আমলাতান্ত্রিক আচরণ পরিবর্তনে ১৫ করণীয়, বর্জন করতে হবে ১২টি বিষয়
সরকারি সেবায় ভোগান্তি কমানো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা এবং নাগরিকবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে ‘সেবা সহজীকরণ নির্দেশিকা ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১৫টি করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেবাগ্রহীতার অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করে সুবিধাজনক সেবা নির্বাচন, একই কাগজপত্র বারবার চাওয়া এবং দালালচক্রের সুযোগ বহাল রাখার মতো ১২টি বিষয় বর্জন করতে বলা হয়েছে।
নির্দেশিকায় সরকারি অফিসে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক ভাষা ব্যবহার, ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনা, অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি এবং সেবার মানোন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খসড়াটি চূড়ান্ত করার আগে অংশীজনদের মতামত নিতে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সংশ্লিষ্টদের মতামত ও পরামর্শ পাওয়ার পর যৌক্তিক প্রস্তাবগুলো অন্তর্ভুক্ত করে নির্দেশিকাটি চূড়ান্ত করা হবে বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিনিয়োগে গতি আনতে ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিগত বাধা দূর করার ওপর জোর দিয়েছে। আমলাতন্ত্রকে শুধু দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়, বরং মেধার ভিত্তিতে সাজানোর লক্ষ্য নিয়েও কাজ করছে সরকার। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে জনসেবা সহজলভ্য ও দুর্নীতিমুক্ত করতে নেওয়া বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের অংশ হিসেবে নতুন নির্দেশিকার খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
সেবা সহজীকরণের ধারণার চর্চা বিশ্বব্যাপী দীর্ঘদিনের। গ্রাহক সন্তুষ্টি অর্জন, প্রক্রিয়াগত ব্যয় কমানো এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার উদ্দেশ্যে ১৯৯০-এর দশকে ‘বিজনেস প্রসেস পুনঃপ্রকৌশল’ কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ধারণাটি সরকারি খাতেও যুক্ত হয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধারণার চর্চা ও বাস্তবায়ন হচ্ছে। বাংলাদেশে ধারণাটি বিবর্তিত হয়ে ‘সেবাপদ্ধতি সহজীকরণ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
সেবাগ্রহীতার সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণে গুরুত্ব
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের খসড়া নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, জনসেবা নিশ্চিত করা সরকারি অফিসের অন্যতম প্রধান কাজ। মানসম্পন্ন জনসেবা দেওয়ার মাধ্যমে সেবাগ্রহীতার সন্তুষ্টি অর্জন এবং নাগরিকবান্ধব ভাবমূর্তি গড়ে তোলাই সরকারের অন্যতম উদ্দেশ্য। স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আচরণে কঠোরতা পরিহার করে পরিবর্তন আনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
নির্দেশিকায় সেবা সহজীকরণের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে সেবাগ্রহীতার প্রতি সমানুভূতিশীল আচরণের কথা বলা হয়েছে। নাগরিকের ভোগান্তি অনুধাবন করে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়াই সমানুভূতি। সেবাদাতা সেবাগ্রহীতার কষ্ট লাঘবে মনোযোগী হলে আচরণগত উৎকর্ষ, অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণ, সেবার মানোন্নয়ন এবং নাগরিক সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি সেবা পেতে প্রয়োজনীয় সময়, ব্যয়, যাতায়াত ও কাগজপত্র কমানোর উদ্যোগও কার্যকর হয়।
খসড়া নির্দেশিকায় আচরণ, সেবার মান, সময়, খরচ, অন্তর্ভুক্তি, দাখিলযোগ্য কাগজপত্র, যাতায়াত এবং গ্রাহক সন্তুষ্টিকে সেবাপদ্ধতি সহজীকরণের প্রধান নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে আসা নাগরিকদের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই রূঢ়, অবমাননাকর, অসৌজন্যমূলক বা বিরক্তিপূর্ণ ভাষায় কথা বলা যাবে না। সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় সালাম বা সম্ভাষণ জানানো এবং ‘অনুগ্রহ করে’, ‘ধন্যবাদ’, ‘দয়া করে’ ও ‘আপনাকে কীভাবে সহায়তা করতে পারি’- এই ধরনের সৌজন্যমূলক ভাষা ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যহীন, ন্যায়সংগত, মানবিক ও সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
সেবা সহজীকরণের তিন মূলনীতি
খসড়া নির্দেশিকায় সেবা সহজীকরণের তিনটি মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমটি হলো মৌলিক পুনঃচিন্তন। এর আওতায় শুধু একটি সেবা নয়, সংশ্লিষ্ট অফিসের সামগ্রিক কার্যক্রম, প্রচলিত আইন ও বিধি, সেবার ধরন ও তালিকা, সেবাগ্রহীতা, সেবা প্রক্রিয়া, বিদ্যমান পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা, নাগরিকের চাহিদা এবং সেবার মানোন্নয়নের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করতে হবে।
দ্বিতীয় মূলনীতি আমূল পরিবর্তন। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বিদ্যমান পদ্ধতিতে অনেক ক্ষেত্রে কম খরচে, দ্রুত ও কার্যকরভাবে সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। নাগরিকের অভিজ্ঞতা, মতামত ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচলিত পদ্ধতির আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারও বিদ্যমান কার্যপদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারে।
তৃতীয় মূলনীতি অভূতপূর্ব উন্নয়ন। সেবা প্রদানের সময়, খরচ, অফিসে যাতায়াতের সংখ্যা, প্রক্রিয়ার ধাপ এবং সেবা-সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র কমিয়ে নাগরিক সন্তুষ্টি অর্জন করাই এ নীতির অন্যতম লক্ষ্য।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১৫টি করণীয়
‘সেবা সহজীকরণ নির্দেশিকা ২০২৬’-এর খসড়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১৫টি করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দপ্তর বা সংস্থার সামগ্রিক অফিস ব্যবস্থাপনাকে সহজ, আধুনিক, স্বচ্ছ ও যুগোপযোগী করা এবং নথি ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া বৈষম্যহীন ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা, অফিসের সামগ্রিক সেবা-পরিবেশ উন্নত করা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ, গর্ভবতী নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
নির্দেশনায় পরিবেশগত টেকসইতা নিশ্চিত করা, কাগজবিহীন অফিস ব্যবস্থা চালু করা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা উন্নয়নকে উৎসাহিত করা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নাগরিকের মতামত বিশ্লেষণ, অনলাইন, সরাসরি, ডাকযোগে, ডিজিটাল সেন্টার, মোবাইল অ্যাপ কিংবা সহায়ক ডেস্কের মাধ্যমে একাধিক পদ্ধতিতে সেবা দেওয়ার সুযোগ রাখা এবং সহজীকরণের তথ্য ও প্রমাণক সংরক্ষণ করাও করণীয়ের তালিকায় রয়েছে।
পাশাপাশি জাতীয় তথ্য বাতায়নে হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ, সিটিজেন চার্টারে সহজীকৃত সেবার প্রক্রিয়া মানচিত্র যুক্ত করা এবং বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। সময়, খরচ, যাতায়াত ও সেবার গুণগত মানের ভিত্তিতে ফলাফল পরিমাপ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও সামাজিক নিরীক্ষা পরিচালনা এবং সেবা সহজীকরণকে ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়টিও নির্দেশিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বর্জন করতে হবে ১২টি বিষয়
খসড়া নির্দেশিকায় ১২টি বর্জনীয় বিষয়ও চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শুধু সেবাদাতার মতামতকে সেবাগ্রহীতার অভিজ্ঞতার বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। গ্রাহকের ভোগান্তি, জনসম্পৃক্ততা, সেবার সামাজিক গুরুত্ব এবং সময়, খরচ, যাতায়াত ও গুণগত মান বিশ্লেষণ উপেক্ষা করে সুবিধাজনক সেবা নির্বাচন করা যাবে না। সেবা সহজীকরণকে এককালীন উদ্যোগ হিসেবেও দেখা যাবে না।
সেবাগ্রহীতার সঙ্গে রূঢ়, অবমাননাকর, অসৌজন্যমূলক বা বিরক্তিপূর্ণ ভাষায় কথা বলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সালাম বা সম্ভাষণ জানানো এবং সৌজন্যমূলক ভাষা ব্যবহারে নিরুৎসাহিত না করার নির্দেশনা রয়েছে।
অপ্রয়োজনীয় কাগজ, পানি ও বিদ্যুতের অপচয় করা যাবে না। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে হবে। একই তথ্য বা কাগজপত্র একাধিকবার চাওয়া যাবে না এবং সেবা সহজীকরণের পর পুরোনো জটিল পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া যাবে না।
সিটিজেন চার্টার ও জাতীয় তথ্য বাতায়নে পুরোনো বা পরস্পরবিরোধী তথ্য রাখা যাবে না। শুধু জটিল প্রক্রিয়াকে অনলাইনে স্থানান্তর করে সেটিকে সেবা সহজীকরণ বলা যাবে না। মধ্যস্বত্বভোগী, অনানুষ্ঠানিক দালালচক্র, অস্বচ্ছ যোগাযোগ কিংবা অপ্রত্যাশিত ব্যয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়- এমন কোনো প্রক্রিয়াও বহাল রাখা যাবে না।
নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, সেবা সহজীকরণকে এককালীন কার্যক্রম হিসেবে নয়, বরং ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আইন, বিধি, প্রযুক্তি, নাগরিকের চাহিদা এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার আলোকে সহজীকৃত সেবাগুলো নিয়মিত পরিমার্জন ও হালনাগাদ করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব খোরশেদ আলম খান জানিয়েছেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আচরণে কঠোরতা পরিহার করে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চায় সরকার। এর অংশ হিসেবে সরকারি অফিসগুলোতে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি কমানো এবং নাগরিকবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে নতুন নির্দেশিকার খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পর নির্দেশিকাটি চূড়ান্ত করা হবে।
