমূলক বাজার প্রবেশাধিকার এবং জেনারেটিক ওষুধের পেটেন্ট সুবিধা পাওয়া যাবে না। ডব্লিউটিও-এর নিয়ম অনুযায়ী রপ্তানি ভর্তুকি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হবে। বিশেষ করে, ২০২৬ সালের পর ওষুধের কাঁচামাল (API) উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে না পারলে ওষুধের দাম বহুগুণ বেড়ে যাবে। এজন্য জাতীয় API পলিসির দ্রুত বাস্তবায়ন ও গবেষণা প্রণোদনা প্রয়োজন। এলডিসি উত্তরণের ধাক্কা সামলাতে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা অপরিহার্য হলেও বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬.৭৮ শতাংশ। জটিল কর কাঠামো ও অটোমেশনের অভাবে রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে ঋণনির্ভরতা বাড়ছে।এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স, তেলের দাম ও পণ্য পরিবহনে বড় সংকট তৈরি করছে। তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আকাশ ও সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বিকল্প কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
সুপরিকল্পিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়ন, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ পুনরায় বিশ্বে দ্রুততম প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে সক্ষম হবে।
লেখক: রিসার্চ ফেলো, বিএফটিআই ও শিক্ষক, ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিক্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
