আগাম জাতের আমন ধানের অধিক ফলনে উচ্ছ্বসিত রংপুরের কৃষকরা
অনুকূল আবহাওয়া, কঠোর পরিশ্রম আর সঠিক পরিচর্যায় জেলার ৮ উপজেলায় এবার আগাম জাতের আমন ধানের অধিক ফলনে উচ্ছ্বসিত কৃষকরা। এর মধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা পাকা ধান কাটতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। রংপুর সদর উপজেলার হরিদেবপুর এলাকায় সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা গেছে।
কৃষকরা জানান, কম সময়ে ধান ঘরে তোলা, রোগবালাই কম হওয়া ও ভালো ফলনে লাভের মুখ দেখছেন তারা। ধান কাটার পর একই জমিতে রবিশস্য আবাদ করে বাড়তি আয়ের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন কৃষকরা।
জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রংপুরে এবার ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে আগাম আমন ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে রংপুর সদর উপজেলায় ২০৫ হেক্টর, কাউনিয়া উপজেলায় ২২৫ হেক্টর, মিঠাপুকুর উপজেলায় ২ হেক্টর এবং মেট্রোপলিটন এলাকার ৩ হেক্টর জমিসহ মোট ৪৩৫ হেক্টর জমির জাতের আমন ধান কাটা হয়েছে।
রংপুর সদর উপজেলার হরিদেবপুর গ্রামের কৃষক রহমত আলী বলেন, "আগাম ধান কাটছি। এই ধান কাটার পরেই জমিটাতে আলু লাগাবো। আলুর পরে ভুট্টা লাগাবো। আমার এখানে দোন প্রতি (বিঘা) ১২ থেকে ১৫ মণ ফলন হয়েছে। প্রতি মণ ধান ৬২০ টাকা করে বিক্রি করতেছি। মোটামুটি ভালো দাম পাচ্ছি। এই ধান ঘরে তুলে বউ-বাচ্চাসহ সংসার চালাবো। এসব ভাবনায় খুব আনন্দ পাচ্ছি।"
আরেক কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, "সার বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয়। শ্রমিককে ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকা করে দিতে হয়। তাই ধানের দাম আরেকটু বেশি হলে ভালো হতো। আমরা কৃষকরা ভালোভাবে জীবন চালাতে পারতাম।"
রংপুরের মহিপুর তিস্তার চর এলাকার কৃষক শফিয়ার রহমান বলেন, "সাধারণ উঁচু জমিতে আগাম জাতের আমন চাষ করা হয়। এসব জমিতে কখনই পানি জমে থাকে না।" তিনি ৫ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। ৩ বিঘা জমি থেকে ধান পেয়েছেন ৪৭ মণ। অবশিষ্ট ২ বিঘা জমির ধান সপ্তাহখানেক পরে কাটা হবে।
তিনি জানান, আগাম জাতের আমন ধানের ফলন বিঘা প্রতি ২-৩ মণ কম হয়। প্রতি বিঘা জমিতে ধানের উৎপাদন হয় ১৬ থেকে ১৮ মণ। এই বছর প্রতি বিঘা জমিতে ধানের উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৪ হাজার টাকা, কিন্তু গেলো বছর খরচ হয়েছিলো ১২ হাজার টাকা।
শফিয়ার রহমান আরও বলেন, "আগাম জাতের আমন ধান কাটার পর আমি জমিতে আগাম জাতের শীতকালীন সবজি ফুলকপি, গাজর, বেগুন ও ধনিয়াপাতা চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছি। শীতকালীন সবজি তোলার পর পরই ক্ষেতে বোরো ধানের চাষ করবো।"
লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট গ্রামের কৃষক আদিলুর রহমান জানান, আগাম জাতের আমন ধানের ফলন কিছুটা কম হলেও ধান কাটার পর তারা জমিতে আগাম জাতের শীতকালীন শাক-সবজি চাষ করতে পারেন। এতে তারা লাভবান হন। তিনি ৬ বিঘা জমিতে আগাম আমন ধানের চাষ করেছেন।
আদিলুর রহমান ৬ বিঘা জমিতে আগাম ধান চাষ করতে খরচ করেছেন ৮৭ হাজার টাকা। তবে গেলো বছর একই জমিতে খরচ করেছিলেন ৭১ হাজার টাকা। তিনি বলেন, "আমাদের এলাকায় অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ পযর্ন্ত আগাম জাতের আমন ধান কাটা চলে। এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় হতাশায় আছি।"
কালীগঞ্জের কাকিনা চর রুদ্রেশ্বর এলাকার কৃষক হোসেন আলী জানান, তাদের এলাকায় চলতি সপ্তাহ থেকে আগাম জাতের আমন কাটা শুরু হয়েছে। অনেক কৃষকই ধান কাটা পর জমিতে আগাম জাতের শীতকালীন ফসল চাষ করেছেন। এই বছর আগাম জাতের আমন ধানে তেমন রোগবালাই দেখা দেয়নি। ফলন পেয়েছি আশানুরূপ। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমন ধান চাষে লাভের অঙ্ক কমেছে।
হাতীবান্ধার চর গড্ডিমার এলাকার কৃষক রওশন আলম বলেন, "এই বছর আমাদের এলাকায় বন্যা না হওয়ায় আগাম জাতের আমনের তেমন ক্ষতি কোনো হয়নি। আমরা সাধারণত আগাম জাতের ধান লাগাই, যাতে ধান কাটার পর শীতকালীন ফসল আগাম চাষ করতে পারি। আমার ৪ বিঘা জমির ধান পেকে গেছে। দুই-তিন দিনের মধ্যে কাটা শুরু করবো।"
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলা কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে আম ধানের চাষ হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ লাখ ১ হাজার ৩৯১ টন চাল। আগাম জাতের আমন ধান চাষ হয়েছে ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আবু বকর সাইফুল ইসলাম বলেন, "উঁচু জমিতে লাগানো আগাম জাতের আমন ধান ইতোমধ্যে কাটা শুরু হয়েছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি পযর্ন্ত আগাম জাতের আমন কাটা চলে। তবে নভেম্বরের শুরুতেই শুরু হবে মৌসুমের আমন ধান কাটা। এই বছর বন্যার প্রভাব কম থাকায় আগাম জাতের আমনের উৎপাদন আশানুরূপ হয়েছে।’
তিনি বলেন, "কৃষকরা আগাম জাতের আমন ধান কাটার পর তারা ভুট্টা, আগাম জাতের আলু ও শাকসবজিসহ নানা ধরনের শীতকালীন ফসল চাষ করেন।"
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের অতিরিক্ত উপ পরিচালক মাহমুদা খাতুন বলেন, রংপুর জেলায় এই বছর এক লাখ ৬৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩৫ হেক্টর জমির আগাম জাতের আমন ধান কাটা হয়েছে। হেক্টর প্রতি আগাম জাতের আমন ধানের ফলন হয়েছে ৩.১৫ টন।
//কেআর//
