ব্যাংক ঋণ পরিশোধের সীমা বাড়ছে, সংশোধন হচ্ছে আইপিও বিধিমালা
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর দায়িত্ব নেয়ার পর পরই মাসুদ খানের নেতৃত্বাধীন কমিশন এমন পরিবর্তন আনার ঘোষণা আগেই দিয়েছিলেন। কমিশনের ভাষ্য, দেশের অর্থনীতি এখনও ব্যাংকনির্ভর। ফলে যারা ব্যাংক নিয়ে কোম্পানি গড়েছে, তাদের পাশাপাশি যাদের নতুন করে অনেক মূলধনের দরকার নেই, তাদেরও শেয়ারবাজারে আসার সুযোগ দিতে নতুন ব্যবস্থার দরকার। কমিশন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই বছরের বেশি সময় দেশের শেয়ারবাজারে কোনো আইপিও আসেনি। যৌক্তিক মূল্য না পাওয়া, আইপিও অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতাসহ বিভিন্ন কারণে ভালো কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসতে চায় না। এই অবস্থা নিরসনে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের বাস্তবভিত্তিক চাহিদা বিবেচনায় রেখে আইপিও বিধানের সংশোধন প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশোধন উদ্যোগের আগে রাশেদ মাকসুদ কমিশন আইপিও বিধিমালা নতুন করে প্রণয়ন করেছিলো, যার গেজেট হয় গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর। মাত্র ১০ মাসের ব্যবধানে নতুন সংশোধন প্রস্তাব আনল বর্তমান কমিশন। যেসব গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছে বর্তমানে আইপিও বিধিমালায় সংগ্রহ করা মূলধনের ৩০ শতাংশের বেশি অর্থ দিয়ে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা যায় না। নতুন প্রস্তাবে এ সীমা বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে শর্ত রাখা হয়েছে– ঋণ অবশ্যই কোম্পানির কোনো প্রকল্প বা বিএমআরই কাজে ব্যবহৃত হতে হবে এবং খেলাপি বা পুনঃতপশিলকৃত নয় মর্মে ব্যাংকের এমডির লিখিত প্রত্যয়ন দিতে হবে। বর্তমানে আইপিও মানে মূলত নতুন মূলধন বা শেয়ার ইস্যু করা। সংশোধন প্রস্তাবে নতুন শেয়ার ইস্যু এবং বিদ্যমান উদ্যোক্তা বা শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার বিক্রি– এই দুইয়ের সমন্বয়ে অন্তত ৫ শতাংশ শেয়ার আইপিওতে ছাড়ার শর্তে ‘হাইব্রিড মোড’– এর সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি, অন্তত ৩০০ কোটি টাকার সম্পদ থাকা নিবন্ধিত টেলিকম কোম্পানি, কিংবা অন্তত ৫০০ কোটি টাকা বার্ষিক বিক্রি বা সম্পদ থাকা কোম্পানিগুলো হাইব্রিড মোডে শেয়ার বিক্রি করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে। এতে বহুজাতিক ও বড় দেশি কোম্পানিগুলোর বাজারে আসার পথ সুগম হবে বলে মনে করছে বিএসইসি। বর্তমান বিধানে আইপিও আবেদনের দুই বছরের মধ্যে বোনাস শেয়ার ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে মূলধন বাড়ানোর সুযোগ নেই। সংশোধন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে অন্তত ১ শতাংশ শেয়ারে বিনিয়োগ করলে বা ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশি কোনো বিনিয়োগকারী মূলধন জোগালে আবেদনের এক বছর আগেও তা গ্রহণযোগ্য হবে। বিধিমালার সংশোধন প্রস্তাবে উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিশ্রেণির জন্য আইপিও কোটা বাতিল করা হয়েছে। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কোটা সংশোধন করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ৩৫ শতাংশ, মিউচুয়াল ফান্ড ১০ শতাংশ, আইপিওতে আসা কোম্পানির স্থায়ী কর্মচারীদের ৫ শতাংশ, এনআরবি ১০ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ৪০ শতাংশ বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘ফিক্সড প্রাইস’পদ্ধতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ৬৫ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে। সম্পূর্ণ নতুন সংযোজন আইপিও বিধিমালার সংশোধনে বিদ্যুৎ, শক্তি, অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা বা আতিথেয়তা খাতের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও বড় বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন ধারা যুক্ত করে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে ‘ক্যাপিটাল-ইনটেনসিভ কোম্পানি’নামে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অন্তত ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ থাকা এই ধরনের কোম্পানি বা প্রকল্প যদি শুরুর দিকে বা সাম্প্রতিক সময়ে পুঞ্জীভূত লোকসানেও থাকে, তবুও তাদের জন্য মুনাফার বাধ্যবাধকতা শিথিল করে আইপিওতে আসার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে তালিকাভুক্তির দুই বছরের মধ্যে কীভাবে লাভজনক হবে, তার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রসপেক্টাসে প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা আরোপের কথা বলা হয়েছে। আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তোলা অর্থ যাতে অন্য কোনো খাতে সরাতে না পারে, সে জন্য নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। কোম্পানিকে একটি পৃথক ‘এসক্রো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট’ খুলতে হবে এবং ব্যাংকে লিখিত শর্ত দিতে হবে– প্রসপেক্টাসে উল্লিখিত সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া এই ফান্ড কোনোভাবেই তোলা বা ব্যবহার করা যাবে না। দায় নিতে হবে অডিটর ও ইস্যু ম্যানেজারকে আইপিও আবেদনের আগে বিএসইসির প্যানেলভুক্ত একজন স্বাধীন অডিটর দ্বারা কোম্পানির হিসাবনিকাশ, রাজস্ব, সম্পদ, দায়, কর-ভ্যাট, ব্যাংক স্থিতি এবং কারখানা সরেজমিন পরিদর্শন করে একটি ‘প্রাক-আইপিও যাচাইকরণ প্রতিবেদন’প্রস্তুত করতে হবে। এর পরও ভুল বা জাল তথ্য মিললে তার জন্য অডিটরকেও আইনিভাবে দায়ী করা হবে। প্রসপেক্টাসের শুরুতে একটি বাধ্যতামূলক বক্সে উল্লেখ থাকবে যে, বিএসইসি সম্মতি দিলেও কোম্পানির আর্থিক তথ্যের সত্যতার দায় কমিশনের নয়, তথ্যের সব দায়ভার ইস্যুকারী কোম্পানি, তার পরিচালনা পর্ষদ এবং অডিটরের ওপরই বর্তাবে। আইপিও কাজের সুবিধার জন্য অন্য কোনো মার্চেন্ট ব্যাংক বা তৃতীয় পক্ষকে কোনো নির্দিষ্ট দায়িত্বে যুক্ত করা হলেও ইস্যু ম্যানেজারের মূল দায়িত্ব ও চূড়ান্ত জবাবদিহিতা বিন্দুমাত্র কমবে না। শুধু দায় নয়, এ জন্য চুক্তিভিত্তিক উপযুক্ত ফি দেওয়ারও ব্যবস্থার কথা বলেছে কমিশন। /কেআর/