নাগরিক কবি শামসুর রাহমানের জন্মদিন আজ
নাগরিক কবি শামসুর রাহমানের ৯৮তম জন্মদিন আজ। ১৯২৯ সালের আজকের দিনে ঢাকার মাহুতটুলীতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ঢাকা শহরেই কবির বেড়ে ওঠা। তাঁর পৈতৃক বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরার পাড়াতলী গ্রামে। ডাকনাম ছিলো বাচ্চু। বাবার নাম মোখলেসুর রাহমান চৌধুরী ও মায়ের নাম আমেনা বেগম।
১৯৫৭ সালে একজন সংবাদকর্মী হিসেবে ‘দৈনিক মর্নিং নিউজ’ পত্রিকায় কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। একই বছর রেডিও পাকিস্তানে অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সালে আবার ‘মর্নিং নিউজ’-এ ফিরে আসেন এবং ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ‘মর্নিং নিউজ’-এর সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৪ সালের শেষের দিকে ‘দৈনিক পাকিস্তান’-এ সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন শামসুর রাহমান। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ওই পত্রিকাটি ‘দৈনিক বাংলা’ নামে প্রকাশিত হয়। ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে সামরিক সরকারের শাসনামলে তিনি ‘দৈনিক বাংলা’ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর সাহিত্য পত্রিকা ‘অধুনা’র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৪৯ সালে ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকায় শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় সম্পাদকীয় ও উপ-সম্পাদকীয় লেখায় নিজের ছদ্মনাম হিসেবে সিন্দাবাদ, চক্ষুষ্মান, লিপিকার, নেপথ্যে, জনান্তিকে, মৈনাক ব্যবহার করেছেন। একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেও পরিচিতি রয়েছে তাঁর। তৎকালীন সরকারি পত্রিকায় কাজ করা সত্ত্বেও তিনি আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের প্রতি বিদ্রূপ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারাভোগের সময় তাঁকে উদ্দেশ করে তিনি কবিতা লিখেছেন।
রবীন্দ্রসংগীতের ওপর পাকিস্তান সরকারের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তিনি। তাঁর লেখা ‘বর্ণমালা’, ‘আমার দুখিনী বর্ণমালা’, ‘আসাদের শার্ট’, ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ এসব কবিতার মধ্যে বিদ্রোহী চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৯৮৭ সালে স্বৈরশাসন আমলে পরপর ৪ বছর ধরে ‘শৃঙ্খল মুক্তির কবিতা’, ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কবিতা,’ ‘সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কবিতা’ এবং ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কবিতা’ লেখেন তিনি।
কবি হিসেবে দুই বাংলায় সমান জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকের ৫ বিশিষ্ট কবির পর আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান পুরুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাঁকে। নাগরিক কষ্ট, দুঃখ-সুখ তার কবিতায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে। জীবনের সত্য-সুন্দরকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য। একই সঙ্গে বাঙালির ভাষা আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীনতার চেতনা তার কবিতায় পেয়েছে স্বতন্ত্র প্রকাশ। মানবিক মূল্যবোধ, অসাম্প্রদায়িকতা ও গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিফলনেও তাঁর কবিতা বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। তিনি দীর্ঘ ছয় দশক তার সাবলীল ধারায় লিখনিতে সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যকে।
তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৬০ সালে। ৬৬টি কাব্যগ্রন্থ, ৪টি উপন্যাস, একটি প্রবন্ধগ্রন্থ, একটি ছড়ার বই ও ৬টি অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক, জীবনানন্দ পুরস্কার, আবুল মনসুর আহমেদ স্মৃতি পুরস্কার, সাংবাদিকতার জন্য মিৎসুবিশি পুরস্কার, স্বাধীনতা পদক ও আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কবিকে সম্মানসূচক ডিলিট উপাধি দেওয়া হয়।
/এমএএইচ/
