জাপানের ৬.৩৫ বিলিয়ন ডলার: বাংলাদেশের শিল্পায়নে কতোটা প্রভাব ফেলবে
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুসংবাদ এলে আমাদের আনন্দের সীমা থাকে না। বিশেষ করে সেই সুসংবাদের সঙ্গে যদি কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পর্ক থাকে, তাহলে তো কথাই নেই! হিসাবের খাতায় শূন্য যতো বাড়ে, আশার পারদ ততো ওপরে ওঠে। এবার সেই আশার খাতায় নতুন সংযোজন জাপানের এক ট্রিলিয়ন ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ পরিকল্পনা। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে এই অর্থ বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে জাপান; এমন খবর প্রকাশ করেছে দেশটির সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়া। পরিকল্পনাটি এখনো চূড়ান্তভাবে ঘোষিত হয়নি।
সুখবর এসেছে ঠিকই, তবে হাতে এখনো বিনিয়োগের চেক আসেনি। আর অর্থনীতির দুনিয়ায় ঘোষণা আর বাস্তবায়নের দূরত্ব কখনো কখনো টোকিও থেকে ঢাকার দূরত্বের চেয়েও বেশি মনে হতে পারে!
প্রস্তাবিত এই বিনিয়োগের অর্থ অটোমোবাইল, উৎপাদনশিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামোতে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জাপানি কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পাচ্ছে। সবকিছু পরিকল্পনামতো এগোলে দেশের শিল্প খাতে নতুন গতি আসতে পারে, তৈরি হতে পারে কর্মসংস্থানের সুযোগ, বাড়তে পারে উৎপাদন ও রপ্তানি। কিন্তু এখানেই একটি প্রশ্ন, বিনিয়োগের অঙ্ক শুনে আমরা যতোটা উচ্ছ্বসিত হচ্ছি, সেই বিনিয়োগ কাজে লাগানোর প্রস্তুতি কি ততোটাই জোরালো?
কারণ, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমস্যা শুধু বিনিয়োগকারী খুঁজে পাওয়া নয়; বিনিয়োগকারীকে স্বস্তিতে ব্যবসা করার পরিবেশ দেওয়াও। একজন উদ্যোক্তা যখন কারখানা গড়তে আসেন, তখন তিনি শুধু জমি আর শ্রমিকের হিসাব করেন না। বিদ্যুৎ-গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, পরিবহনব্যবস্থা, বন্দরের দক্ষতা, করনীতির স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ব্যবসায়িক নিরাপত্তার হিসাবও করেন। এসবের কোনো একটিতে বড়সড়ো গলদ থাকলে কোটি কোটি ডলারের পরিকল্পনাও ফাইলের ভেতর বেশ আরামে ঘুমিয়ে থাকতে পারে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠককে সামনে রেখে এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা আলোচনায় এসেছে। ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের দ্বিতীয় দিন, ২৭ অক্টোবর টোকিওতে দুই নেতার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও বেসামরিক বিমান পরিবহনসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই সফর থেকে বাংলাদেশ কী নিয়ে ফিরবে? শুধু সুন্দর ছবি, কূটনৈতিক সৌজন্য আর যৌথ বিবৃতির কয়েকটি আশাব্যঞ্জক বাক্য, নাকি বিনিয়োগ বাস্তবায়নের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ?
কূটনীতিতে হাসিমুখে হাত মেলানো জরুরি। কিন্তু অর্থনীতিতে সেই হাতের সঙ্গে কাজের হাতও লাগতে হয়। বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়ে সংবাদ শিরোনাম তৈরি করা যায়, তবে শিল্পকারখানা তৈরি করতে প্রয়োজন জমি, অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা। বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের সম্ভাবনা দেখে আসবেন, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই।
দেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে জাপানের দীর্ঘদিনের ভূমিকা রয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে শিল্প ও প্রযুক্তি বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাপানের সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ উদ্যোগকে কেবল একটি বড় অঙ্কের অর্থের প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি হতে পারে বাংলাদেশের শিল্পায়নকে আরও শক্তিশালী করার একটি সুযোগ। সুযোগ আর সাফল্য এক জিনিস নয়। সুযোগ দরজায় কড়া নাড়তে পারে, কিন্তু দরজা খুলে তাকে ভেতরে আনার কাজটি করতে হয় নিজেদেরই।
আরেকটি বিষয়ও ভুলে গেলে চলবে না। বিনিয়োগ মানেই শুধু বিদেশি অর্থের প্রবাহ নয়; এর সঙ্গে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরির সম্ভাবনাও জড়িত। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বাংলাদেশে উৎপাদন বাড়ায়, তাহলে স্থানীয় কর্মীদের আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। দেশীয় সরবরাহকারীরা আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে কর্মসংস্থান বাড়তে পারে, বিশেষ করে তরুণদের জন্য।
কিন্তু এসব সম্ভাবনার সুফল কতটা বাংলাদেশের মানুষের হাতে পৌঁছাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি কোম্পানি ব্যবসা করবে, মুনাফা করবে এটাই স্বাভাবিক। বিনিয়োগকারীরা দাতব্য প্রতিষ্ঠান নন। তারা লাভের জন্যই বিনিয়োগ করেন। বাংলাদেশের কাজ হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বিনিয়োগকারী লাভবান হবেন, আবার দেশের মানুষও পাবেন চাকরি, দক্ষতা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল। অর্থাৎ, বিদেশি বিনিয়োগের দরজা খুলতে হবে ঠিকই, তবে দেশের স্বার্থের জানালাগুলোও খোলা রাখতে হবে।
জ্বালানি খাতের কথাও আলাদাভাবে বলতে হয়। শিল্পায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। কারখানার যন্ত্রপাতি যদি বিদ্যুতের অপেক্ষায় বসে থাকে, তাহলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে কী হবে? বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে জ্বালানি অবকাঠামো শক্তিশালী হলে তা পুরো অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে প্রকল্পের ব্যয়, পরিবেশগত প্রভাব, প্রযুক্তির মান এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে। বড় বিনিয়োগ মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বড় সাফল্য নয়; সঠিক পরিকল্পনাই বিনিয়োগকে সাফল্যে পরিণত করে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়া। বিনিয়োগকারী যেন মাসের পর মাস অনুমোদনের অপেক্ষায় না থাকেন, জমি পেতে গিয়ে প্রশাসনিক গোলকধাঁধায় না পড়েন, আর ব্যবসা শুরু করার পর নিয়মের ঘন ঘন পরিবর্তনে দিশেহারা না হন সেটি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বিনিয়োগের ফলাফল পরিমাপের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার নিঃসন্দেহে বড় অঙ্ক। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে কত টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হলো, তা দিয়ে নয়; বরং কতটা বিনিয়োগ বাস্তবে এলো, কতগুলো কারখানা চালু হলো, কত মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হলো এবং দেশের উৎপাদন সক্ষমতা কতটা বাড়ল এসব দিয়ে।
তাই জাপানের সম্ভাব্য বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে স্বাগত জানানো উচিত, তবে আগেভাগে বিজয়োল্লাসে মেতে ওঠার প্রয়োজন নেই। যৌথ বিবৃতি প্রকাশের পর সংবাদ শিরোনাম তৈরি হবে, টেলিভিশনে আলোচনা হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আশাবাদের ঢেউ উঠবে। কিন্তু কয়েক বছর পর সেই বিনিয়োগের বাস্তব ফলাফল কী দাঁড়াল, সেটিই হবে আসল পরীক্ষা।
সবশেষে কথা একটাই, বাংলাদেশের দরকার শুধু বিদেশি বিনিয়োগের ঘোষণা নয়, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের বাস্তব প্রমাণ। জাপান যদি অর্থ, প্রযুক্তি ও শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে আসে, তাহলে আমাদেরও প্রস্তুত থাকতে হবে সেই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য। কারণ, অতিথিকে আপ্যায়ন করে বিদায় জানানো আর অতিথিকে সঙ্গে নিয়ে ব্যবসার নতুন দুয়ার খোলা এক কথা নয়। জাপানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা দ্বিতীয় কাজটিই করতে চাই। ৬.৩৫ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা তাই আনন্দের খবর, সন্দেহ নেই। তবে এই আনন্দের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে একটি সহজ হিসাবের ওপর প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবে রূপ নেয়।
শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিতে শূন্যের সংখ্যা নয়, মানুষের জীবনে পরিবর্তনের হিসাবটাই বড়। আর সেই হিসাবের খাতায় বাংলাদেশ যেন এবার শুধু আশার কথা না লেখে, সাফল্যের প্রমাণও যোগ করতে পারে।
লেখক: সংবাদকর্মী
