শুল্ক ছাড় নিয়ে কড়া নজরদারিতে এনবিআর
গত ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে (বিটিটিসি) এই বিষয়ে চিঠি দিয়েছে এনবিআরের কাস্টমস বিভাগ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এসব পণ্যের আমদানি শুল্ক ও কর কমানোর পর বাজারে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে ভ্যাট বিভাগও আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করবে। বিটিটিসির চেয়ারম্যান নাসির-উদ-দৌলা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তারা এনবিআরের চিঠি পেয়েছেন। যত দ্রুত সম্ভব বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। শুল্ক ছাড়ের সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন বাংলাদেশে আমদানি শুল্ক তুলনামূলক বেশি বলে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন ভোক্তা ও ব্যবসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক ও কর কমানো হলেও তার প্রতিফলন অনেক সময় খুচরা বাজারে দেখা যায় না। বরং আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের একাংশ বাড়তি মুনাফা করেন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চেয়ারম্যান এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে শুল্কহার বেশি। মাঝেমধ্যে কিছু পণ্যে শুল্ক কমানো হলেও সেই সুবিধা ভোক্তাদের কাছে খুব একটা পৌঁছায় না। তার মতে, এর পেছনে অসাধু ব্যবসায়ীদের ভূমিকার পাশাপাশি সময়মতো শুল্ক সমন্বয় না করা এবং এনবিআরের যথাযথ নজরদারির ঘাটতিও দায়ী। এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ভোক্তাদের সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই সাধারণত শুল্ক ও কর ছাড় দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সুবিধা শেষ পর্যন্ত কারা পাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, সরকার ব্যবসায়ীদের মুনাফা বাড়ানোর জন্য রাজস্ব ছাড় দেয় না। তাই কয়েকটি পণ্যের তালিকা করে শুল্ক কমানোর সুফল কতটা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছেছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এই মূল্যায়ন ভবিষ্যতে শুল্ক ও করসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সহায়তা করবে। এর আগে এনবিআরের একাধিক চেয়ারম্যানও শুল্ক ছাড়ের সুফল ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। মূল্যায়নের আওতায় ১৮ ধরনের পণ্য এনবিআরের পর্যালোচনায় রয়েছে কম্পোজিট পেপার, কীটনাশক, খেজুর, মসলা, ডায়ালাইসিস যন্ত্রাংশ, বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ও ওষুধ তৈরির কাঁচামাল। এছাড়া কম্পিউটার ও এর যন্ত্রাংশ, পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) মেশিন, বৈদ্যুতিক চার্জার ও চার্জিং স্টেশন, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর ছাড়ের প্রভাব খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগ রয়েছে, শুল্ক সুবিধা আদায়ের জন্য কোনো কোনো ব্যবসায়ী ট্যারিফ কমিশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে এমনভাবে প্রস্তাব উপস্থাপন করেন, যাতে নির্দিষ্ট খাতের পক্ষে সিদ্ধান্ত আসে। কিন্তু সুবিধা পাওয়ার পর তা ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় না। সাধারণত শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব বিবেচনার ক্ষেত্রে ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কমিশনের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে নির্দিষ্ট খাতের পক্ষে সুপারিশ করার অভিযোগও রয়েছে। তবে ট্যারিফ কমিশনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, শুল্ক কমলেই যে বাজারে পণ্যের দাম কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, শুল্ক কমানোর একই সময়ে ডলারের বিনিময় হার বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে পরিবহন ও সরবরাহ খরচ বেড়ে গেলেও পণ্যের দাম কমানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শুল্ক কমানোর পরও বাজারে দাম অপরিবর্তিত থাকতে পারে। এমনকি শুল্ক কমানো না হলে দাম আরও বাড়তে পারত। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ট্যারিফ কমিশনের মূল্যায়নের সুযোগ সীমিত। ওষুধ ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব কমিশন থেকে দেওয়া হয়নি। ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামে ছাড়, কমছে না খরচ শুল্ক ও কর কমানোর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে কতটা পড়ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও। সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিচালক ডা. মহিব উল্লাহ খন্দকার বলেন, ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে আগে ৫ থেকে ৭ শতাংশ কর দিতে হতো। তবে আমদানিকারকেরা পরে ওই অর্থ কর রেয়াত হিসেবে ফেরত পেতেন। ফলে এই কর প্রত্যাহারে চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান বা রোগীদের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো নতুন সুবিধা তৈরি হয়নি। বাজেটে কর ছাড়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও ডায়ালাইসিসের খরচে পরিবর্তন আসেনি বলে জানান তিনি। তার মতে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ডায়ালাইজার কেনার সময় আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে রোগীরা সরাসরি উপকৃত হতে পারেন। বর্তমানে একটি ডায়ালাইজারের দাম প্রায় ৮০০ টাকা। ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে দাম প্রায় ১০০ টাকা কমতে পারে। এই ধরনের যন্ত্রাংশের ওপর কর আরও কমানো গেলে চিকিৎসার ব্যয়ও কমানো সম্ভব। কাঁচামালে শুল্ক ছাড়ের সুফল কতটা? বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির (বিএপিআই) মহাসচিব ও হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত নতুন ১৭টি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হতে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে কোন কাঁচামালে আগে শুল্ক সুবিধা ছিলো না, নতুন সিদ্ধান্তে কতটা শুল্ক কমেছে এবং উৎপাদন ব্যয়ে তার প্রভাব কতটা পড়েছে, তার ওপর। অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) উৎপাদনে ব্যবহৃত ৫৩টি নতুন কাঁচামালের শুল্ক ও কর ছাড়ের বিষয়ে তিনি বলেন, এই খাতে আগে থেকেই সুবিধা থাকায় নতুন সিদ্ধান্তে ভোক্তাদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা তৈরি হওয়ার সুযোগ সীমিত। ক্যানসারের ওষুধের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। এসব ওষুধে আগে থেকেই শুল্ক সুবিধা থাকলে নতুন সিদ্ধান্তের কারণে দাম আরও কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে আগে শুল্ক আরোপিত ছিল, এমন কোনো ওষুধের ক্ষেত্রে নতুন করে শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে মূল্য কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত বায়োলজিক্যাল সেফটি ক্যাবিনেট আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করায় এনবিআরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে শেষ পর্যন্ত ওষুধের দাম কমবে কি না, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি। এনবিআরের চলমান মূল্যায়নে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। তবে শুল্ক ছাড়ের প্রকৃত সুফল নির্ধারণে আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি উৎপাদন, পরিবহন, সরবরাহ ও বাজারমূল্যের পরিবর্তনও বিবেচনায় নিতে হবে। /শান্ত/