চারঘাট থেকে স্ট্যানফোর্ড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন সম্ভাবনা খুঁজছেন তৌহিদুল ইসলাম
রাজশাহীর চারঘাটে বেড়ে ওঠা এক তরুণের স্বপ্ন ছিলো প্রকৌশলী হওয়ার। সেই স্বপ্ন পূরণে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পড়াশোনা, এরপর যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা। দীর্ঘ এই পথ পেরিয়ে এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদে রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তাঁর নাম মো. তৌহিদুল ইসলাম।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার মান উন্নয়নের গবেষণায় কাজ করছেন তিনি। তাঁর গবেষণার লক্ষ্য, চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বিশ্লেষণকে আরও নির্ভরযোগ্য করে রোগীভেদে কার্যকর চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করা।
বুয়েট থেকে গবেষণার পথে
তৌহিদুলের বেড়ে ওঠা রাজশাহীর চারঘাটে। ছোটবেলা থেকেই প্রকৌশলী হওয়ার আগ্রহ ছিলো তাঁর। অন্যদিকে, বাবা চাইতেন ছেলে চিকিৎসক হোক। নিজের পছন্দের পথেই এগিয়ে যান তৌহিদুল।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার পর ২০০৫ সালে বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন তিনি। সেখানে পড়াশোনার সময় শিক্ষক মোহাম্মদ কামরুল হাসান ও সেলিয়া শাহনাজের অনুপ্রেরণায় গবেষণার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।
বুয়েটে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন তিনি। ২০১৪ সালে টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ে তড়িৎ প্রকৌশলে পিএইচডি শুরু করেন। ২০১৮ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন তৌহিদুল। এর আগে ২০১৪ সালেই বুয়েট থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন তিনি।
প্রকৌশল ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মেলবন্ধন
তৌহিদুলের গবেষণার বিশেষ দিক হলো, প্রকৌশল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল সমস্যার সমাধান খোঁজা। তাঁর গবেষণায় চিকিৎসা-সংক্রান্ত ছবি, জিনগত তথ্য এবং অন্যান্য জৈবিক উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে রোগ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের প্রকাশিত প্রোফাইল অনুযায়ী, তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র ক্যানসার শনাক্তকরণ, নির্ভুল চিকিৎসা এবং ফলাফল সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। পাশাপাশি স্নায়ু রোগ নিয়ে গবেষণাতেও তাঁর আগ্রহ রয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একই রোগের ক্ষেত্রেও রোগীভেদে উপসর্গ, জৈবিক বৈশিষ্ট্য ও চিকিৎসায় সাড়া দেওয়ার ধরন ভিন্ন হতে পারে। এসব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে পারলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনায় সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তৌহিদুলের গবেষণা এই সম্ভাবনাকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।
গবেষণায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
তৌহিদুলের গবেষণাকাজ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছে। স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের প্রোফাইলে তাঁর একাধিক সম্মাননা ও পুরস্কারের উল্লেখ রয়েছে।
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ) থেকে তিনি ‘কে৯৯/আর০০ পাথওয়ে টু ইন্ডিপেনডেন্স অ্যাওয়ার্ড’ পান। এই পুরস্কার গবেষকদের স্বাধীন গবেষণা কার্যক্রম প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে স্ট্যানফোর্ডের রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগ থেকে রেডিয়েশন সায়েন্সে অবদানের জন্য ‘আমাতো জিয়াচ্চিয়া অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সিলেন্স ইন দ্য রেডিয়েশন সায়েন্সেস’ অর্জন করেন তিনি।
স্ট্যানফোর্ডের প্রোফাইলে তাঁর গবেষণাপত্রের তালিকাও প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে জার্নাল নিবন্ধ ও সম্মেলনভিত্তিক গবেষণাপত্রসহ বিভিন্ন প্রকাশনার তথ্য রয়েছে।
স্ট্যানফোর্ডে শিক্ষকতার সুযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়া তৌহিদুলের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিলো। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, স্ট্যানফোর্ডে শিক্ষকতার সুযোগ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিলো দীর্ঘ ও কঠিন। একাধিক ধাপের সাক্ষাৎকার ও উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষকতার প্রস্তাব পাওয়ার পর স্ট্যানফোর্ডকে বেছে নেন তিনি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর নতুন পদে যোগ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিলো।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে টেনিউর-ট্র্যাক পদে যোগ দেওয়া প্রথম বাংলাদেশি তিনি। টেনিউর-ট্র্যাক হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘমেয়াদি অধ্যাপনা ও স্থায়ী একাডেমিক পদ অর্জনের সম্ভাবনাযুক্ত একটি নিয়োগব্যবস্থা।
বর্তমানে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের গবেষণাগার ‘ইসলাম ল্যাব’ পরিচালনা করছেন তিনি। তাঁর কাজের লক্ষ্য, গবেষণাগারে তৈরি পদ্ধতিগুলোকে এমনভাবে উন্নত করা, যাতে সেগুলো বিভিন্ন রোগী ও চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্যের ক্ষেত্রেও নির্ভরযোগ্যভাবে ব্যবহার করা যায়।
চারঘাটের যে তরুণ একসময় প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, আজ তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন, গবেষণা করছেন ক্যানসারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসা নিয়ে। তাঁর এই অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পড়াশোনা, গবেষণা আর কঠোর পরিশ্রম। তৌহিদুল ইসলামের গল্প মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের মাটি থেকে উঠে এসেও বিশ্বের বড় গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে নিজের জায়গা করে নেওয়া সম্ভব। এখন তাঁর কাজের দিকে তাকিয়ে আছেন সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা, আর তাঁর গবেষণা কতটা কাজে আসে চিকিৎসাক্ষেত্রে, সেটিই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তথ্যসূত্র: স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের শিক্ষক-প্রোফাইল, প্রথম আলো, ইউএনবি এবং ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত প্রতিবেদন
//আইই//
