এবার আসছে উষ্ণ শীত, কম স্থায়িত্ব আর এল নিনোর প্রভাব
দেশ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বা বর্ষার বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রকৃতিতে শুরু হয়েছে ঋতু পরিবর্তনের পালাবদল। সকালের ভিলেন ভোরের কুয়াশা, ফসলের মাঠে শিশিরভেজা ঘাস আর শেষ রাতের বাতাসে মৃদু শীতলতা জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। যদিও দিনের বেলায় রোদের তেজ এবং ভ্যাপসা গরম এখনো পুরোপুরি বিদায় নেয়নি, তবুও সন্ধ্যার পর আবহাওয়ায় যে পরিবর্তন আসছে, তা স্পষ্টতই শীতের পদধ্বনি। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং জলবায়ু গবেষকদের পূর্বাভাস বলছে, এ বছরের শীতকাল কিছুটা ভিন্ন হতে চলেছে। চলতি মৌসুমে শীতের তীব্রতা যেমন কম হতে পারে, তেমনি এর ব্যাপ্তি বা স্থায়িত্বও হতে পারে স্বাভাবিকের চেয়ে সংক্ষিপ্ত।
ঋতু পরিবর্তনের প্রাথমিক লক্ষণ
সাধারণত অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায় নিতে শুরু করে। এ সময় বৃষ্টির প্রবণতা কমে আসে, আকাশ তুলনামূলক পরিষ্কার থাকে এবং রাতের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে নামতে শুরু করে। কুয়াশার উপস্থিতি ঋতু পরিবর্তনের অন্যতম পরিচিত একটি লক্ষণ। নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ের আশপাশে এবং খোলা ফসলের মাঠে রাতের বাতাসে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে ভোরের দিকে হালকা কুয়াশার চাদর তৈরি করে।
কৃষি আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উজ্জ্বল সূর্যকিরণ মিলছে প্রায় ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা। সারা দেশে দিনের তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে, আর রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে আসছে ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। ইতোমধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চলে শীতের আমেজ বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া এবং রংপুরের মতো সীমান্ত অঞ্চলের জেলাগুলোতে তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে আসতে শুরু করেছে। গত ২০ অক্টোবর তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এবারের শীত কেন ‘উষ্ণ শীত’ বা ‘ওয়ার্ম উইন্টার’?
আবহাওয়াবিদদের মতে, চলতি মৌসুমে শীতের পূর্ণাঙ্গ আমেজ পেতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে আরও কিছুটা সময় লাগবে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী নভেম্বরের প্রথম দিকে উত্তরের জেলাগুলোতে তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি নেমে যেতে পারে এবং মাসের শেষ দিকে বিক্ষিপ্তভাবে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে রাজধানী ঢাকায় শীতের প্রকৃত অনুভূতি শুরু হতে পারে ডিসেম্বরের দিকে, যেখানে তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এবারের শীতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হবে, এটি হবে একটি ‘ওয়ার্ম উইন্টার’ বা উষ্ণ শীত। আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবিরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে এ বছর শীতের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব দুটোই কমবে। সাধারণত দেশে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি— এই তিন মাস শীতকাল ধরা হলেও, এ বছর শীতের স্থায়িত্ব ৯০ দিনের কম হতে পারে। বর্ষাকালে সূর্যের কিরণ খাড়াভাবে এলেও এ সময়ে তা আরও তির্যকভাবে পড়ছে, যার ফলে দিনের বেলায় রোদের খরতাপ কমে রাতের শীতলতা ক্রমান্বয়ে বাড়বে। তবে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে যত বেশি ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত হবে, শীতের অনুভূতি তত বাড়বে।
তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, এখন হিম হিম ভাবের কারণ দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায় নিয়েছে। বর্তমানে বাতাস আসছে উত্তর দিক থেকে। আগামী কয়েক মাসে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বাতাস প্রবাহিত হবে। যত বেশি উত্তরের বাতাস আসবে, তত বেশি ঠান্ডা অনুভূত হবে। এখন যেমন উত্তর দিক থেকে বাতাস আসছে, ফলে উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়ে তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রির নিচে নেমে এসেছে।
তবে এবারের শীত ‘ওয়ার্ম উইন্টার’ বা উষ্ণ শীত হবে বলে জানিয়েছেন তরিফুল নেওয়াজ কবির। তিনি বলেন, এল নিনোর প্রভাবে সারা পৃথিবীতে উষ্ণতা বেড়েছে। এর প্রভাব বিশ্ব আবহাওয়ায় বিরাজ করছে। পাশাপাশি রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। তাই বিভিন্ন কারণে এবারের শীত উষ্ণ হতে পারে।’
এবারের শীতে তাপমাত্রা বেশি থাকলেও ভিন্ন পর্যবেক্ষণ উঠে এসছে আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছার পূর্বভাসে। তাঁর মতে, ‘এ বছর তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কুয়াশা দীর্ঘস্থায়ী হলে তাপমাত্রা খুব বেশি না কমলেও মানুষের কাছে ঠান্ডা বেশি মনে হতে পারে।’
উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, তাপমাত্রা ১২, ১৫ কিংবা ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলেও দিনের বেশির ভাগ সময় সূর্যের দেখা না মিললে শীতের অনুভূতি তীব্র হতে পারে। ফলে শুধু সর্বনিম্ন তাপমাত্রা দিয়ে শীতের প্রকৃত অনুভূতি সব সময় নির্ধারণ করা যায় না।
এবার তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকার সম্ভাবনার পেছনে এল নিনোর প্রভাবের কথাও উল্লেখ করেছেন এই আবহাওয়াবিদ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে ডিসেম্বরেও এল নিনোর প্রভাব অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এ পরিস্থিতি বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শক্তিশালী এল নিনোর বৈশ্বিক ও স্থানীয় প্রভাব
শীতের এই পরিবর্তিত রূপের পেছনে অন্যতম বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে প্রশান্ত মহাসাগরের বিষুবীয় অঞ্চলে সৃষ্টি হওয়া শক্তিশালী ‘এল নিনো’। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষভাগে এসে এল নিনোর প্রভাব আরও জোরালো হয়েছে। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। বাংলাদেশেও তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকা, বৃষ্টিপাতের ঘাটতি কিংবা কোনো কোনো এলাকায় খরার মতো পরিস্থিতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে দেশের ওপর এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে এল নিনোর তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং অন্যান্য আবহাওয়াগত উপাদানের ওপর।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত এবং আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছন্দে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু গবেষকদের আশঙ্কা, এল নিনো এবং দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণতা একত্রে যুক্ত হয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। এর ফলে ২০২৭ সাল বিশ্বের অন্যতম উষ্ণতম বছর হিসেবে রেকর্ড গড়তে পারে।
বাংলাদেশে এল নিনোর প্রত্যক্ষ প্রভাবে শীতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকতে পারে। তবে আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে বলছেন, তাপমাত্রা বেশি থাকলেও যদি দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা বা মেঘলা আবহাওয়া বিরাজ করে, তবে মানুষের গায়ে শীতের তীব্রতা বেশি অনুভূত হতে পারে। এছাড়া এল নিনোর প্রভাবে মাঝেমধ্যে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়া বা আকস্মিক আবহাওয়া বৈচিত্র্যের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কারণ, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর বিদায়ের পরও দেশের আবহাওয়া পুরোপুরি শুষ্ক হয়ে যায় না। বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হলে কিংবা বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তন ঘটলে দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উপকূলীয় ও দক্ষিণাঞ্চলে আবহাওয়ার পরিবর্তন তুলনামূলক বেশি অনুভূত হতে পারে। তাই মৌসুমি বায়ু বিদায় নিয়েছে বলেই বৃষ্টির সম্ভাবনা একেবারে শেষ হয়ে গেছে, এমন ধারণাও সঠিক নয়।
এবার ‘ওয়ার্ম উইন্টার’ হলে বৃষ্টি বাড়বে কি না, এমন প্রশ্নের সরাসরি ব্যাখ্যা না দিয়ে আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ বলেন, বৃষ্টির সঙ্গে শীতের সম্পর্ক নেই। শীতকালে বাতাসের ধরনে পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টি হয়। ভূমধ্যসাগর থেকে আসা বাতাস দেশে প্রবেশ করলে বৃষ্টি হয়। ওই বাতাস মেঘ নিয়ে আসে।
কৃষি খাত ও জনজীবনে সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলাদেশে এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে জলবায়ু গবেষক ও আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণে সতর্কতার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এখনই দেশের আবহাওয়ায় এর প্রভাবের মাত্রা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ঘাটতি এবং কোনো কোনো এলাকায় খরার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির কারণে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রকৃতির এই পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি পড়তে শুরু করেছে গ্রামীণ জনজীবন ও কৃষিকাজে। শীতকালীন শাকসবজি চাষ, বীজতলা তৈরি এবং রবি ফসলের প্রাথমিক পরিকল্পনায় কৃষকেরা এখন আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন। ভোরের ঘন কুয়াশা ও শিশিরের স্থায়িত্ব অনেক সময় কিছু ফসলের ক্ষেত্রে বাড়তি পরিচর্যার দাবি রাখে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষকদের উচিত স্থানীয় আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত অনুসরণ করে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া।
পাশাপাশি, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূরাজনৈতিক নানা অস্থিরতার কারণে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ চেইনেও এর পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। তবে সার্বিক প্রস্তুতি ও সময়োপযোগী সতর্কবার্তা গ্রহণের মাধ্যমে এসব ঝুঁকি অনেকাংশে মোকাবিলা করা সম্ভব।
ঢাকাভিত্তিক জলবায়ু গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের পরিচালক গোলাম রব্বানী বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এল নিনোর সময় বাংলাদেশের কিছু এলাকায় তাপপ্রবাহ ও খরাসদৃশ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আবার অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও দেখা দিতে পারে। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার কোন বিকল্প নেই।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকেরাও। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক ও বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রাজিব কুমার সাহার মতে, এল নিনোকে থামানো সম্ভব না হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
সব মিলিয়ে, এবারের শীতকাল গতানুগতিক ধারার চেয়ে কিছুটা ব্যতিক্রম হতে চলেছে। পৌষ ও মাঘের সেই হাড়কাঁপানো তীব্র শীত হয়তো এবার সর্বত্র দীর্ঘস্থায়ী হবে না; বরং একটি সংক্ষিপ্ত ও উষ্ণ শীতের মধ্য দিয়েই পার হবে মৌসুমটি। তবে আবহাওয়া সবসময়ই পরিবর্তনশীল। তাই উত্তরাঞ্চলের হিমেল হাওয়া, কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল আর বৈশ্বিক জলবায়ুর খামখেয়ালিপনার মাঝে শীতের সঠিক চিত্র পেতে নিয়মিত আবহাওয়া পূর্বাভাসের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে দেশবাসীকে।
