লস এন্ড ডেমেজ ফান্ড থেকে প্রথম অর্থ পাচ্ছে নেপাল
পরিমান অতি অল্প হলেও জাতিসংঘের লস এন্ড ডেমেজ ফান্ড থেকে প্রথম অর্থ পাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নেপাল। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে নেপালকে এই অর্থ দেয়া হচ্ছে। অর্থের পরিমান মাত্র ২ কোটি ডলার। গত আগস্টে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় দেশটিতে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জাতিসংঘের ‘ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ থেকে নেপালের জন্য দুই কোটি ডলার বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা দিতে ২০২৩ সালে এই তহবিল গঠন করা হয়েছিল। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এই অর্থ বরাদ্দকে জলবায়ু ন্যায়বিচার ও নেপালের প্রতি সংহতির ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তবে নেপালের হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দুর্যোগে দেশটির অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২৭০ কোটি ডলার। সেই তুলনায় বরাদ্দ পাওয়া দুই কোটি ডলার মোট ক্ষতির ০ দশমিক ৭ শতাংশ মাত্র।
বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
গত ২৬ আগস্ট নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এতে তিব্বত সীমান্তবর্তী বিভিন্ন শহর ও গ্রামের ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক ও স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নেপাল সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এ দুর্যোগে প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের ৬০ হাজার মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন। প্রতিবেদনে প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্যোগের পর ৩১ আগস্ট নেপাল সরকার জাতিসংঘের তহবিলের কাছে দুই কোটি ডলার সহায়তা চেয়ে আবেদন করে।
আবেদনে দেশটির অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে বলেন, স্বল্পোন্নত ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা পাহাড়ি দেশ নেপাল বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে সামান্য অবদান রাখলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ধরনের প্রভাব বহন করছে। তিনি এমন একটি সহায়তা চেয়েছিলেন, যা দ্রুত ও মানবিকভাবে জলবায়ু বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা তুলে ধরবে।
ক্ষতিপূরণ তহবিলের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা। ২০২৩ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে কপ২৮ এই তহবিলটি কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর লক্ষ্য, জলবায়ুজনিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া।
ইউএনডিপি বলেছে, নেপালের জন্য অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত পুনর্গঠন, পুনরুদ্ধার এবং দুর্যোগসহনশীল জীবিকা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। সংস্থাটির মতে, এই সিদ্ধান্ত বিশ্বের অন্যান্য জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। বহুপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে দুর্যোগের সময় জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে তহবিলের নিয়ম অনুযায়ী, একটি প্রকল্পের জন্য সর্বোচ্চ দুই কোটি ডলার চাওয়া যায়। ফলে নেপালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় এই সহায়তার পরিমাণ সীমিত।
ক্ষতিপূরণের অংক নিয়ে অসন্তোষ
নেপালের জন্য বরাদ্দকে ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও অর্থের পরিমাণ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। নেপালের জলবায়ু আন্দোলনকর্মী ও দেশটির সাবেক সংসদ সদস্য রাজেন্দ্র বাগজাই দুই কোটি ডলারের সহায়তাকে অপর্যাপ্ত বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় এই অর্থ খুবই সামান্য। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও দরিদ্র মানুষের ওপর এর প্রকৃত প্রভাব মোকাবিলায় যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
চাহিদা বেশি, তহবিলে অর্থ কম
এ পর্যন্ত উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে তহবিলটির কাছে ১৭৬টি আবেদন করেছে। এসব আবেদনে মোট ২৮০ কোটি ডলার সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, উন্নত দেশগুলো এই তহবিলে এখন পর্যন্ত মাত্র ৮০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অর্থাৎ, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর চাহিদার তুলনায় প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ অনেক কম। নেপালের জন্য অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ
/কেআর/
