Advertisement(970X90).png
Advertisement(300X90).png

১৫ কার্তিক ১৪৩৩, ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

মিশরে রাজতন্ত্রের গোড়ার দিকে রাজার মৃত্যুর পর কি নরবলি দেওয়া হতো?
মিশরে রাজতন্ত্রের গোড়ার দিকে রাজার মৃত্যুর পর কি নরবলি দেওয়া হতো?

মিশরের প্রথম রাজবংশের রাজারা শাসন করেছিলেন আনুমানিক ৩০৭৮ থেকে ২৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত। বর্তমান আবিদোস শহরের উম এল-কাব নামক স্থানে ১৯২০-র দশকে প্রথম খোঁড়াখুঁড়ি করেন ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ ফ্লিন্ডার্স পেট্রি। এই প্রাচীন রাজবংশের রাজাদের জীবনযাপন, তৎকালীন মিশরীয় সংস্কৃতি নিয়ে তিনি বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। রাজাদের সমাধির চারপাশে খননকার্য চালিয়ে বহু মানুষের দেহাবশেষ খুঁজে পেয়েছিলেন পেট্রি। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এক রাজার সমাধি ঘিরে ছিল শত শত দেহাবশেষ। তখনই নরবলির ইঙ্গিত তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু এর পক্ষে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ খুঁজে বার করতে পারেননি। পেট্রি আন্দাজ করেছিলেন, প্রথম রাজবংশের শাসনকালে মিশরে রাজার মৃত্যুর কিছু সময়ের মধ্যেই সম্ভবত শত শত অনুচরকে বলি দেওয়া হত। রাজার সমাধির চারপাশে বিরাজমান ওই দেহাবশেষগুলো তার প্রমাণ। কিন্তু এই মানুষগুলোর মৃত্যু ঠিক কীভাবে হয়েছিল, তা পেট্রি নিশ্চিত করতে পারেননি। তাই নরবলির তত্ত্বটিকে তখন প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। সম্প্রতি আমেরিকার পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক রোজ়েলিন ক্যাম্পবেল পেট্রির অসমাপ্ত কাজে ফের হাত দেন। আধুনিক ফরেন্সিক পদ্ধতি ব্যবহার করে তিনি দেহাবশেষগুলো খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেছেন এবং মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করেছেন। তাতে আরও জোরদার হয়েছে নরবলির তত্ত্ব। মিশর থেকে ৪৬টি মাথার খুলি সংরক্ষণ করে ব্রিটেনে নিয়ে গিয়েছিলেন পেট্রি। সেগুলো বিশ্লেষণ করে ক্যাম্পবেল দেখিয়েছেন, অন্তত ১৮টি খুলিতে কোনও না কোনও মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ক্যাম্পবেলের গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন এনভায়রনমেন্টাল আর্কিয়োলজি’ নামক জার্নালে। তাঁর দাবি, বেশিরভাগ খুলির উপর আড়াআড়ি ফাটল লক্ষ করা গেছে। সাধারণত চ্যাপ্টা এবং চওড়া কোনও বস্তুর প্রচণ্ড আঘাতে মাথার খুলিতে এমন ফাটল ধরতে পারে। এ ছাড়া, কোনও কোনও খুলিতে ধারালো অস্ত্রের আঘাতও মিলেছে। মাথার পাশে বা চোখের উপর কোপের চিহ্ন পেয়েছেন ক্যাম্পবেল। তিনি মেনে নিয়েছেন, স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ মৃত্যুর পরেও রাজার সমাধির পাশে প্রজাদের এভাবে কবরস্থ করা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু খুলিগুলো বিশ্লেষণ করে একটি বিষয়ে ক্যাম্পবেল নিশ্চিত, এই সমস্ত ব্যক্তির অনেকেই মৃত্যুর ঠিক আগে বড় ধরনের কোনও মানসিক আতঙ্ক বা ধাক্কার মুখে পড়েছিলেন। ফলে তাঁদের মাথায় আঘাত করে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে, এই সম্ভাবনাই জোরালো হচ্ছে। ক্যাম্পবেল দেখিয়েছেন, রাজার সমাধির পাশে প্রাপ্ত দেহাবশেষগুলো তৎকালীন সমাজের তুলনামূলক নিম্ন বা মধ্যস্তরের কর্মকর্তাদের। সম্মানে রাজার সমকক্ষ বা রাজ পরিবারের কারও দেহ সেখানে পাওয়া যায়নি। কিছু কিছু কবরের গায়ে সমাধিস্থদের নাম এবং পদবি লেখা ছিল। সেখান থেকেই তাঁদের সামাজিক পরিচয় আন্দাজ করা গেছে। তা ছাড়া, সমাধির প্রকৃতিও ছিল ভিন্ন। এই কবরগুলোতে কোনও আড়ম্বর ছিল না। অতি সাধারণ কক্ষ নির্মাণ করেই ওই ব্যক্তিদের সমাধিস্থ করা হয়েছিল। মিশরীয়েরা বিশ্বাস করতেন, মৃত্যুর পরে ভিন্ন জগতে ভিন্ন জীবন যাপন করে মানুষ। তাই মৃতদেহের সঙ্গে ওই ব্যক্তির প্রিয় জিনিসপত্রও সমাধিস্থ করা হত। পিরামিডের মধ্যে তৈরি করে দেওয়া হত ঘর। প্রথম রাজবংশের রাজাদের সমাধি এবং তার চারপাশে প্রাপ্ত দেহাবশেষগুলর ক্ষেত্রেও সেই ঐতিহ্যের ছোঁয়া মিলেছে। ক্যাম্পবেল দেখেছেন, অধিকাংশ সমাধিতে মাটির পাত্র, তামার সরঞ্জাম কিংবা ছোট হাতির দাঁতের মূর্তি রাখা থাকত। মনে করা হচ্ছে, রাজার মৃত্যুর পর পরকালে তাঁর সেবা করার জন্য অনুচরদের বলি দেওয়া হত এবং একই জায়গায় সমাধিস্থ করা হত। কোনও কোনও অনুচর এ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণও করে থাকতে পারেন, মত ক্যাম্পবেলের। তাঁর কথায়, ‘‘কিছু অনুচর হয়তো অমরত্ব লাভ বা সম্মান অর্জনের আশায় স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন। অন্যদের হয়তো মৃত্যুবরণে বাধ্য করা হয়েছিল।’’ মিশরের প্রথম রাজবংশের রাজাদের সমাধি নিয়ে আরও বিশদ গবেষণা প্রয়োজন, মনে করেন ক্যাম্পবেল। যে ৪৬টি মাথার খুলি ব্রিটেনে পেট্রি নিয়ে গিয়েছিলেন, ক্যাম্পবেল কেবল সেগুলো নিয়েই কাজ করেছেন। সমাধিস্থল থেকে আরও দেহাবশেষ সংগ্রহ করে আধুনিক ফরেন্সিক পদ্ধতিতে সেগুলোর বিশ্লেষণ করলে তাঁর তত্ত্ব আরও জোরালো হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। /কেআর/