গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ ফুরোচ্ছে, ভারতের সাড়া চাইছে বাংলাদেশ: এএফপি
ছবি: এএফপি
গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভারতের সঙ্গে নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে চাপ বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ। ১৯৯৬ সালে সই হওয়া ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১২ ডিসেম্বর। নতুন চুক্তি না হলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা বাংলাদেশের।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত বার্তা সংস্থা এএফপি'র এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তি নবায়নের আলোচনা শুরুর অনুরোধ জানানো হলেও ভারত এখনো তাতে সাড়া দেয়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গঙ্গাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে হবে। কমিশনের সর্বশেষ কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে গত মে মাসে। তবে মন্ত্রী পর্যায়ে সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিলো ২০২২ সালে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও পানি বণ্টনবিষয়ক কারিগরি কমিটির প্রধান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এএফপিকে বলেছেন, নতুন চুক্তি হতে হবে পারস্পরিক সুবিধা ও সম্মানের ভিত্তিতে।
শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট
১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি বণ্টনের বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যারাজটি বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উজানে অবস্থিত। চুক্তিটির মেয়াদ শেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়নের কোনো বিধান নেই।
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকায় পানির সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষি ও মৎস্য খাতে। এএফপি'র প্রতিবেদনে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলা হয়েছে, বছরের প্রায় তিন মাস নদীতে পানির প্রবাহ এতো কমে যায় যে, নৌযান চলাচলও কঠিন হয়ে পড়ে। নদীতে মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় জেলেদেরও বিকল্প পেশার দিকে যেতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এসব নদীর পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও মতপার্থক্য রয়েছে। এর মধ্যে গঙ্গা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন চুক্তিতে কী চায় বাংলাদেশ
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সময় ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সই হয়েছিলো। বর্তমান সরকার নতুন চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং পুরো নদী অববাহিকার পানির চাহিদা বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য মালিক ফিদা এ খান এএফপি-কে বলেছেন, নতুন চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা এবং পুরো নদী অববাহিকাকে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে গত ৮ অক্টোবর পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেছিলেন, বাংলাদেশ শুধু পুরোনো চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে চায় না, দীর্ঘমেয়াদি নতুন চুক্তি করতে চায়। এতে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো পানির হিস্যা নিশ্চিত করার নিশ্চয়তামূলক ধারা যুক্ত করা বাংলাদেশের অন্যতম অগ্রাধিকার।
চুক্তি না হলে কী হতে পারে
এএফপি'র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গঙ্গার পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষি, মৎস্য, সেচ ও পরিবেশের ওপর ইতোমধ্যে প্রভাব পড়ছে। গঙ্গা থেকে পানি পাওয়া যাওয়ায় গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের কার্যক্রমও সংকুচিত হয়েছে। একসময় প্রায় ৯৫৫ বর্গকিলোমিটার কৃষিজমিতে সেচ দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমানে প্রকল্পটির আওতা কমে প্রায় ৫৫০ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে বলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে এএফপি।
গঙ্গার পানি সুন্দরবন অঞ্চলেও গুরুত্বপূর্ণ। গঙ্গার একটি শাখা গড়াই নদী সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ বজায় রাখতে সহায়তা করে। পানির প্রবাহ কমে গেলে লবণাক্ততা বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
ঢাকাভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন রিভারাইন পিপলের শেখ রোকন এএফপিকে বলেছেন, আগের চুক্তিহীন সময়ে গঙ্গার পানির সংকটের কারণে অন্তত তিনটি নদী প্রায় শুকিয়ে গিয়েছিলো। এবার চুক্তি না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বাড়ছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট এবং বর্ষায় অতিরিক্ত পানি, বন্যা ও নদীভাঙন- দুই ধরনের সমস্যাই মোকাবিলা করতে হচ্ছে দেশটিকে। ফলে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে নতুন চুক্তি বাংলাদেশের কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
//আইই//
