Advertisement(970X90).png
Advertisement(300X90).png

১৫ কার্তিক ১৪৩৩, ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

বিদ্যালয়ই মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে
বিদ্যালয়ই মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে

জাজিরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আমার আনুষ্ঠানিক শিক্ষাযাত্রা শুরু হয়েছিলো ষষ্ঠ শ্রেণিতে। তবে এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার সখ্য ছিলো তারও বহু আগে থেকে। কারণ আমার বাবা-মা দুজনেই দীর্ঘদিন এই স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। ফলে বিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রান্ত, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি পথ আমার কাছে কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশ নয়; এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার শৈশব, পরিবার ও অসংখ্য আবেগের স্মৃতি। আমার শিক্ষকদের স্নেহ, যত্ন, পথনির্দেশনা ও শাসনের সমন্বয়েই হয়তো আজকের আমি হয়ে ওঠা। আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে পড়ে শ্রদ্ধেয় মুজিবর রহমান স্যারের কথা, যিনি আমাকে কখনো গতানুগতিক পদ্ধতিতে ইংরেজি শেখাননি; বরং সবসময় চেয়েছেন, আমি যেন নিজের ভেতরের সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করে নিজস্ব আলোয় বিকশিত হতে পারি। স্যারের সঙ্গে বিদ্যালয়ের মাঠে খোলা আকাশের নিচে বসে ইংরেজি শেখার সেই স্মৃতিগুলো আমাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় আমার কৈশোরের সেই নির্মল দিনগুলোর কাছে। আমি আজ একজন ইংরেজির শিক্ষক—এই পরিচয়ের পেছনে স্যারের অবদান তাই কোনোদিনই ভোলার নয়। মনে পড়ে মোক্তারুজ্জামান স্যারের পড়ানোর সেই মুগ্ধকর ভঙ্গি—তার কণ্ঠ, তার উপস্থাপনার ধরন, তার পাঠদানের সেই স্বতন্ত্র শৈলী আজও যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আলী হোসেন স্যারের তথ্যসমৃদ্ধ ও জ্ঞানগর্ভ লেকচার, জিন্নাহ স্যারের পড়াতে পড়াতে শ্রেণিকক্ষজুড়ে গম্ভীর পদচারণা, গোলাম মোস্তফা স্যারের সহজ-সাবলীল ভাষায় ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা—সবকিছুই আজও স্মৃতির পাতায় অমলিন। আর আমার মায়ের বাংলা ক্লাসের কথা কিভাবে ভুলবো! মহেশ, ছুটি—এমন কতো ছোটগল্প পড়ানোর সময় আবেগে কেঁদে বুক ভাসিয়েছি! একজন শিক্ষক হিসেবে নয়, একজন মা হিসেবে তার পাঠদান আমার শৈশবের অনুভূতির সঙ্গে মিশে আছে। সর্বোপরি, আমার সব শিক্ষকের প্রতিই রইলো গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। তারা আমার সাফল্যে যেমন আনন্দিত ও গর্বিত হয়েছেন, তেমনি জীবনের নানা পরিস্থিতিতে স্নেহ, যত্ন ও ভালোবাসা দিয়ে আমাকে আগলে রেখেছেন। তাদের প্রত্যেকের অবদান আমার জীবনের পথচলায় অমূল্য সম্পদ। অন্য সব ছাত্রীর কাছে এই বিদ্যালয়ের স্মৃতি হয়তো পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ; কিন্তু আমার কাছে এই বিদ্যালয়ের স্মৃতি আজীবনের—অত্যন্ত আবেগের, গভীর ভালোবাসার এবং অমূল্য এক অধ্যায়। কারণ, এই বিদ্যালয়ের প্রতিটি স্থান, প্রতিটি প্রান্ত আমাকে মনে করিয়ে দেয় আমার সবচেয়ে আপনজন—আমার বাবার কথা। তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না; সবার পাশে দাঁড়ানোর এক অদম্য চেষ্টা ছিলো তার। ছাত্রীদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের মাঠ পরিষ্কার করতেও তিনি কখনো দ্বিধা করেননি। দরিদ্র ও অসহায় ছাত্রীদের কাছে তিনি ছিলেন ভরসার এক অনন্য জায়গা। তার শিক্ষকসত্তার বাইরেও মানুষের প্রতি তার যে গভীর দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসা ছিলো, তা আজও আমাকে অনুপ্রাণিত করে। এই বিদ্যালয়ের মাঠেই আমি আমার বাবাকে শেষবারের মতো স্পর্শ করেছি, শেষ বিদায় জানিয়েছি। তাই এই মাঠ, এই বিদ্যালয় আমার কাছে কোনো ক্ষণিকের স্মৃতির স্থান নয়। এটি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান কিছু মুহূর্তের সাক্ষী—আমার শৈশব, আমার স্বপ্ন, আমার শিক্ষক, আমার বাবা ও আমার বেড়ে ওঠার গল্পের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সময়ের স্রোতে জীবনের অনেক কিছুই বদলে যায়, মানুষ দূরে সরে যায়, স্মৃতির অনেক রং ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে। কিন্তু জাজিরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের স্মৃতিগুলো আমার হৃদয়ে চিরকাল অমলিন থাকবে। এই বিদ্যালয় শুধু আমাকে শিক্ষা দেয়নি; আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, নিজেকে চিনতে শিখিয়েছে এবং সর্বোপরি একজন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। আমার প্রিয় বিদ্যালয়ের প্রতি তাই রইলো অফুরন্ত ভালোবাসা, গভীর শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা। লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, বিইউবিটি /শান্ত/