ইন্টেল থেকে টেসলা, বিশ্ব প্রযুক্তিশিল্পে বাংলাদেশি সারোয়ার মোর্শেদ
বিশ্বের প্রযুক্তিশিল্পে প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। উন্নত প্রযুক্তির গাড়ি তৈরি থেকে শুরু করে কম্পিউটার চিপ উৎপাদন- প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজন দক্ষ প্রকৌশলী, গবেষক ও পরিকল্পনাবিদ। এই প্রতিযোগিতামূলক জগতে নিজের দক্ষতা দিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক শিক্ষার্থী সারোয়ার মোর্শেদ। যুক্তরাষ্ট্রের চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইন্টেলে কাজ করার পর এবার তিনি যুক্ত হয়েছেন বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলায়।
সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদন ও তাঁর পেশাগত প্রোফাইল অনুযায়ী, সারোয়ার বর্তমানে টেসলার সিনিয়র টেকনিক্যাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। প্রতিষ্ঠানটির রোবোট্যাক্সি ও সেমি ট্রাক প্রকল্পে উৎপাদন পরিকল্পনা, সরবরাহব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত কার্যক্রমের সমন্বয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা জানা গেছে। তাঁর এই পেশাগত যাত্রা বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিশিল্পে কাজ করার সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
বুয়েট থেকে উচ্চশিক্ষার পথে
সারোয়ার মোর্শেদ তাঁর পরিচিত মহলে ‘রিপন’ নামেও পরিচিত। বুয়েটের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইপিই) বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। ২০১৪ সালে সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে।
২০১৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা থেকে ফলিত গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন সারোয়ার। পরে বোস্টনের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে শিল্প প্রকৌশলে গবেষণা শুরু করেন। ২০২২ সালে অপারেশনস রিসার্চ বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন তিনি।
তাঁর শিক্ষাজীবনের বিশেষ দিক হলো, প্রকৌশলের পাশাপাশি গণিত ও তথ্য বিশ্লেষণেও দক্ষতা অর্জন করেছেন তিনি। এই জ্ঞান পরবর্তী সময়ে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জটিল উৎপাদন ও পরিকল্পনাসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে কাজে এসেছে।
গবেষণায় জটিল সমস্যার সমাধান
সারোয়ারের গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্র অপারেশনস রিসার্চ ও গাণিতিক অপ্টিমাইজেশন। সহজভাবে বললে, সীমিত সময়, অর্থ, যন্ত্রপাতি ও জনবল ব্যবহার করে কীভাবে সবচেয়ে কার্যকর ফল পাওয়া যায়, তা নির্ধারণে এসব পদ্ধতি সাহায্য করে।
ধরা যাক, একটি কারখানায় একসঙ্গে অনেক ধরনের পণ্য তৈরি করতে হবে। কিন্তু যন্ত্রপাতির সক্ষমতা সীমিত, কাঁচামাল সরবরাহের সময় নির্দিষ্ট এবং উৎপাদনের খরচও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কোন পণ্য কখন তৈরি হবে, কোন যন্ত্র কীভাবে ব্যবহার করা হবে এবং কোথায় উৎপাদন আটকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গাণিতিক মডেল ব্যবহার করা যায়।
এই ধরনের সমস্যা সমাধানে কাজ করেছেন সারোয়ার। তাঁর গবেষণায় বড় আকারের গাণিতিক সমস্যার সমাধানে অ্যালগরিদম তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি গুরুত্ব পেয়েছে।
তাঁর ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে গবেষণার সময় তিনি বড় আকারের অপ্টিমাইজেশন সমস্যা সমাধানের অ্যালগরিদম এবং তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণপদ্ধতি নিয়ে কাজ করেন। তাঁর গবেষণাপত্রের তালিকায় গাণিতিক অপ্টিমাইজেশন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একাধিক কাজের উল্লেখ রয়েছে।
ইন্টেলে কাজের অভিজ্ঞতা
পিএইচডি সম্পন্ন করার পর ২০২২ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের চ্যান্ডলারে ইন্টেল করপোরেশনে অপারেশনস রিসার্চ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন সারোয়ার।
বিশ্বের অন্যতম বড় সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইন্টেলে তাঁর কাজের মূল ক্ষেত্র ছিলো উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার জটিল সমস্যা সমাধান। তাঁর প্রকাশিত পেশাগত বিবরণ অনুযায়ী, তিনি উৎপাদনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অ্যালগরিদম, অপ্টিমাইজেশন মডেল, সিমুলেশন এবং দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার পূর্বাভাস তৈরির পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেছেন।
কম্পিউটার, স্মার্টফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সেমিকন্ডাক্টর চিপ। এসব চিপ তৈরিতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, নির্ভুল উৎপাদন পরিকল্পনা এবং বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। উৎপাদনের একটি ধাপে সমস্যা দেখা দিলে পুরো প্রক্রিয়ায় প্রভাব পড়তে পারে। তাই কারখানার সক্ষমতা, যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও সরবরাহকারীদের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইন্টেলে সারোয়ারের কাজ ছিলো এই ধরনের জটিল সমস্যায় তথ্য ও গাণিতিক বিশ্লেষণের সাহায্যে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা।
সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ইন্টেলে ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের সরবরাহকারী ও মূলধনি পরিকল্পনাসংশ্লিষ্ট উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন।
ইন্টেল থেকে টেসলায় নতুন অধ্যায়
ইন্টেলে কাজের অভিজ্ঞতার পর সারোয়ার মোর্শেদের কর্মজীবনে এসেছে নতুন অধ্যায়। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও তাঁর লিংকডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, তিনি এখন টেসলার সিনিয়র টেকনিক্যাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার।
টেসলা বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির পাশাপাশি স্বয়ংচালিত গাড়ি ও নতুন পরিবহনপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির রোবোট্যাক্সি প্রকল্পের লক্ষ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে সক্ষম গাড়ির মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন পরিষেবা দেওয়া। অন্যদিকে, টেসলা সেমি হলো ভারী পণ্য পরিবহনের জন্য তৈরি বৈদ্যুতিক ট্রাক।
কর্মজীবনের শুরু বাংলাদেশে
সারোয়ারের পেশাগত যাত্রা শুরু হয়েছিলো বাংলাদেশেই। বুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করার পর ২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, বিজিএমইএ ও বুয়েটের যৌথ প্রকল্পে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন তিনি। সেখানে বাংলাদেশের পোশাক কারখানার অগ্নিনিরাপত্তা মূল্যায়নসংক্রান্ত কাজে যুক্ত ছিলেন।
এর আগে ২০১৩ সালে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে ইন্টার্নশিপের সময় উৎপাদনপ্রক্রিয়ার জন্য সময়সূচি নির্ধারণের অ্যালগরিদম তৈরির কাজেও অংশ নেন তিনি।
এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। উৎপাদনব্যবস্থা, পরিকল্পনা ও বিশ্লেষণের মতো বিষয় নিয়ে কাজ করার ধারাবাহিকতা তাঁর ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা যায়।
বিশ্ব প্রযুক্তিশিল্পে বাংলাদেশি প্রকৌশলীর পথচলা
বুয়েটে প্রকৌশল শিক্ষা, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চতর গবেষণা, ইন্টেলে কাজ এবং এরপর টেসলায় নতুন দায়িত্ব- সারোয়ার মোর্শেদের কর্মজীবনের এই ধারাবাহিকতা আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিশিল্পে বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের অংশগ্রহণের একটি দৃষ্টান্ত।
প্রযুক্তির বিশ্বে বড় পরিবর্তন অনেক সময় দৃশ্যমান উদ্ভাবনের আড়ালে থাকা অসংখ্য পরিকল্পনা, বিশ্লেষণ ও সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করে। সেই কাজের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা নিজেদের দক্ষতা দিয়ে জায়গা করে নিতে পারেন। সারোয়ার মোর্শেদের পেশাগত যাত্রা সেই সম্ভাবনার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
//আইই//
