রাজস্ব সংগ্রহে এবার মাঠে নামছে জেলা প্রশাসন
রাজস্ব আদায় ও ব্যবস্থাপনায় মাঠ প্রশাসন সরকারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এই বছর সরকারি রাজস্ব আদায় কার্যক্রম গতিশীল করতে মাঠ প্রশাসনের (বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার) প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে চার দফায় কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেছে। সরকার গঠনের শুরুতে প্রথম দফায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এই বিষয়ে দেশের সকল বিভাগীয় কমিশনার সকল জেলা প্রশাসক ও সকল উপজেলা উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের প্রতি নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। একইভাবে মার্চে অনুষ্ঠিত ডিসি সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুসারে দ্বিতীয় দফা, ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের পর তৃতীয় দফা ও সর্বশেষ ৩০ সেপ্টেম্বর চতুর্থ দফা চিঠি পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ছাড়াও অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে পাঠানো চিঠিতে রাজস্ব আদায় বাড়াতে মাঠ প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। জানা গেছে, চলতি অর্থবছর থেকে ৩৯ ধরনের সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দেখানো বাধ্যতামূলক করে সরকার। এসব সেবা নিতে হলে রিটার্ন দাখিল না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সেবা দিতে পারবে না এবং তা করলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চিঠিতে সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের মাঠ প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বর্তমান কাঠামোয় জেলা প্রশাসক বা ইউএনওদের সরাসরি কর আদায়ের দায়িত্ব না থাকলেও বিভিন্ন সেবা প্রদান ও লাইসেন্সিং কার্যক্রমে কর-অনুবর্তিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ডিসি, ইউএনও এবং এসি ল্যান্ড’র নেতৃত্বে মাঠ প্রশাসন ভূমি উন্নয়ন কর, আয়কর, ভ্যাট এবং অন্যান্য সরকারি শুল্ক আদায় নিশ্চিত করে। ডিসি ও ইউএনওগন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর আদায়ের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে নতুন গ্রোথ সেন্টার ও বাজারগুলোয় করদাতাদের উদ্বুদ্ধ করে আয়কর, ভ্যাট ও টার্নওভার কর আদায়ে নানা ধরনের সহায়তা করতে পারেন। এছাড়া ‘পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি আইন-১৯১৩’ অনুসারে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা সার্টিফিকেট মামলার অফিসার হিসেবে বকেয়া কর আদায়ে সরাসরি ভূমিকা পালন করেন। এসব কারণেই এই বছর সরকারি রাজস্ব আদায় কার্যক্রম গতিশীল করতে মাঠ প্রশাসনের বিশেষ করে বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি ও ইউএনওদের প্রতি বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা “পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি আইন” বা পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্ট, ১৯১৩ প্রয়োগ করে রাজস্ব আদায়ে গতিশীলতা আনতে পারেন। এই আইনটি বকেয়া সরকারি রাজস্ব, কর, ঋণ এবং অন্যান্য পাবলিক দাবি আদায়ের একটি বিশেষ আইনি কাঠামো। সাধারণ আদালতের দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে দ্রুত সরকারি পাওনা আদায়ের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ আমলে প্রণীত এই আইনটি বর্তমানে বাংলাদেশে কার্যকর রয়েছে। বকেয়া রাজস্ব আদায়ের জন্য এই আইনে সাধারণ দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে মামলা করার পরিবর্তে সার্টিফিকেট অফিসারের মাধ্যমে দ্রুত সার্টিফিকেট মামলা দায়ের করা যায়। সরকারি বকেয়া কর, জরিমানা, টোল, এবং সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ (নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে) এর আওতাভুক্ত। এই আইনের ক্ষমতাবলে কালেক্টর বা নিযুক্ত কোনো কর্মকর্তা ‘সার্টিফিকেট অফিসার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তার বিচারিক ক্ষমতা থাকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেনা পরিশোধ না করা হলে সার্টিফিকেট অফিসার দেনাদারের সম্পত্তি ক্রোক ও নিলাম করতে পারেন। এছাড়াও প্রয়োজনে দেনাদারকে গ্রেপ্তার ও দেওয়ানি কারাগারে আটক রাখার বিধানও রয়েছে। এর বাইরেও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসন বকেয়া রাজস্ব আদায়ের জন্য সার্টিফিকেট বা দাবি আদায়ের আইনি প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে ব্যবহৃত প্রধান আইনগুলো হলো- “রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০”, ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা আদায়ের জন্য মাঠ পর্যায়ে এই আইনটি প্রয়োগ করা হয়। বকেয়া ভূমি কর আদায়ে এ আইনের বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী জরিমানাসহ সম্পত্তি ক্রোকের বিধান রয়েছে। “সরকারি দাবি (আদায়) আইন, ১৯১৩, সরকারি বিভিন্ন খাতের বকেয়া রাজস্ব বা পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন এই আইনের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। “অর্থ আইন” , প্রতি বছর বাজেটের পর অর্থ অধ্যাদেশ বা আইন জারি করা হয়। এর মাধ্যমে মাঠ প্রশাসন নির্দিষ্ট কিছু সেবামূলক খাত ও লাইসেন্স ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক এবং অন্যান্য কর আদায়ের আইনগত ভিত্তি পায়। এসব আইনের অধীনে রাজস্ব আদায়ে মাঠ প্রশাসন সাধারণত নোটিশ জারি, সম্পত্তি বা ব্যাংক হিসাব ক্রোক, এবং সার্টিফিকেট ডিক্রি বা নিলাম প্রক্রিয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এদিকে রাজস্ব সংগ্রহে গতিশীলতা আনতে সরকারি রাজস্ব ও অন্যান্য সব ধরনের সরকারি প্রাপ্তি জমার ক্ষেত্রে অর্থবছরের প্রথমদিন ১ জুলাই থেকে এই চালান ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। নতুন অর্থবছর ২০২৬-২৭ থেকে সরকারি অর্থ সংগ্রহে এ-চালান ছাড়া অন্য কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে না। অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারি অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে (টিএসএ) জমা নিশ্চিত করা, সরকারি নগদ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করা, আর্থিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং প্রচলিত কাগুজে চালান ব্যবস্থা বন্ধ করার লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, নতুন অর্থবছরের শুরু থেকে কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা কিংবা অধীনস্ত দপ্তর এই চালানের বাইরে অন্য কোনো মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব বা প্রাপ্তি সংগ্রহ ও জমা দিতে পারবে না। বর্তমানে সরকারি অর্থ সংগ্রহে ব্যবহৃত পৃথক কোনো ব্যবস্থা থাকলে সেটিও বন্ধ করতে হবে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এই চালান প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও এনবিআর থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন উপায়ে মাঠ প্রশাসন সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ভূমিকা পালন করার সুযোগ রয়েছে। জেলায় ডিসি ও উপজেলায় ইউএনওরা নিজ নিজ এলাকায় এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি ও সমন্বয় করবেন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এডিসি রেভেনিউ, এসি ল্যান্ড ইজারামূল্য, জলমহাল, হাটবাজার ও কৃষি খাস জমি ব্যবস্থাপনা থেকে সরকারি রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করবেন। নতুন করদাতা শনাক্তকরণ, বাণিজ্য মেলা বা স্থানীয় পর্যায়ে জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে মাঠ প্রশাসন করের আওতা বাড়াতে সহায়তা করবেন। কর ফাঁকি রোধ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করা এবং অবৈধ স্থাপনা থেকে ভ্যাট ও অন্যান্য রাজস্ব আদায়ে মাঠ প্রশাসন নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবে। স্থানীয় পর্যায়ে সেমিনার, প্রচার-প্রচারণা এবং অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার মাধ্যমে নাগরিকদের কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ করবে। সরকারি রাজস্ব বকেয়া পড়লে তা আদায়ের জন্য পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্টসহ অন্যান্য আইন অনুযায়ী সার্টিফিকেট মামলা দায়ের ও সম্পত্তি নিলামের মাধ্যমে বকেয়া রাজস্ব আদায় করবে। এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পিরোজপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ জানিয়েছেন, রাজস্ব আদায় ও ব্যবস্থাপনায় মাঠ প্রশাসন সবসময়ই সরকারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। ডিসি সম্মেলনেও এই বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। আমরা সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক কাজ শুরু করছি। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ জানিয়েছেন, জেলা পর্যায়ে রাজস্ব দপ্তরের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্বাবধান ও পরিবীক্ষণের দায়িত্ব ডিসিদের ওপর ন্যস্ত। তবে কর আহরণের পরিধি বা করজাল সম্প্রসারণে তাদের কার্যকর সম্পৃক্ততা এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছেনি। ফলে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও কর নির্ধারণ, আদায় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব এনবিআর-এর। তবুও মাঠ প্রশাসনের সক্ষমতা যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে করজাল বহু গুণ সম্প্রসারণ সম্ভব। এভাবেই বাড়ানো যেতে পারে সরকারের রাজস্ব আদায়। সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, কর নির্ধারণ, আহরণ, কর প্রশাসন ও আইন বাস্তবায়নের দায়িত্ব এনবিআর এবং সংশ্লিষ্ট কর কমিশনারদের ওপর ন্যস্ত। জেলা পর্যায়েও কাস্টমস ও ট্যাক্স কমিশনাররা এ আইনগুলো প্রয়োগের দায়িত্ব পালন করেন। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকদের সম্পৃক্ত করতে হলে একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো প্রণয়ন করার প্রয়োজন হবে বলেও মনে করেন তিনি। /এমএএইচ/