Advertisement(970X90).png
Advertisement(300X90).png

১৫ কার্তিক ১৪৩৩, ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে দীর্ঘমেয়াদি হুমকি সৃষ্টি করছে শিল্পের বায়দুষণ
সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে দীর্ঘমেয়াদি হুমকি সৃষ্টি করছে শিল্পের বায়দুষণ

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বায়ুদূষণ সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর ফলে উদ্ভিদের শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং বনটির সামগ্রিকভাবে প্রতিকূলতা মোকাবিলার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে বাঘের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত এ বনটির অস্তিত্বের জন্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, ‘বায়ুদূষণ সরাসরি উদ্ভিদের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। শিল্পকারখানার ধুলাবালি পাতার ওপর জমলে সূর্যের আলো বাধাগ্রস্ত হয় এবং পাতার পত্ররন্ধ্র বন্ধ হয়ে যায়। এতে সালোকসংশ্লেষণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।’ সালোকসংশ্লেষণ হলো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সবুজ উদ্ভিদ সূর্যের আলো, পানি ও কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান তৈরি করে এবং বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ছেড়ে দেয়। অধ্যাপক মনিরুল বলেন, উদ্ভিদরাজি খাদ্যজালের ভিত্তি তৈরি করে। ফলে উদ্ভিদের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হলে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সম্প্রতি সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) এবং আরণ্যক ফাউন্ডেশনের যৌথ এক গবেষণায় সুন্দরবনের বায়ুদূষণের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় বনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সূক্ষ্ম বস্তুকণা (পিএম২.৫) ও ধুলিকণার (পিএম১০) বিপজ্জনক মাত্রা শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শরণখোলা রেঞ্জে পিএম২.৫-এর ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ১০২ মাইক্রোগ্রামে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, পিএম১০-এর মাত্রা সর্বোচ্চ প্রতি ঘনমিটারে ১১৪ মাইক্রোগ্রাম রেকর্ড করা হয়েছে। দূষণমাত্রার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চাঁদপাই রেঞ্জ। সেখানে পিএম২.৫-এর ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৮৯ দশমিক ৩ মাইক্রোগ্রাম এবং পিএম১০-এর ঘনত্ব ৯৮ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম পাওয়া গেছে। অধ্যাপক মনিরুল বলেন, বনের আশপাশে ভারী শিল্পকারখানা ও সিমেন্ট কারখানার বিস্তার বায়ুর গুণগত মানের অবনতির জন্য সরাসরি দায়ী। তিনি বলেন, ‘শিল্পদূষণ ধীরগতির বিষের মতো কাজ করে। এর প্রভাব ক্রমে জমা হতে থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি বাড়ায়। ফলে ভয়াবহ ক্ষতির লক্ষণ তাৎক্ষণিকভাবে বা স্পষ্টভাবে দেখা নাও যেতে পারে।’ সিইজিআইএসের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা এ খান বলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দ্রুত শিল্পায়নের ফলে সংলগ্ন বনাঞ্চলের বায়ুর গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, সিমেন্ট কারখানায় কাঁচামাল ক্লিংকার প্রক্রিয়াজাত করার সময় বিপুল পরিমাণ সূক্ষ্ম ধুলিকণা (পিএম১০) ও শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করতে সক্ষম বিপজ্জনক কণা (পিএম২.৫) নির্গত হয়। প্রচলিত বাতাসের প্রবাহ এসব দূষণকারী উপাদানকে বনাঞ্চলের দিকে নিয়ে যেতে পারে। দূষণের সব উৎস শনাক্ত করার জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ফিদা এ খান বলেন, ‘সুন্দরবনের চারপাশে পরিচালিত উচ্চমাত্রার দূষণকারী সিমেন্ট কারখানাগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া বা বন্ধ করা না গেলে এই ঝুঁকিপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’ অধ্যাপক মনিরুলের উদ্বেগের সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি বলেন, বিষাক্ত বস্তুকণা নীরবে উদ্ভিদরাজির ক্ষতি করছে। বাস্তুতন্ত্রের বিপর্যয়ের প্রকৃত ব্যাপকতা হয়তো আরও এক দশক পর স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিইজিআইএস-আরণ্যক ফাউন্ডেশনের যৌথ গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র অবিলম্বে স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে বিশেষভাবে পিএম২.৫ ও সালফার ডাই-অক্সাইডের (এসও২) মাত্রা পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শিল্পকারখানা থেকে নির্গত দূষণকারী উপাদান কীভাবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তা নির্ভুলভাবে বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বাতাসের গতি এবং বৃষ্টিপাতের ধরনসহ আবহাওয়াসংক্রান্ত তাৎক্ষণিক তথ্য পর্যবেক্ষণব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত এই বন সমৃদ্ধ ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ, পাখি ও জলজ প্রাণীর বসবাস। কেআর/

সুন্দরবনের ৭ জলজ প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স যুক্ত হচ্ছে আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে
সুন্দরবনের ৭ জলজ প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স যুক্ত হচ্ছে আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে

জানা যায়, আগামী মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য এক কর্মশালায় বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রীর উপস্থিতিতে গবেষণার ফলাফল বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করবেন গবেষক দল। এরপরই হবে জিন ব্যাংকে যুক্ত হওয়ার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। 'সুন্দরবনের জলজ সম্পদের মূল্যায়ন' শীর্ষক ১৬ মাসব্যাপী এক বিস্তৃত গবেষণায় এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের 'সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) এবং আরণ্যক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এই গবেষণা পরিচালনা করে। সম্প্রতি খুলনায় অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে গবেষণার খসড়া তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। যেখানে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। গবেষক দল ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দীর্ঘ ১৬ মাস সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জের ৬৫টি নদী ও খাল জরিপ করেন। এছাড়া বনের ভেতরে ৪২৪ কিলোমিটার এলাকায় নৌকা দিয়ে এবং শ্যামনগর, কয়রা, মংলা ও শরণখোলার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। গবেষক দলের প্রধান ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক বলেন, "গবেষণার পর আমরা পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ি আমেরিকার আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে আপলোডের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু যেহেতু বিষয়টি বন বিভাগের, তাই আগামী নভেম্বর মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য প্রকল্পের চূড়ান্ত কর্মশালায় বন ও পরিবেশ মন্ত্রীর উপস্থিতিতে গবেষণার ফলাফল বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পরবর্তীতে সরকারিভাবে বন বিভাগের মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে উল্লিখিত সাত প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স স্থান পাবে।" তিনি বলেন, এর আগেও সুন্দরবনের ১৪১ প্রজাতির মাছের ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে যুক্ত হয়েছে। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল কোরিয়ার সহযোগিতায় বন বিভাগের সাথে সমন্বয় করে গবেষণা সম্পন্ন করেন। উপযুক্ত পরিবেশ ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে সুন্দরবনের এই জলজ সম্পদ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। নতুন প্রজাতির আবিষ্কার গবেষক দলটি সুন্দরবনের ৩০ প্রজাতির মাছ ও ১১ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর ডিএনএ বারকোড তৈরি করেছেন। এর অংশ হিসেবে ৮৩টি মাছের নমুনার ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের উপকূলীয় জলসীমার জন্য সম্পূর্ণ নতুন পাঁচটি মাছ ও দুইটি চিংড়ির প্রজাতি নথিবদ্ধ করা হয়। যাদের ডিএনএ সিকোয়েন্স আগে বিশ্বের কোনো আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে ছিল না। আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে এই তথ্য অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বিশ্বের কাছে সুন্দরবনের জলজ প্রাণীর স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হবে এবং বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা সুন্দরবনের এসব প্রজাতির ওপর আরও নিখুঁত গবেষণা চালাতে পারবেন। নতুন আবিষ্কৃত মাছগুলো হলো, বড় আইশ পারশে, ফোটা বাটা, বার্মিজ এক ঠ্ইুটা, কুলি বেলে বা চ্যাপ্টা মাথা বেলে এবং সবুজ ফোঁটা বেলে । এ ছাড়া পাওয়া গেছে সম্পূর্ণ নতুন দুই প্রজাতির চিংড়ি। এগুলো হচ্ছে, মাকড়সা চিংড়ি ও ফোঁটা চিংড়ি পোকা। গবেষণায় সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জে (শরণখোলা, সাতক্ষীরা, খুলনা ও চাঁদপাই) জলজ সম্পদের অবস্থা, প্রজনন মৌসুম এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শরণখোলা রেঞ্জে সবচেয়ে বেশি প্রজাতির বৈচিত্র্য (১৬৪ প্রজাতি) রয়েছে। তবে বেশ কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ ও নদী-খালে বিষ প্রয়োগের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে প্রাকৃতিক মাছের মজুত হুমকিতে পড়ছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের জলজ সম্পদের সমৃদ্ধ ভাণ্ডারে নতুন এই গবেষণার মাধ্যমে মোট ২৫১ প্রজাতির মাছ ও ৫১ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর ফলে আগের গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে সুন্দরবনে এখন মোট ৩৮২ প্রজাতির সাদা মাছ এবং ৮৮ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর (চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, অক্টোপাস ও স্কুইড) সন্ধান মিলল। সংরক্ষণ ও সুরক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মরফো-মলিকুলার পদ্ধতিতে মাইটোকন্ড্রিয়াল (কোনো জীবের প্রজাতি নিখুঁতভাবে শনাক্তকরণের একটি আধুনিক ও সমন্বিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি) পদ্ধতিতে এগুলো শনাক্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে মরফোলজিক্যাল (বাহ্যিক গঠনগত) এবং মলিকুলার (ডিএনএ বা জিনগত) এই দুটি পদ্ধতিকে একত্রে ব্যবহার করে কোনো জীবের নিখুঁত ট্যাক্সোনমিক শ্রেণিবিন্যাস করা হয়ে থাকে। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে মোট ৮৩টি মাছ ও ২৮টি ক্রাস্টাশিয়ান নমুনা শনাক্ত করা হয়। এতে ৩০ প্রজাতির মাছ এবং ১১ প্রজাতির ক্রাস্টাশিয়ানস (খোলসযুক্ত জলজ প্রাণী) সহ মোট ৪১টি প্রজাতির বারকোড সিকোয়েন্স তৈরি করা হয়। আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের রেফারেন্সের সাথে এসব সিকোয়েন্সের নিউক্লিওটাইড (ডিএনএ এবং আরএনএ নামক নিউক্লিক অ্যাসিডের মৌলিক গাঠনিক একক বা মনোমার) মিল পাওয়া গেছে ৯৮.১৯ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত। গবেষকরা জানান, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলের জলজ প্রাণীর জিনোম ডেটাবেজ আন্তর্জাতিক পরিম-লে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে। যা ভবিষ্যতে প্রজাতির সুরক্ষা, অবৈধ শিকার রোধ ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গবেষণায় দেখা গেছে, অনিয়ন্ত্রিত ও অতিরিক্ত আহরণ, পোনা মাছ ধরা এবং ক্ষতিকর বিষ প্রয়োগের ফলে ভেটকি, পোয়া, পাঙাশের মতো বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বড় মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। সুন্দরবনের এই জলজ ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে গবেষণা প্রতিবেদনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতি আহরণের সীমা নির্ধারণ এবং নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করা, বিষ প্রয়োগ ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা, প্রজনন নিশ্চিত করতে নতুন বাস্তুসংস্থানগতভাবে উপযুক্ত খালকে (যেমন: খোদিয়াখালী, আঠারোবেকি, আরমাল ও কাগাবোগা খাল) 'সংরক্ষিত খাল' হিসেবে ঘোষণা করা এবং বন নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা। সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের পরিচালক ও খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই নতুন অর্জন সুন্দরবনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গবেষণার সুপারিশ অনুযায়ী সুন্দরবনের জলজ সম্পদ রক্ষায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। প্রধান ডিএনএ বারকোডিং প্রকল্প জানা যায়, সুন্দরবনের মাছের প্রজাতি শনাক্তকরণ এবং জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণে গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। ২০২০ এবং ২০২১ সালের দিকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা সুন্দরবনের জলজ প্রাণীর উপর একটি বড় গবেষণা পরিচালনা করেন। তারা সুন্দরবনের মাছের প্রজাতি নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে ডিএনএ বারকোডিং পদ্ধতি ব্যবহার করেন। সুন্দরবনের মাছ, কাঁকড়া ও শামুক-ঝিনুকের ওপর ডিএনএ বারকোডিং করা হয়। সেই গবেষণার অংশ হিসেবে সুন্দরবনের লোনা ও আধা-লোনা পানির প্রায় ১২০টি মাছ ও ৬৫টি বিভিন্ন জলজ প্রাণীর (যার সিংহভাগই মাছ) মোট ১৮৫টি মাইটোকন্ড্রিয়াল সিকোয়েন্স এবং ৫৯টি আরএনএ সিকোয়েন্সের তথ্য আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়। /কেআর/

সুন্দরবনের কাঁকড়ায় মাইক্রোপ্লাস্টিক, মাছে বিষাক্ত সিসা
সুন্দরবনের কাঁকড়ায় মাইক্রোপ্লাস্টিক, মাছে বিষাক্ত সিসা

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, খোলপেটুয়া নদীর শিলা কাঁকড়ার ফুলকায় গড়ে ১৮টি ও অন্ত্রে ৩০টি প্লাস্টিক কণা পেয়েছেন গবেষকেরা। অন্যদিকে, সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান নদ পশুরের তিন প্রজাতির মাছের শরীরে পাওয়া গেছে মাত্রাতিরিক্ত সিসা, নিকেল ও তামার মতো ভারী ধাতু। এ অবস্থায় সুন্দরবনে প্লাস্টিক নিয়ে পর্যটকদের প্রবেশ কবে বন্ধ হবে, সে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। গবেষণার এসব ফল সুন্দরবনের জলজ পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খল নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দূষণ কমাতে নদীতে অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য ফেলা বন্ধ, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সুন্দরবনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বন বিভাগ। যদিও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে বলে দেখা যায়নি। সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে গবেষণাটি করেছে সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ও অরণ্যক ফাউন্ডেশন। গত ১৩ আগস্ট খুলনায় গবেষণাটির খসড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অন্যদিকে, পশুর নদে মাছের শরীরে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টক্সিকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট। গত বছরের ১১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ডিসকভার এনভায়রনমেন্টে তাদের এ গবেষণার নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান মো. আসাদুর রহমান বলেন, মাত্রাতিরিক্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা জলজ প্রাণীর বৃদ্ধি ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত করছে। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এসব কণা বড় প্রাণীর শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে তারাও নানা জটিলতার শিকার হতে পারে। তিনি বলেন, ‌সিসা, তামা, নিকেল ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এসব ধাতুর সংস্পর্শ ক্যানসার, লিভার সিরোসিসসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বনের নদী ও মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক এর আগেও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের উজান থেকে প্রতি বছর প্রায় ৪০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য ও মাইক্রোপ্লাস্টিক সুন্দরবন হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ছে। শুধু ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর ত্রাণসামগ্রীর মাধ্যমে বনের ভেতরে ৫৬ টনেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি জানতে সুন্দরবনের নদীগুলোর পানি ও মাটিতে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পরীক্ষা করেন গবেষকেরা। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত তারা কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের খোলপেটুয়া এবং শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদীর পানি ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করেন। পরীক্ষায় খোলপেটুয়া নদীর প্রতি ঘনমিটার পানিতে ৫৭০টি, ভোলা নদীর পানিতে ৫৩০টি এবং শাকবাড়িয়া নদীর পানিতে ৩৬০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। একই সময়ে খোলপেটুয়া নদীর প্রতি কেজি পলিমাটিতে ৫৭টি, ভোলা নদীতে ৪৪টি এবং শাকবাড়িয়া নদীতে ৪৫টি প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেন গবেষকেরা।খোলপেটুয়া নদীর শিলা কাঁকড়া পরীক্ষা করে এর ফুলকায় গড়ে ১৮টি ও অন্ত্রে ৩০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। সুন্দরবন এলাকার পানি ও পলি নিয়ে আগের বিভিন্ন গবেষণার তুলনায় এবারের গবেষণায় কিছু এলাকায় বেশি পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। তবে গবেষণায় স্থানভেদে প্রতি ঘনমিটার পানিতে ২ থেকে ৫৩টি এবং প্রতি কেজি পলিতে ১৭ থেকে ১৭৭টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়ার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। শিলা কাঁকড়ার শরীরে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন ও পলিভিনাইল ক্লোরাইডের (পিভিসি) মতো প্লাস্টিকের উপাদানও পাওয়া গেছে। ‘সুন্দরবনে জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শিরোনামে পরিচালিত গবেষণাটির প্রধান বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রথমে জুপ্ল্যাঙ্কটন ও ছোট জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে। পরে ধীরে ধীরে সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খলের উচ্চস্তরের প্রাণীদের দেহে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, নদীর পলিতে আটকে থাকা প্লাস্টিক প্রাকৃতিক অণুজীব ও তলদেশের প্রাণীদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্রও ধ্বংস করছে। সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণ কমাতে বড় পরিসরের পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতিমালা তৈরি করতে হবে। পশুর নদের মাছেও ভারী ধাতু সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান নদ পশুরের ছয়টি স্থান থেকে তিন প্রজাতির মাছের নমুনা সংগ্রহ করে ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মোংলা শিল্পাঞ্চল, মোংলা সমুদ্রবন্দর, বানিশান্তা, করমজল ও হারবাড়িয়া এলাকা থেকে পারশে, দাঁতিনা ও পাতা বাটা মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। মাছ তিনটি নদীর ওপর, মধ্য ও নিচের অংশে বিচরণ করে। পরীক্ষার প্রতিবেদনে প্রতি মাছের নমুনায় গড়ে ৪ দশমিক ৩৫ মিলিগ্রাম সিসা, ৩ দশমিক ৬ মিলিগ্রাম নিকেল, ১ দশমিক ৪২ মিলিগ্রাম তামা এবং ১ দশমিক ৪৬ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। মাছের অন্ত্রে এসব ধাতুর ঘনত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি; এরপর ছিল ফুলকায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহনশীল মাত্রার সঙ্গে তুলনা করে গবেষণায় বলা হয়েছে, মাছে সিসার সহনীয় মাত্রা দশমিক ২ থেকে দশমিক ৪ মিলিগ্রাম, ক্যাডমিয়াম দশমিক ০৫ থেকে দশমিক ১ মিলিগ্রাম, নিকেল দশমিক ৫ থেকে ১ মিলিগ্রাম এবং তামা ৩০ মিলিগ্রাম। গবেষণাটির প্রধান ও বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টক্সিকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইভানা পাভীন লিপি বলেন, পশুর নদের উজান থেকে আসা শিল্পবর্জ্য, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসংলগ্ন এলাকা, মোংলা সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের অপরিশোধিত কঠিন ও তরল বর্জ্য নদীর পানি ও পলিমাটি দূষিত করছে। একপর্যায়ে এসব দূষক মাছের শরীরে প্রবেশ করছে। পশুর নদ ও সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় নদীর তীরবর্তী কলকারখানার বর্জ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শোধন না করে নদীতে ফেলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করতে হবে। প্লাস্টিক প্রবেশ বন্ধের দাবি সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, যৌথ নদী কমিশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম কাজে লাগিয়ে উজান থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য আসা বন্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং এর চারপাশের ১০ কিলোমিটারের পরিবেশগতভাবে সংকটপূর্ণ এলাকায় শিল্পকারখানা, কটেজ, রিসোর্ট ও নৌযানে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বহন ও ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, দুর্যোগের পর ত্রাণ বিতরণে প্লাস্টিকের মোড়কের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, মোংলা বন্দর ও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় সক্রিয় কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বাধ্যতামূলক করা এবং নদীপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও ট্রলার থেকে প্লাস্টিক ও তেলবর্জ্য ফেলা বন্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এদিকে, সুন্দরবনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ। তিনি বলেন, এ বিষয়ে পর্যটক ও ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। শিগগিরই সুন্দরবনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধ করা হবে। একই সঙ্গে বনের আশপাশে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।