দেনায় ডুবে থাকা পাকিস্তানই কেন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মাথায়
২০২৩ সালে দেউলিয়ার চৌকাঠে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল পাকিস্তানের অর্থনীতি। ওই সময় আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার বা আইএমএফ থেকে পাওয়া ৩০০ কোটি ডলারের ঋণে কোনও মতে রক্ষা পায় ইসলামাবাদ। ২০২৪ সালে শাহবাজ সরকারকে ফের ৭০০ কোটি ডলার ধার দেয় ওই আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। পরবর্তীকালে জলবায়ু পরিবর্তনগত সমস্যার জেরে আলাদা করে আইএমএফ থেকে আরও ১৩০ কোটি ডলারের ঋণ পায় দেশটি। এখানেই শেষ নয়, গত ৭ অক্টোবরে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে একটি ‘স্টাফ লেভেল’ চুক্তি করেছে ইসলামাবাদ। তাতে চূড়ান্ত অনুমোদন মিললে ঋণের দায়ে জর্জরিত এই দেশটির জন্য মঞ্জুর হবে অতিরিক্ত আরও ১২১ কোটি ডলার ঋণ। জানা যাচ্ছে, ওই অর্থ হাতে পেলে পরবর্তী ঋণের আবেদনেরও প্রস্তুতি নেবে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার।
পাকিস্তান স্টেট ব্যাঙ্কের (কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তাদের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩,৭৫৫ কোটি ডলার। তার পরেও আর্থিক ঘাটতি মেটাতে পারছে না দেশটি।
পাকিস্তান কোন ব্যক্তি হলে বলা যেতো, ‘মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত দেনা’। বলা যায়, আইএমএফ থেকেই ঋণের পর ঋণ নিয়ে কোনও মতে দেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রেখেছে পাকিস্তান। দেশটি যে ঋণের দায়ে জর্জরিত তাতে কোন সন্দেহ নেই। আর আইএমএফ (ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড)- এর ‘দয়া’য় কোনও রকমে টিকে আছে দেশটির অর্থনীতি। এই অবস্থায় ঋণ-জর্জরিত পাকিস্তানই এবার বসতে চলেছে বিশ্ব অন্যতম সেরা দুই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাথায়, ইসলামাবাদের জন্য যা ‘জ্যাকপট’ পাওয়ার সামিল।
যদিও এই ঘটনাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ পর্যবেক্ষক মহল। কারণ তারা এই দায়িত্বকে অলংকারিক হিসাবে মনে করেন। তা সত্ত্বেও বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাঙ্ক ও আইএমএফ-র শীর্ষ পদ পাওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী ভারসাম্যহীনতার সমাধানে সমন্বয় গড়ে তোলার পক্ষে সওয়াল করার সুযোগ পাবে ইসলামাবাদ সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
চলতি বছরের ১২-১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্ককে বসেছিল বিশ্বব্যাঙ্ক গ্রুপ ও আইএমএফ-র বার্ষিক সভার পুর্ণাঙ্গ অধিবেশন। সেখানেই পাকিস্তানের আর্থিক লেনদেন বিষয়ক মন্ত্রী আহাদ খান চিমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বব্যাঙ্ক গ্রুপ ও আইএমএফ-র পরিচালনা পর্ষদের (বোর্ডস অফ গভর্নরস) প্রধান মনোনীত করা হয়েছে। আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালে তিনি এই দায়িত্ব পালন করবেন।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাঙ্কের পরিচালন পর্ষদের প্রধান হিসাবে চিমার নিয়োগের খবর আসতেই এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) তা পোস্ট করে পাকিস্তান অর্থ মন্ত্রণালয়। এই ঘটনাকে তারা সেখানে ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ হিসাবে উল্লেখ করেছে। কারণ, ১৯৫৩ সালের পর ফের আরও একবার এই গুরুদায়িত্ব পেলো ইসলামাবাদ। দেশটির দাবি, এতে বিশ্ব অর্থনীতির রূপরেখা তৈরিতে ছাপ রাখার সুযোগ পাবে পাকিস্তান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পরবর্তী সময়ে ভেঙে পড়া দুনিয়ার অর্থনীতিকে ফের চাঙ্গা করতে বিশ্বে দু’টি প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়। সেগুলো হলো, আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার বা আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাঙ্ক। ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনে এই দুই প্রতিষ্ঠানের রূপরেখা তৈরি হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হতে আরও কিছুটা সময় লেগে যায়। দুটি সংস্থারই সদর দফতর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে।
১৯৪৫ সালে আইএমএফ এবং ১৯৪৬ সালে বিশ্বব্যাঙ্ক গঠিত হলে, তাদের হাত ধরে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায় দুনিয়ার অর্থনীতি। পাশাপাশি, বিশ্ব শান্তি বজায় রাখতে তৈরি হয় জাতিসংঘের। ১৯৬৪ সালে বাণিজ্যিক উন্নয়নের স্বার্থে আরও একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে তারা। এর পোশাকি নাম ‘ইউনাইটেড নেশন্স কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ বা আঙ্কটাড। এর মধ্যে আবার গজিয়ে উঠেছে ‘ঋণ গ্রহণকারীদের মঞ্চ’ বা ‘বরোয়ার্স প্ল্যাটফর্ম’।
গত বছরের (২০২৫) জুলাইয়ে স্পেনের সেভিল সম্মেলনে বিশেষ এই মঞ্চ তৈরির সিদ্ধান্ত নেন আঙ্কটাড কর্তৃপক্ষ। চলতি (২০২৬) বছরের ১৫ এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে এই প্লাটফর্ম। প্ল্যাটফর্মটির মূল কাজ হলো আর্থিকভাবে দুর্বল দেশগুলোকে ঋণ নেওয়ার কর্মপদ্ধতি শেখানো এবং এ সংক্রান্ত তথ্যের আদান-প্রদান। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই পরিষেবা দিচ্ছে তারা।
গত ১২ অক্টোবর ব্যাঙ্কক-এ আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাঙ্কের বার্ষিক সম্মেলন চলাকালীন ‘ঋণ গ্রহণকারী মঞ্চে’র পরিচালন পর্ষদের সভাপতি নির্বাচিত হন পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহম্মদ আওরঙ্গজেব। চলতি অর্থবছরে (২০২৬-২৭) ওই প্ল্যাটফর্মের নেতৃত্ব দেবেন তিনি। এখানে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, আগেও এই প্রতিষ্ঠানকে নানাভাবে সাহায্য করেছে ইসলামাবাদ। অতীতে মিশরের নেতৃত্বাধীন এর ওয়ার্কিং গ্রুপের সহ-সভাপতি ছিলো পাকিস্তান।
আঙ্কটাড অন্তর্ভুক্ত ‘ঋণ গ্রহণকারী মঞ্চে’র ওয়ার্কিং গ্রুপের মূল কাজ হলো নীতি নির্ধারণ। কোন কোন দেশ এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে এবং কীভাবে প্ল্যাটফর্মটি পরিচালিত হবে, সেটা ঠিক করার দায়িত্ব রয়েছে তাদের। মিশর ও পাকিস্তান ছাড়াও এর সদস্যপদ রয়েছে কলম্বিয়া, হন্ডুরাস, মলদ্বীপ, নেপাল ও জাম্বিয়ার। ফলে, এ মঞ্চের মাথায় ইসলামাবাদের বসা একেবারেই আশ্চর্যের নয়।
এই মঞ্চের পরিচালন পর্ষদের সভাপতির পদ পাওয়ার পর গণমাধ্যমে বিবৃতি দেন পাক অর্থমন্ত্রী আওরঙ্গজেব। তাঁর কথায়, ‘‘ইসলামীয় প্রজাতান্ত্রিক দেশগুলোকে আরও ভালভাবে ধার নিতে সাহায্য করব আমরা। তা ছাড়া একে অপরের সংস্কার থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। পরিকাঠামোগত উন্নয়নের নতুন উপায় অন্বেষণে মনোনিবেশও জরুরি।’’
একসঙ্গে জোড়া দায়িত্ব হাতে পাওয়ায় স্বভাবতই উল্লসিত পাকিস্তান। যদিও একে গুরুত্ব দিতে নারাজ ওয়াকিবহলা মহল। তাদের বক্তব্য, পদ পাওয়ার অর্থ এই নয় যে আইএমএফ বা বিশ্ব ব্যাঙ্কের ঋণের নীতি নির্ধারণের যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ পেতে চলেছে ইসলামাবাদ। বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেতে পারে তারা। ফলে, আলাদা করে এর দুর্দান্ত কোনও ফায়দা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) একটি পোস্ট করেছেন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ তথা আইএমএফ-র সাবেক এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর কৃষ্ণমূর্তি ভি সুব্রহ্মণ্যম। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘‘এটা ঠিক যে, ৭৪ বছর পর বিশ্ব অর্থনীতির শীর্ষ টেবলে ফিরেছে পাকিস্তান। আগামী বছর আইএমএফ ও বিশ্বব্যাঙ্কের বার্ষিক পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করবে তারা। কিন্তু এটা প্রোটোকল, কোনও বাড়তি ক্ষমতা নয়।’’
সুব্রহ্মণ্যম জানিয়েছেন, প্রতি বছর আইএমএফ ও বিশ্বব্যাঙ্কের বোর্ডস অফ গভর্নরস পরিবর্তনের নিয়ম রয়েছে। যেমন এ বছর সেই দায়িত্ব পালন করেছে প্যারাগুয়ে। ২০২৫ সালে ওই দায়িত্বে ছিল কাবো ভার্দে। তা ছাড়া, ঋণ বা আর্থিক অনুমোদনের ক্ষেত্রে সভাপতির কোনও বাড়তি ক্ষমতা নেই। নির্ধারিত নিয়ম মেনে বিষয়টিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই তাঁর কাজ।
একই কথা জাতিসংঘের ‘ঋণ গ্রহণকারী মঞ্চের’ ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এর মাথায় থেকে আর্থিকভাবে দুর্বল দেশগুলোকে ধার নেওয়ার পরামর্শ দিতে পারে পাকিস্তান। সেটা গ্রহণ বা বর্জন করা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের মর্জির উপর নির্ভর করবে। তা ছাড়া, আইএমএফের ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে থাকা ইসলামাবাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন থাকছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুব আলী বলেন, ‘এটি একটি অলংকারিক পদ। তবে এই পদ পাওয়া পাকিস্তানের জন্য একটি সম্মানের বিষয়ও বটে। তবে বাস্তবে এই পদে থেকে কোন ঋণের বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের কোন সুযোগ নেই।’
তিনি বলেন, আগরামী ২০২৭ সালের অক্টোবর মাসে ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পরবর্তী বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হবে। ওই কার্যক্রমের সভাপতিত্ব করাই মুলত এই পদের প্রধান কাজ। এছাড়া বিশ্বের ১৯১টি সদস্য দেশের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের উপস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক আলোচনা ও পারস্পরিক সংলাপ এগিয়ে নিতে তিনি সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবেন।
অধ্যাপক মাহবুব আলী বলেন, ‘তবে পাকিস্তান এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক সংকট এবং জলবায়ু তহবিলের মতো বিষয়গুলো বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার চেষ্টা করতে পারবে।’
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি বছর সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে পর্যায়ক্রমে সভাপতি বেছে নেওয়া হয়। প্রভাবশালী দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এই পদ উন্মুক্ত। সাধারণত সদস্য দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী, অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রী বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানকে প্রতিনিধি করা হয়। বর্তমানে পাকিস্তানে বিশ্বব্যাংকের বিষয়টি সামলায় অর্থনৈতিক বিষয়ক বিভাগ এবং আইএমএফ-র দেখভাল করে অর্থ বিভাগ। সেই সূত্রে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রী আহাদ খান চিমা বিশ্বব্যাংকে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে যুক্ত থাকায় এই পদ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন।
দক্ষিণ এশিয়ায় এই পর্ষদের সভাপতির চেয়ারে বসার ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৫০ সালে ভারতের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী চিন্তামন ডি দেশমুখ প্রথম এই দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান, ১৯৬৮ সালে শ্রীলঙ্কা এবং ১৯৯৯ সালে নেপাল বার্ষিক সভার সভাপতির আসন অলংকৃত করে।
