উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণের আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর
আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ব্যবধান কমাতে সরকার, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ঋণের বোঝা কমাতে এই সহায়তা অনুদানভিত্তিক হতে হবে। আসন্ন জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১ সামনে রেখে এই আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, এমপি। শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জনবান্ধব জলবায়ু নীতি: কপ-৩১ এ বাংলাদেশের অবস্থান’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান। বাংলাদেশে জলবায়ু বিষয়ে কাজ করা ৩৩টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে আয়োজিত এই সংলাপে বাংলাদেশের জলবায়ুবিষয়ক অবস্থানপত্রের মূল দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়। প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির এক দশক পর অঙ্গীকারের পাশাপাশি বাস্তবায়নের অগ্রগতিও নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় অর্থায়ন প্রয়োজন। অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রমে সমান গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আলোচনায় স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। এই লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জলবায়ু নিয়ে কাজ করা তরুণদেরও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ তিনি। কপ-৩১-এ বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরার উদ্যোগের কথাও জানান শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, বিশেষ ‘জুট প্যাভিলিয়নের’ মাধ্যমে এসব পণ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে পাটের বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশীয় কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মির্জা শওকত আলী। তিনি বলেন, শিল্প খাতে নির্গমন কমানোর উদ্যোগ চলছে। আন্তর্জাতিক আলোচনায় বাংলাদেশের দাবি কার্যকরভাবে তুলে ধরতে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। এই সংলাপের সমাপনী বক্তব্যে সঞ্চালক অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করতে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী। তাই আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে ঋণের বোঝা নয়, বরং অনুদানের ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তা (Grant-based Finance) আদায়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যেতে হবে। স্বাগত বক্তব্যে ন্যাচার কনজার্ভেশন ম্যানেজমেন্টের (ন্যাকম)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. এস. এম. মঞ্জুরুল হান্নান খান সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্যারিস চুক্তির ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও কতোটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে, তা পর্যালোচনার সময় এসেছে। বাংলাদেশ নিজস্ব এনডিসি বাস্তবায়নে চেষ্টা চালাচ্ছে, তবে ক্লাইমেট ফাইন্যান্স, নীল অর্থনীতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সিটির হিট স্ট্রেস মোকাবিলায় পরিষ্কার ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। সংলাপে ৬টি বিশেষ খাতের ওপর তথ্য ও উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়। উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের হালনাগাদ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান বা এনডিসি ৩.০ অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ২০.৩১ শতাংশ বা ৮৪.৯৭ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। ২০২৬–২০৩৫ মেয়াদে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন ১১৬.১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার ৯০.২৩ বিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তা থেকে আসতে হবে। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় ২০২৩–২০৫০ মেয়াদে ১১৩টি উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন চিহ্নিত করা হয়েছে। সিত্রিইআর -এর রৌফা খানম বৈশ্বিক নির্গমন ও বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি তুলে ধরেন। সিএপিএস -এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ ও শিল্প খাতে নির্গমন কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ-এর মেহজাবিন মাহফুজ ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর এবং আবরার জিশান ও হেলেনা সামুদ্রিক সম্পদ ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের বিষয়ে আলোচনা করেন। তরুণদের পক্ষ থেকে চৌধুরী আবরার জাহিন, সোহাইল বিন সাইফুল্লাহ ও হেলেনা খাতুন জলবায়ু অর্থায়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন। আলোচনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে অর্থায়ন পৌঁছানো, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন এবং নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১. ঋণ নয়, অনুদান: এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নসহ আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন ঋণমুক্ত ও অনুদানভিত্তিক করতে হবে। ২. সম্মিলিত কণ্ঠস্বর: আন্তর্জাতিক আলোচনায় সরকার, নাগরিক সমাজ, তরুণ ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। ৩. সবুজ উদ্ভাবন: কপ-৩১-এ পাটের মতো পরিবেশবান্ধব দেশীয় পণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরতে হবে। ৪. শিল্প ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ: শিল্প খাতে নির্গমন কমানো এবং শ্রমিকদের সুরক্ষাসহ ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করতে হবে। ৫. তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ: জলবায়ুবিষয়ক নীতিনির্ধারণ ও জাতীয় প্রতিনিধিদলে নারী, তরুণ ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ৬. নগরাঞ্চলের জলবায়ু সংকট: জলবায়ু অভিবাসীদের নিরাপদ আবাসন, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। /এমএএইচ/