বদলে যাচ্ছে পুরোনো বিমানবন্দরের মূল অবকাঠামো
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র তেজগাঁওয়ের পুরোনো বিমানবন্দরের মূল অবকাঠামোসহ পুরো এলাকার চিত্র বদলে যাচ্ছে। সেখানে একটি বিশেষায়িত লজিস্টিক হাব বা মানবিক সহায়তা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত ২২ জুন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এক সভায় এই-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। সরকারি এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে পুরোনো বিমানবন্দরের বিদ্যমান অবকাঠামোয় পরিবর্তন এনে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এতে বদলে যাবে বিমানবন্দরটির পুরো এলাকা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে ত্রাণসামগ্রী গ্রহণ, সংরক্ষণ, বাছাই, প্যাকেজিং ও দ্রুত বিতরণের কেন্দ্রীয় কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে এই মানবিক সহায়তা কেন্দ্র। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলোর কার্যক্রম সমন্বয়েও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তেজগাঁওয়ের মতো ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই ধরনের কেন্দ্র স্থাপনে নানা ঝুঁকিও রয়েছে। এলাকাটিতে বহুমুখী বাণিজ্যিক ও সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়ায় সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দুর্যোগ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় হাব
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে ভূমিকম্পসহ বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর ত্রাণসামগ্রী দ্রুত গ্রহণ, সংরক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এই হাব সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভরসাস্থল হিসেবে কাজ করবে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে বিদেশ থেকে আসা ত্রাণসামগ্রী দ্রুত খালাস, সংরক্ষণ ও বিতরণ করা সহজ হবে বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়।
রাজধানীসহ দেশের যেকোনো স্থানে বড় ধরনের দুর্যোগ বা দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বর্তমানে পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন কোনো কেন্দ্রীয় ওয়্যারহাউস নেই। এই কারণে দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় বড় পরিসরে একটি মানবিক সহায়তা কেন্দ্র নির্মাণের জন্য রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র তেজগাঁওয়ের পুরোনো বিমানবন্দর এলাকাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নিয়মিত এসব দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়। বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নদ-নদীর পানি বেড়ে বন্যা দেখা দেয়। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া প্রবল ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে। এতে তীব্র বাতাস ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ভূত্বকের টেকটোনিক প্লেটের অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে তা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এ ছাড়া নদীভাঙনে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ও জমি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হন। শুষ্ক মৌসুমে অনাবৃষ্টির কারণে খরা এবং উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ার সমস্যাও দিন দিন বাড়ছে। এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশেষায়িত মানবিক সহায়তা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে এত দিন তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
৩ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চেয়ে চিঠি
সম্প্রতি তেজগাঁওয়ের অব্যবহৃত পুরোনো বিমানবন্দরের পুরো জমি এ হাব নির্মাণের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে বিমানবন্দর এলাকার জমি ও অবকাঠামো বর্তমানে একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। এ কারণে সংশ্লিষ্ট তিন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছেন, অব্যবহৃত পুরোনো বিমানবন্দরের পুরো জমি এ হাব নির্মাণের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এলাকাটি বর্তমানে একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন থাকায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই লজিস্টিক হাব দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে ত্রাণসামগ্রী গ্রহণ, সংরক্ষণ, বাছাই, প্যাকেজিং ও দ্রুত বিতরণের কেন্দ্রীয় কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলোর কার্যক্রম সমন্বয়েও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
যানজট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ধরনের দুর্যোগের পর প্রথম ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ের মধ্যে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছানো গেলে প্রাণহানি ও দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি এই হাব স্থাপন করা হলে বিদেশ থেকে আসা ত্রাণসামগ্রী দ্রুত খালাস, সংরক্ষণ ও বিতরণ করা সহজ হবে। বিমান চলাচলের রানওয়ে ও ফাঁকা জায়গা থাকায় জরুরি প্রয়োজনে ছোট বিমান, হেলিকপ্টার বা অন্যান্য পরিবহনের মাধ্যমে দেশের দুর্গত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পাঠানো সম্ভব হবে। এতে যানজট ও প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে জরুরি সহায়তা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছানো যাবে।
তবে বড় পরিসরে একটি বিশেষায়িত লজিস্টিক হাব বা মানবিক সহায়তা কেন্দ্র স্থাপনের জন্য পুরোনো বিমানবন্দর এলাকায় পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুযোগ নেই। ত্রাণসামগ্রী সংরক্ষণ, ওঠানো-নামানো এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক গুদাম বা হ্যাঙ্গারের সংকট রয়েছে। রাজধানীর তীব্র যানজট এবং এলাকাটির বহুমুখী বাণিজ্যিক ও সামরিক ব্যবহারের কারণে এ সংকট আরও প্রকট হতে পারে।
এলাকাটি ঢাকার অত্যন্ত ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় জরুরি মুহূর্তে বড় ট্রাক বা কনটেইনারে ত্রাণসামগ্রী দ্রুত বাইরের জেলাগুলোতে পাঠানো কঠিন হতে পারে। এ ছাড়া তেজগাঁও এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও জমির ব্যবহার নিয়ে বিমানবাহিনী, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
জমি বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক এবং ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিলুর রহমান জানিয়েছেন, বিশেষায়িত লজিস্টিক হাব বা মানবিক সহায়তা কেন্দ্র স্থাপনের জন্য পুরোনো বিমানবন্দর এলাকাটি উপযুক্ত হলেও সেখানে নানা ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি বলেন, এলাকাটি ঢাকার অত্যন্ত ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। ফলে জরুরি মুহূর্তে বড় ট্রাক বা কনটেইনারের মাধ্যমে ত্রাণ দ্রুত বাইরের জেলাগুলোতে পাঠানো কিছুটা কঠিন হবে। এ ছাড়া এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও জমির ব্যবহার নিয়ে বিমানবাহিনী, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জেনেছেন।
অধ্যাপক আদিলুর রহমান আরও বলেন, পুরোনো বিমানবন্দরের কতটুকু জমি এ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ নেওয়া হবে, সেটি দেখার বিষয়। বরাদ্দের পরিমাণ ও পরিকল্পনা স্পষ্ট হলেই বোঝা যাবে, সেখানে প্রকৃতপক্ষে বিশেষায়িত লজিস্টিক হাব বা মানবিক সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে জমি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মাণ শুরু
পুরোনো তেজগাঁও বিমানবন্দরের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৪১ সালে। ১৯৪৩ সালে নির্মাণাধীন বিমানবন্দরে একটি হালকা যুদ্ধবিমান অবতরণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকরা আকাশপথে যুদ্ধ পরিচালনার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরটি নির্মাণ করেন। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এটি বেসামরিক বিমানবন্দর হিসেবে চালু হয়।
১৯৮১ সালে বর্তমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হওয়ার আগপর্যন্ত তেজগাঁও বিমানবন্দর বাংলাদেশের প্রধান বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিলো। নতুন বিমানবন্দর চালু হওয়ার পর বাংলাদেশ বিমানবাহিনী তেজগাঁও বিমানবন্দর পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। ১৯৮৮ সালের আগস্টে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ তেজগাঁও বিমানবন্দরটি পরিত্যক্ত ঘোষণার সিদ্ধান্ত দেন।
বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে অধিগ্রহণ করা তেজগাঁও পুরোনো বিমানবন্দরের মূল জমির পরিমাণ ছিলো প্রায় ৩৩৩ দশমিক ২০ একর। পরে পরিচালনাগত কাজের জন্য আরও প্রায় ১৬১ দশমিক ৭৯ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। সব মিলিয়ে বিমানবন্দরের জমির পরিমাণ প্রায় ৪৯৫ একর বা প্রায় ৫০০ একর।
এই জমির একটি অংশ বিমানবাহিনী ও রানওয়ের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাকি জমির কিছু অংশ বিভিন্ন ইজারা ও বেদখল-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
//আইই//
