এআই অবকাঠামোয় লাখো কোটি ডলারের বিনিয়োগ, ধাক্কা এলে সামলাবে কে?
এআই ঘিরে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের যে জোয়ার চলছে, তা বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন গতি দিচ্ছে। ডাটাসেন্টার নির্মাণ, উন্নত চিপ কেনা ও কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়াতে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। এই বিনিয়োগ থেকে আয় কতো দ্রুত আসবে, তা নিয়ে প্রশ্নও বাড়ছে। এআই-এর সম্ভাবনা যেমন বড়, তেমনই প্রত্যাশিত আয় না এলে বিনিয়োগের আর্থিক যৌক্তিকতা নিয়ে বড় সংশয়ও রয়েছে।
অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল মূলধনী ব্যয়, ঋণনির্ভর অর্থায়ন এবং ভবিষ্যৎ আয়ের অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে আর্থিক ঝুঁকি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবরের বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, এআই খাতে বিনিয়োগ ও মুনাফার প্রত্যাশা দুর্বল হলে সংশ্লিষ্ট সম্পদের দাম কমে যেতে পারে। ঋণনির্ভরতা, অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর সিংহভাগ বিনিয়োগ এবং জটিল অর্থায়নব্যবস্থা সেই ধাক্কাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিপুল বিনিয়োগ, নগদ অর্থপ্রবাহে চাপ
এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগের ব্যাপকতা বোঝা যায় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যয়ের হিসাব ও পুর্বাভাস থেকে। ২০২৬ সালে অ্যামাজন, অ্যালফাবেট, মাইক্রোসফট ও মেটা'র সম্মিলিত মূলধনী ব্যয় ৭০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এই অর্থের বড় অংশ এআই চিপ, ডাটাসেন্টার ও ক্লাউড অবকাঠামো সম্প্রসারণে যাচ্ছে।
এক বছরের ব্যয়ের হিসাবের বাইরেও এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপ্তি বিশাল। কলাম্বিয়া বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক স্টেইন ভ্যান নিউয়েনবার্গের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে এআই ডাটাসেন্টার, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও বিশেষায়িত চিপ নির্মাণে মোট বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ১০ দশমিক ৩ লাখ কোটি ডলার। এই বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক জিডিপি'র গড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৬৩ শতাংশের সমান। গবেষকের হিসাব অনুযায়ী, বিনিয়োগের প্রত্যাশিত মুনাফা নিশ্চিত করতে ২০৩২ সালের মধ্যে এআই শিল্পের বার্ষিক আয় প্রায় ৩ দশমিক ৫৫ থেকে ৩ দশমিক ৭ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছাতে হবে।
এতো বড় ব্যয়ের প্রভাব পড়ছে কোম্পানিগুলোর নগদ অর্থপ্রবাহে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিনিয়োগের চাপে ৪ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত নগদ অর্থপ্রবাহ এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, ব্যবসা থেকে আয় হলেও অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রযুক্তি কেনার পেছনে ব্যয় এতো বেশি যে- অন্যান্য কাজে ব্যবহার করার মতো নগদ অর্থ কমে আসছে। কিছু প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের অর্থ জোগাতে ঋণ ও বিকল্প অর্থায়নের ওপর বেশি নির্ভর করছে।
ঋণ বাড়লে ঝুঁকিও বাড়ে
এআই অবকাঠামোর জন্য অর্থ জোগাড়ের ধরনও বদলাচ্ছে। প্রথম দিকে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিজেদের নগদ অর্থ ব্যবহার করে অনেক প্রকল্পের ব্যয় মেটাতো। এখন ডাটাসেন্টার নির্মাণে ব্যাংক, বেসরকারি ঋণদাতা, রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষ উদ্দেশ্যে গঠিত বিনিয়োগ কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ছে। লিজ, প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন ও বিভিন্ন ধরনের ঋণ কাঠামোর মাধ্যমে বিনিয়োগের পরিধি বাড়ানো হচ্ছে।
ভ্যান নিউয়েনবার্গের গবেষণায় বলা হয়েছে, অর্থায়নের এই জটিল কাঠামো ঝুঁকি দূর না করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা যদি অল্প কয়েকটি বড় গ্রাহকের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাদের চাহিদা কমে গেলে প্রকল্পটির আয় দ্রুত কমে যেতে পারে। আবার প্রযুক্তি দ্রুত বদলে যাওয়ায় কয়েক বছর আগে নির্মিত অবকাঠামো প্রত্যাশার তুলনায় কম কার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে প্রকল্পের আয় দিয়ে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করা কঠিন হতে পারে। ঋণদাতারা নতুন অর্থায়নে সতর্ক হলে নতুন ডাটাসেন্টার নির্মাণ ও সম্প্রসারণের কাজও ধীর হয়ে যেতে পারে।
ফেডপ্রধানের চোখেও অনিশ্চয়তা
এআই বিনিয়োগের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে সতর্কতার কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শও। ১৬ অক্টোবর ব্যাংককে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এআই'কে তাঁর জীবদ্দশায় যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, দীর্ঘ মেয়াদে প্রযুক্তিটি উৎপাদনশীলতা ও সম্পদ বাড়াতে পারে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পথ হবে "অনিশ্চিত" ও "অস্থির"।
ওয়ার্শও'র বক্তব্যের ব্যাখ্যা হলো- এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল ব্যয় এখনই চিপ, কম্পিউটার সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ ও নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা বাড়াচ্ছে। এতে উৎপাদনশীলতার সুফল পুরোপুরি আসার আগেই মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, ভবিষ্যতে এআই উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারলে পণ্য ও সেবা তৈরির ব্যয় কমতে পারে। ফলে প্রযুক্তিটির দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা ইতিবাচক হলেও স্বল্প মেয়াদে অর্থনীতি ও আর্থিক বাজারে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বুদ্বুদ ফাটলে কী হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত আয় ও মুনাফা না এলে প্রথম ধাক্কা লাগতে পারে শেয়ারবাজারে। ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির আশায় যেসব কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে, বিনিয়োগকারীরা তাদের মূল্যায়ন নতুন করে বিবেচনা করতে পারেন। এতে শেয়ারের দর কমার পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতে নতুন বিনিয়োগের প্রবাহও সংকুচিত হতে পারে।
আশঙ্কার কথা হলো, এর প্রভাব শুধু শেয়ারবাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ডাটাসেন্টার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান, চিপ সরবরাহকারী, বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণব্যবস্থার সরবরাহকারী এবং প্রকল্পে অর্থ জোগানো ঋণদাতারা একই বিনিয়োগচক্রের সঙ্গে যুক্ত। বড় প্রকল্প বাতিল বা স্থগিত হলে এসব প্রতিষ্ঠানের আয় ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। ঋণনির্ভর প্রকল্পে আয় কমে গেলে ক্ষতি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ে।
আইএমএফ-এর অক্টোবরের প্রতিবেদনে এআই-সংশ্লিষ্ট সম্পদের মূল্য সংশোধনের ঝুঁকির পাশাপাশি ঋণের পরিমাণ, বিনিয়োগের ঘনত্ব ও অর্থায়নের পারস্পরিক সংযোগের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, এআই খাতের বিনিয়োগ ও মুনাফা প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল হলে বাজারে বড় ধরনের দরপতন ঘটতে পারে, আর্থিক ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকায় সেই ধাক্কা আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ধাক্কা এলে সামলাবে কে?
এআই খাতে বিনিয়োগের এই জোয়ার শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিকে কতোটা সমৃদ্ধ করবে, তা নির্ভর করছে বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে কতোটা আয় ও উৎপাদনশীলতা তৈরি হয়, তার ওপর। প্রত্যাশা পূরণ হলে এই বিনিয়োগ প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে বিপুল সম্ভাবনা যুক্ত করবে।
এআই বিপ্লব আর কেবল প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দৌড়ে সীমাবদ্ধ নয়, বিপুল বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ারও একটি পরীক্ষা এটি। এআই-এর সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে আজ, কিন্তু সেই বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল আসবে ভবিষ্যতে। মাঝের এই সময়ে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বড় হয়ে উঠলে তার চাপ কেবল হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ঋণ, বিনিয়োগ ও আর্থিক বাজারের পারস্পরিক সংযোগের কারণে তা ছড়িয়ে পড়বে আরও বিস্তৃত পরিসরে। প্রভাব পড়বে বিনিয়োগকারী, ঋণদাতা এবং বৃহত্তর অর্থনীতির ওপর।
