স্কুলশিক্ষার্থীদের এক ছোট বিক্ষোভ যেভাবে ছড়িয়ে পড়লো পুরো ফ্রান্সে
প্যারিসের উপকণ্ঠে গত সেপ্টেম্বর মাসে কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গুটিকয়েক শিক্ষার্থীর বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সে দেশব্যাপী অস্থিরতার সূত্রপাত। দেশটির শহরজুড়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীরা জীবনযাত্রার অতিরিক্ত ব্যয়, জ্বালানির উচ্চ মূল্য এবং বিদ্যালয়গুলোর করুণ অবস্থার প্রতিবাদ জানাতে শুরু। এই অস্থিরতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দাঙ্গাবাজ ও লুটপাটকারীরাও এতে যোগ দেয়।
আন্দোলন দ্বিতীয় মাসে পা দেওয়ায় পুলিশ হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া কীভাবে জানানো হবে তা নিয়ে রাজনীতিবিদরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
প্যারিসের উপকণ্ঠে বিক্ষোভ
গ্রীষ্মকালীন ছুটি শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৮ সেপ্টেম্বরে পোস্ট করা ভিডিও অনুসারে—প্যারিসের শ্রমজীবী অধ্যুষিত উপকণ্ঠ ‘ক্রেতেই’-এর একটি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এবং অতিরিক্ত পড়ালেখার চাপের প্রতিবাদ জানায় তাঁরা।
কয়েকদিনের মধ্যেই প্যারিসের অন্যান্য জায়গার শিক্ষার্থীরাও অনুরূপ বিক্ষোভ শুরু করে। রাজধানীটির সবচেয়ে দরিদ্র উপকণ্ঠের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা জরাজীর্ণ অবকাঠামো, অতিরিক্ত শিক্ষার্থীপূর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক ত্রুটির প্রতিবাদে প্রধান ফটক অবরুদ্ধ করে।
ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ
আন্দোলন আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই অস্থিরতা দেশটির প্রায় ৪০০টি স্কুলে ছড়িয়ে পড়ে।
উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন জানিয়েছে, ‘এই অবরোধ ছিল শিক্ষক ও কর্মীর ঘাটতি, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, অতিরিক্ত ক্লাস এবং গাদাগাদি করে ক্লাস করার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ।’
শিক্ষার্থীরা ই-বাইকসহ বিভিন্ন বাধা দিয়ে কিছু স্কুলের প্রবেশপথ অবরুদ্ধ করে, অন্যদিকে কেউ কেউ বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করে এবং ময়লার ঝুড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
ফরাসি শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জেফ্রে বলেন, শিক্ষার্থীদের কিছু দাবি “যৌক্তিক”, তবে তিনি তাদের বিক্ষোভের আক্রমণাত্মক আচরণের নিন্দা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের ধাওয়া করেছিলো এবং আতশবাজি ফোটানোর টিউব দিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিলো।
সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ প্রায় ৮০ জন আহত হন এবং অনেক অপ্রাপ্তবয়স্কসহ ৪৪০ জনেরও বেশি মানুষকে আটক করে কর্তৃপক্ষ।
আন্দোলন বেগবান করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা
কয়েকদিনের মধ্যেই বিক্ষোভে উত্তাল হওয়া স্কুলের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ অক্টোবরের মধ্যে এই অস্থিরতা পুরো ফ্রান্সের ১,০০০টিরও বেশি স্কুলে ছড়িয়ে পড়ে, যার মধ্যে ২২০টি স্কুল সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ ছিলো। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশ নিতে শুরু করে।
এই সময়ে কর্তৃপক্ষ দাবি করে, বিক্ষোভগুলো শিক্ষাবিষয়ক যৌক্তিক অসন্তোষের প্রকাশ থেকে ধীরে ধীরে আরও বিপজ্জনক রূপ নিচ্ছে। তাঁরা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মর্টার ধরনের আতশবাজি নিক্ষেপ, সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া এবং লুটপাটের অভিযোগ আনে।
২ অক্টোবরের মধ্যে প্রায় ৪০০ জন পুলিশ কর্মকর্তা এবং ২৩০ জনেরও বেশি স্কুল কর্মচারী ও শিক্ষার্থী আহত হন। গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩,০০০-এ।
আন্দোলনের ব্যাপ্তি
অক্টোবর মাসে বিভিন্ন ক্ষোভ একীভূত হয়ে গণবিক্ষোভে রূপ নিলে এই কর্মসূচির পরিধি বেড়ে ট্রেড ইউনিয়ন, অভিভাবক এবং অন্যান্য অধিকারকর্মীদেরও অন্তর্ভুক্ত করে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৬ অক্টোবরে প্যারিস এবং ফ্রান্সের অন্যান্য ৪০টি শহরে প্রায় ২ লাখ ৫৬ হাজার মানুষ মিছিলে অংশ নেন। উচ্চবিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের একটি ইউনিয়ন জানায়, বিক্ষোভকারীরা প্রায় ১,৮০০টি উচ্চবিদ্যালয় অবরুদ্ধ করে।
বিক্ষোভগুলো মূলত শান্তিপূর্ণ হলেও লিঁয়োতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে এবং প্যারিসসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়ে ৬,০০০-এ পৌঁছায়। ফ্রান্সের বিচারক ও প্রসিকিউটরদের একটি বড় ইউনিয়ন এবং একটি মানবাধিকার সংস্থা ১৪ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের বিরুদ্ধেও পুলিশ অতিরিক্ত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলপ্রয়োগ করেছে বলে অভিযোগ আনে।
এর দুই দিন পর, ৮ অক্টোবরে দেশজুড়ে ছোট আকারের বেশ কয়েকটি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রায় ৭১ হাজার ৫০০ মানুষ অংশ নেন। পরবর্তী সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায় যে ১৩ অক্টোবরে ফ্রান্সজুড়ে আয়োজিত পদযাত্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ যোগ দেন।
এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ বিক্ষোভ
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবরে ফ্রান্সজুড়ে আয়োজিত ১১০টি সরকারবিরোধী পদযাত্রায় ৫ লাখেরও বেশি মানুষ অংশ নেন। একটি প্রধান ট্রেড ইউনিয়ন ‘সিজিটি’ এই সংখ্যা আরও বেশি উল্লেখ করে জানায়, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ। যেকোনো হিসাব অনুসারেই এটি ছিলো সেপ্টেম্বরে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের দিন।
মিছিলে অংশ নেওয়া অনেকেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছিলেন, তবে কিছু মানুষ সহিংসতার পথ বেছে নেন। কর্তৃপক্ষ জানায়, দেশজুড়ে দাঙ্গাবাজরা প্রায় ১,৫০০টি দোকানে ভাঙচুর চালায়। প্যারিসে এক লাখেরও বেশি মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে পদযাত্রা করলেও কয়েকশত মানুষ পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়ায়। পুলিশের তথ্য মতে, তারা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং দোকানের সম্মুখভাগ ও কাঁচের জানালা ভেঙে চুরমার করে।
মধ্য ফ্রান্সের বড় শহর লিমোজ-এ দাঙ্গাবাজরা ১৯ শতকের ঐতিহাসিক সিটি হলের ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। একটি ভিডিওতে ধারণ করা সেই মুহূর্তে দেখা যায়, আগুনের শিখার মধ্যে ভবনটির সুউচ্চ চূড়া ধসে পড়ছে।
কিছু শহরে কারফিউ জারি
সাম্প্রতিক দশকের অন্যতম ধ্বংসাত্মক এই দাঙ্গার পর প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ শান্ত থাকতে সকলের প্রতি আহ্বান জানান। ১৮ অক্টোবর এক সন্ধ্যার ভাষণে মাখোঁ জানান, তিনি জ্বালানির মূল্য কমানোর উদ্যোগ নেবেন।
তিনি আরও বলেন, ‘যারা লুটপাট করেছে তাঁদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং যারা প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলো, তাঁদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে।’ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ওই সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে দাঙ্গাবাজরা অন্তত ৩,০০০ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছিলো।
সরকার প্যারিস, লিল এবং নিসসাসহ বেশ কয়েকটি শহরের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় সোমবার থেকে কারফিউ জারির নির্দেশ দেয়। মার্সেলাইয়ের মতো অন্যান্য শহরগুলোতে বড় ধরনের জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুওহো নুনে জানান, পুলিশ পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে পারেনি। এছাড়া তিনি জাতীয় বেতারে ঘোষণা করেন, তিনি মাখোঁ বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন, যা প্রেসিডেন্ট প্রত্যাখ্যান করেছেন। মন্ত্রী আরও জানান, আগামী সপ্তাহান্তের জন্য পুলিশের জনবল আরও বাড়ানো হবে।
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
কেআর/
